সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জোট ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইইসিআইজে) অনুসন্ধানে বিশ্বের রথী-মহারথীদের গোপন আর্থিক লেনদেনের নথির খোঁজ মিলেছে। এসব নথির নাম দেয়া হয়েছে ‘প্যান্ডোরা পেপার্স’। এটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী তুমুল আলোচনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পদ লুকানোর বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে।
আইসিআইজের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে যা বেরিয়ে এসেছে, তাতে নতুন কিছু নেই। সত্য যে আজকের অতিধনী ও ক্ষমতাবানরা যে মাত্রায়, সূক্ষ্মতায় আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তা নজিরবিহীন। এটি সংবাদ হওয়ার যোগ্য। সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক জোটটি এসব নথি অনুসন্ধানে বিশ্বের ছয়শর বেশি সাংবাদিককে কাজে লাগিয়েছে। নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলে তারা কাজ করেছেন। খোদ সম্পদ গোপন করার কাজের জটিলতাই সত্যায়ন করে যে আইনজীবী, আইনসভা এবং আদালত কত ভালোভাবে আইনকে নিজেদের কিংবা অভিজাতদের অনুকূলে কাজে লাগিয়েছে।
আজকের ধনী ও ক্ষমতাবানরা নিজেদের ধন-সম্পদ লুকাতে কয়েক শতকের পুরনো কোডিং কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। ১৫৩৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি ‘দি ইউজ’ নামে পরিচিত এক আইনি হাতিয়ারকে নস্যাৎ করেছিলেন। কারণ এটি বিদ্যমান (সামন্তীয়) সম্পত্তি সম্পর্ককে অবমূল্যায়ন করেছিল এবং কর ফাঁকির উপকরণ হিসেবে কাজ করেছিল। তবে সুচতুর আইনজ্ঞরা কৃতিত্বের দাবিদার যে আরো শক্তিশালী হাতিয়ার ‘দ্য ট্রাস্ট’ দিয়ে তারা সেটিকে প্রতিস্থাপন করেছে।
আইনবিদদের দ্বারা আইনসম্মতভাবে বিধিবদ্ধ এবং কোর্ট অব ইকুইটি দ্বারা স্বীকৃত ট্রাস্ট ব্যক্তির সম্পদ সৃষ্টি ও সংরক্ষণে অন্যতম আইনি হাতিয়ার হিসেবে রয়ে গেছে। আগে সম্পদশালীর উত্তরাধিকার নীতিমালা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। আজকে এটিই কর ফাঁকি এবং সম্পদভিত্তিক সিকিউরিটিজ ও ডেরিভেটিভসসহ আর্থিক সম্পদ বিন্যাসের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
কার্যকারিতার দিক থেকে কোনো ট্রাস্ট সম্পত্তি আইনের আনুষ্ঠানিক নীতিমালা পর্যবেক্ষণ ছাড়াই কোনো সম্পদের অধিকার ও বাধ্যবাধকতা বদলে দেয়। এভাবে এটি সম্পত্তিতে একটা ছায়া অধিকার সৃষ্টি করে। একটি ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি, শেয়ার কিংবা বন্ডের মতো কোনো সম্পদ, তিনজন ব্যক্তি (একজন মালিক-সেটলার, একজন ব্যবস্থাপক-ট্রাস্টি এবং একজন সুফলভোগী) প্রয়োজন হয়। মালিক সম্পদের ওপর তার লিগ্যাল টাইটেল (যদিও আবশ্যিকভাবে প্রকৃত মালিকানা দেয়া হয় না) ট্রাস্টির কাছে হস্তান্তর করেন, যিনি মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী সুফলভোগীর পক্ষে সেটি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার অঙ্গীকার করেন।
এ ব্যবস্থায় লিগ্যাল টাইটেল নিবন্ধন কিংবা পক্ষগুলোর পরিচয় উন্মোচনের কোনো দরকার পড়ে না। এ স্বচ্ছতা ঘাটতি ট্রাস্টকে ক্রেডিটর-সম্পদের মালিক এবং কর কর্তৃপক্ষের মধ্যে লুকোচুরি খেলার একটা উপযুক্ত হাতিয়ার করে তোলে। তদুপরি যেহেতু লিগ্যাল টাইটেল এবং অর্থনৈতিক সুবিধা তিনজনের মধ্যে বিভাজিত, সেহেতু কেউই মালিকানার মাধ্যমে আসা বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করেন না। এ ধরনের দায়দায়িত্ব স্বেচ্ছায় মেনে নেন।
কেবল বাজারের কিছু অদৃশ্য হাতের মাধ্যমে নয়, উদ্দেশ্যমূলক আইনি বিন্যাসের দিক থেকেও ট্রাস্ট বৈশ্বিক অভিজাতদের জন্য একটি অনুকূল আইনি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আইনজীবীরা বিদ্যমান আইনি চৌহদ্দি-পরিসীমা প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছেন, আদালত সেটিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং নিজস্ব উদ্ভাবনী উপায়ে সেগুলো প্রয়োগ করেছেন, তারপর আইনপ্রণেতা (যাদের অনেকেই ধনী দাতাদের কাছে অনুমানযোগ্যভাবেই বাধা) ওইসব চর্চাকে সংবিধিবদ্ধ আইনে সন্নিবেশ করেছেন। আগের বিধিনিষেধ যেহেতু তুলে দেয়া হয়েছে সেহেতু ট্রাস্ট আইনের পরিধি আরো বেড়েছে।
