দেশে করোনা সংক্রমণের মাত্রা কমছে। ধীরে ধীরে টিকাপ্রাপ্তিও নিশ্চিত হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বেশকিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে খুলে দেয়া হচ্ছে প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৫ অক্টোবরের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেশনজট ও পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চিত সময় কাটছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবনপূর্বক শিক্ষার্থীদের দ্রুত ক্লাস-ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনা জরুরি। তবে তাদের ক্যাম্পাসে ফেরাটা যেন স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হয়, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের টিকাদান নিশ্চিতের পাশাপাশি হল, ডাইনিং, শ্রেণীকক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য পরিসরকে নিয়মিত জীবাণুনাশক করাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সব স্তরের শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষ ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কেননা এরই মধ্যে তারা পরীক্ষা দিয়ে পাস করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারতেন। আমাদের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে উদাসীন থেকেছেন। বর্তমানে সংক্রমণের হার ১০ শতাংশে নেমে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু এর আগে যখন সংক্রমণের হার ৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, তখনো সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করেনি। তাছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর আগে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার রূপরেখা ঘোষণা করে, তখনো বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি। দেশে যখন বিভিন্ন সেক্টরের কর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেয়া হলো, তখন শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের উহ্য রাখা হয়েছে।
কভিড-১৯ শুরুর আগের বাস্তবতায় আমরা দেখেছি যে আমাদের শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে না। ক্রমেই বেকারত্বের হার বাড়ছে। মহামারীর কারণে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক শ্রমবাজার। আমাদের শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাসক্ষম করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। মালয়েশিয়ার সরকার কভিড-পরবর্তী বাস্তবতা উপলব্ধিপূর্বক শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তারা বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল আর গণিতের মতো বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি করতে বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে কারিকুলাম সংযোজন, শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ‘ব্লেন্ডেড লার্নিং মডেল’-এ অভ্যস্ত করে তোলার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পাশাপাশি আমাদের নীতিনির্ধারকদেরও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা আমলে নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। করোনা পরিস্থিতি সৃষ্ট বাস্তবতাকে গ্রাহ্য করে নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে অনেক কিছু। এখানে বাদ রাখা যাবে না শিক্ষাকেও।
দেশের করোনাবিষয়ক জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮ বছরের বেশি বয়সী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা হলে থাকেন, তাদের টিকা দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে তাদের অনেকেই টিকা নিয়েছেন। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের যেসব শিক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে যেন টিকা নিতে পারেন, সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের তথ্য অধিদপ্তরে পৌঁছানোর নিয়ম রয়েছে। জানা যায়, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে তাদের শিক্ষার্থীদের তালিকা করেছে। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩১ লাখের বেশি, আবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের সবাইকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে টিকাদানের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কঠিন হলেও সত্য যে আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জাপান ও সিঙ্গাপুরের বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিকেল সেন্টার থাকলেও এর অবকাঠামোগত সক্ষমতা কম। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ ইউজিসিকে সচেষ্ট হতে হবে। কভিড-১৯ মহামারীর কারণে এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সক্ষমতা ও বাস্তবতা অনুযায়ী একটি রিকভারি প্ল্যান প্রস্তুত করা জরুরি।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী থাকেন আবাসিক হলগুলোয়। যেখানে চারজনের রুমে থাকেন আট কিংবা দশজন আর গণরুমে থাকেন ২০ থেকে ৭০-৮০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থীও; যা সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়াবে। শিক্ষার্থীদের আবাসন বিন্যাসের পাশাপাশি টিকা নিশ্চিত ও নিয়মিত স্যানিটাইজেশনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের নিজেদেরও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। হলে, ক্লাসরুমে দিনে দুবার জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। এছাড়া ক্লাসে, ক্যান্টিনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, মূল ফটকে জীবাণুনাশক টানেলের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে, এতে নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থী সশরীরে অংশ নিলেও বাকিরা ভার্চুয়ালি ক্লাসে সংযুক্ত থাকতে সক্ষম হবেন। নিশ্চিত করতে হবে নিয়মিত মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহার। এছাড়া শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্ন স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও দৈনন্দিন খাবারের পুষ্টিমান নিশ্চিত করা চাই। সবাইকে টিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত ক্লাসের প্রতিটা সেকশনকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে। আবাসিক হলগুলোকে অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী মুক্ত করতে হবে। গণরুমের শিক্ষার্থীদের সিটের ব্যবস্থা, হলের ক্যান্টিন সংখ্যা বাড়াতে হবে। আলাদা কোয়ারেন্টিন ইউনিট করা যেতে পারে। এছাড়া শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিড-১৯-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে শিক্ষা। এরপর রয়েছে দক্ষতার উন্নয়ন। মাসের পর মাস ক্লাস, ক্যাম্পাস বন্ধ করে আমরা এদিক থেকে আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকটাই পিছিয়ে গেছে। তাই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলো খুলে দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষকে স্বাভাবিক করা চাই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত সশরীরে ক্লাস শুরু হয়েছে। সিঙ্গাপুর তাদের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের তিনজনের মধ্যে দুজনকে টিকার আওতায় এনেছে। জাপানে টিকাদান কর্মসূচির গতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বুথ স্থাপন করা হয়েছে। শর্ত হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে টিকা সরবরাহ করা হবে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে টিকাদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং টিকা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের রিসোর্স ব্যবহার ও মেডিকেলের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের টিকা দেয়ার কাজটি মূলত করেছে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। আমরাও এভাবে অগ্রসর হতে পারি।