এসব আইনি পরিবর্তন নিশ্চিত করেছে যে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ ট্রাস্টে রাখা যাবে এবং বিচারকের মতো সম্মানীয় ব্যক্তির বিপরীতে ট্রাস্টির ভূমিকা আইনি ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। তদুপরি ট্রাস্টির দায়দায়িত্ব সীমিত করা হয় এবং ট্রাস্টের জীবনব্যাপ্তি ক্রমাগতভাবে স্থিতিস্থাপক করা হয়। সবকিছু মিলিয়ে এসব আইনি সংস্কার-অভিযোজন ট্রাস্টকে বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থার জন্য লাগসই করে তুলেছে।
যেসব দেশে এ আইনি হাতিয়ারে ঘাটতি ছিল, তারাও পরবর্তী সময়ে এটি অনুকরণে উৎসাহিত হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি—দ্য ১৯৮৫ হেগ কনভেনশন অন ট্রাস্টস—এ লক্ষ্য সামনে রেখে গৃহীত হয়েছিল। যেসব দেশে আইনজীবীরা ট্রাস্ট অনুমোদনের চাপ প্রতিরোধ করেছে, সেখানে তারা আইন থেকে ফাউন্ডেশন, সমিতি বা করপোরেশন গঠন-পরিচালনার মতো সমধর্মী ডিভাইস ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়েছে।
কিছু আইন-বিধি ব্যক্তির সম্পদ সৃষ্টির প্রতি আইনগতভাবে অনুকূল হলেও অন্যগুলো কর ও আইনগত মীমাংসার ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার চেষ্টাও করেছে। তবে আইনগত বিধিনিষেধ তখনই কেবল কাজ করে, যখন আইন বিভাগ তার এখতিয়ারের মধ্যে কোন আইন চর্চিত হয়, সেটি নিয়ন্ত্রণ করে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে অধিকাংশ দেশের আইন বিভাগই এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে নিয়েছে। কারণ আইন এখন অনেক নমনীয়, হালকা ও বহনযোগ্য হয়েছে। কোনো দেশের ‘সঠিক’ আইনটি না থাকলেও অন্য দেশে সেটি থাকতে পারে। যতক্ষণ ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলো বিদেশী আইন স্বীকার ও বলবৎ করে, ততক্ষণ লিগ্যাল ও অ্যাকাউন্টিং পেপারওয়ার্ক সবচেয়ে অনুকূল বিদেশী জুরিসডিকশনে প্রবাহিত হতে পারে। এর মাধ্যমে কাজটিও সহজেই সমাধা হয়ে যায়।
এভাবে আজকাল জাতীয় আইনি ব্যবস্থাগুলো আন্তর্জাতিক অপশনের মেনু আইটেমে পরিণত হয়েছে, যেখান থেকে সম্পদধারীরা বেছে নেয় কোনটি দ্বারা তারা শাসিত ও পরিচালিত হতে চায়। তাদের কোনো পাসপোর্ট বা ভিসার প্রয়োজন নেই, সবারই প্রয়োজন কেবল একটি আইনি ঢাল/সুরক্ষা ব্যূহ। এভাবে একটি নতুন আইনগত পরিচয় ধরে নিয়ে সুবিধাভোগী গুটিকয় মানুষ করের জন্য কত টাকা ব্যয় করবে এবং টিকে থাকার জন্য কোন কোন বিধি মেনে চলবে, তার সিদ্ধান্ত সহজেই নিতে পারে। উপরন্তু, যদি বেশ সহজেই আইনি বাধাগুলো অতিক্রম করা না যায়, তাহলে বিশ্বের শীর্ষ ল ফার্মগুলোর আইনজীবীরা বৈশ্বিক ফাইন্যান্সের ‘সর্বোত্তম চর্চাগুলো’ পরিপালনের জন্য সংগতিপূর্ণ নতুন আইনের মোসাবিদা করবে। এখানেই দক্ষিণ দাকোটা এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জগুলোর মতো কর ও ট্রাস্ট অবকাশকেন্দ্রগুলোর কৃতিত্ব। তারা রথী-মহারথীদের সম্পদ লুকানোর জন্য স্বর্ণমান (গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড) অফার করে।
এসব অন্যায্য চর্চায় সাহায্য করেন সুচতুর আইনজীবীরা। আর এর ব্যয় বহন করে ধনিক গোষ্ঠীই। তবে ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য আইনকে গোল্ড মাইনে পরিণত করা তাত্ক্ষণিক সৃষ্ট ক্ষতি অসমতার চেয়ে আরো ব্যাপকতর হবে। আবশ্যিকভাবে আইনের বৈধতা অবমূল্যায়নের মাধ্যমে এটি গণতান্ত্রিক শাসনের গভীর ভিত্তিটাকেও হুমকিতে ফেলতে পারে।
সম্পদশালী অভিজাতরা এবং তাদের আইনজীবীরা যতই বলবেন যে তারা যা কিছু করেন তা আইনসম্মত, তত আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমবে। আজকের বৈশ্বিক অভিজাতরা হয়তো আইন থেকে ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে সমর্থ হবেন কিন্তু কোনো সম্পদই চিরদিনের জন্য ধরে রাখতে পারবেন না। সেটি কোনো না কোনোভাবে উন্মোচন হবেই। কাজেই একবার আস্থা হারালে আইনের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে বৈকি। তখন সম্পদশালীরা তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের বিনিময়েও জন আস্থা অর্জন করতে পারবেন না। এটি মাথায় রাখতে হবে।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
ক্যাথরিনা পিস্টর: কলাম্বিয়া ল স্কুলের আইনের অধ্যাপক
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










