জাতিসংঘ বহু আগেই খাদ্য অধিকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম দেশ। এছাড়া খাদ্য অধিকারবিষয়ক অন্যান্য সনদও বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে। তার প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করি বাংলাদেশের সংবিধানে। সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘...(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা...’ হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তবে এখন শুধু খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করলেই হবে না, সেটিকে নিরাপদও রাখতে হবে। কেননা প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ২০ লাখ মানুষ খাদ্যজনিত রোগে প্রাণ হারায়। বাংলাদেশেও এ সংখ্যা কোনো অংশে কম নয়। খাদ্যপণ্যে ভেজালের কারণেই দেশের মানুষের বিভিন্ন রকমের ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলিউর, হূদযন্ত্রের অসুখ, হাঁপানিসহ আরো জটিল রোগ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। একে নিয়ন্ত্রণে আনতে খাদ্যকে নিরাপদ করতে হবে সর্বাগ্রে।
দেশের বাড়তি খাদ্য উৎপাদনে বড় অর্জন আনতে গিয়ে বেড়েছে রাসায়নিক সারের প্রয়োগ। আর মাটির ওপর নির্বিচারে রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যের উৎসস্থান থেকে পরিবহন ও গুদামজাতেও রাসায়নিক মেশানো হয়। শস্য ছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত মাছ ও আমিষের উৎস ডিম-মুরগিও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। মাছের খামারেও ব্যবহার হচ্ছে নানা বর্জ্য। পোলট্রি মুরগির বর্জ্য জমিতে ও মাছের খামারে ব্যবহূত হচ্ছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে খাদ্যের উৎস নিরাপদ থাকছে না। অসাধু ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের কারসাজির কারণে খাদ্য দূষিত হচ্ছে। তৈরীকৃত বিভিন্ন কোম্পানির জুস, চকোলেট, চানাচুর ইত্যাদি উৎপাদনে কোম্পানিগুলো কোনোরকম নিয়মের তোয়াক্কা না করে দেদারসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশিয়ে বাজারজাত করে যাচ্ছে। বেকারির অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য, জীবন রক্ষাকারী পানির বোতলে দূষিত পানি, মুড়িতে ইউরিয়া, বিষাক্ত এনার্জি ড্রিংক ও জুস, শিশুখাদ্যেও ভয়াবহ ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো হয়। মেশানো হয় মসলায় ইটের গুঁড়ো এবং হলুদে লেড ক্রোমেট বা লেড আয়োডায়েড। মুরগির শরীরে ব্যবহূত নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন ও ওষুধে লুকিয়ে আছে মরণঘাতী ব্যাকটেরিয়াসহ মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর মারাত্মক জীবাণু। গরুর মাংসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ পদ্ধতি দেখা যায়। দ্রুত বৃদ্ধির জন্য গরুর শরীরে দেয়া হয় বিভিন্ন গ্রোথ হরমোন। গরুর শরীরে পিটুইটারি ইনজেকশন দিয়ে দুধের পরিমাণ কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে। যেটা মানব স্বাস্থ্যের জন্য বড় রকমের ঝুঁকি।
আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশও খুব একটা পিছিয়ে নেই। দেশে নিরাপদ খাদ্য আইনসহ আরো কিছু পরিপূরক আইন আছে। রয়েছে সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানও। তবু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়নি। শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান থাকলে হবে না, আইনের প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা দরকার। বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিরাপদ খাদ্যের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের অভাব লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকেই আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। আমাদের দরকার একটি জাতীয় পর্যায়ের ফুড সেফটি ল্যাব, যেখানে নিরাপদ খাদ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমন্বিত গবেষণা চালানো সম্ভব হবে এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে তার ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। ওই গবেষণাগারে প্রয়োজন হবে কেমিস্ট, বায়োকেমিস্ট, ফুড টকসিকোলজিস্ট, ফুড মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ইপিডেমিওলজিস্ট, ফুড ইকোনমিস্ট, ফুড লয়ারসহ ডাক্তারদের। যেহেতু নিরাপদ খাদ্যের কলেবরটি অনেক ব্যাপক, তাই সমন্বিত গবেষণা ছাড়া এর প্রতিটি বিষয়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন সম্ভব নয়। দেশীয় খাদ্যের মান আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে আমরা করডেক্স কর্তৃক নির্ধারিত মানকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এর ফলে একদিকে যেমন আমাদের জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে আমরা আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কৃষিপণ্য সহজেই বিদেশে রফতানি করতে পারব। বর্তমানে দেশে করডেক্সের একটি কন্ট্যাক্ট পয়েন্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে থাকলেও আমরা দেশে বিভিন্ন সেক্টর থেকে লোক নিয়ে এখনো একটি দক্ষ ও কার্যকর করডেক্স টিম তৈরি করতে পারিনি। এ ব্যাপারে সরকারের আরো কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। এছাড়া আমাদের কৃষি সেক্টরে আরো কিছু বিশেষায়িত অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরি দরকার। অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরিগুলোয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপায়ে সঠিকভাবে গবেষণা করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পেস্টিসাইড রেসিডিউ ল্যাবের মতো আরো একটি অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরি তৈরি করতে পারলে তা নিঃসন্দেহে আমাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে আরো বেশি অবদান রাখবে।
নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় ২০১৩ সালে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৫ সালে গঠন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ভেজালবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তারা কাজ করছে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। আছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেজালবিরোধী অভিযান। তার পরও কমছে না ভেজালের ব্যাপকতা। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করলেও খাদ্য নিরাপদ করতে আমাদের অর্জন সামান্যই। আমরা আশা করব, ভেজালবিরোধী অভিযান কঠোর হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত হবে। ভেজাল পণ্য ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ঠেকাতে অভিযান নিয়মিত থাকলে ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ। এছাড়াও মাতৃস্বাস্থ্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, একজন গর্ভবতী মা ভেজালমুক্ত খাবার পায় না। যার ফলে তার গর্ভের শিশুটিও বেড়ে ওঠার আশানুরূপ পরিবেশ পায় না। এসব কারণে গর্ভপাত এবং বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম এখন অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে চাষযোগ্য কৃষি জমির তুলনায় জনসংখ্যার চাপ অধিক। আর বাড়তি এ জনগণের খাদ্য চাহিদা মেটাতে হাইব্রিড সবজি চাষ, মাংস উৎপাদন অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বেও এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বহির্বিশ্বে হাইব্রিড সবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় যথাযথ হরমোন ব্যবহার করা হয়। সেখানে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাবারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।
নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং সুস্থ জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। আমরা ২০৩০-এর মধ্যে স্থায়িত্বশীল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ২০৪০ সালের মধ্যে জনমিতিক সুফল ব্যবহারে চাই নিরাপদ ও পুষ্টি সংবেদনশীল খাদ্য, যার মাধ্যমে একটি সুস্থ জাতি গড়ে উঠবে। জনগণের সদিচ্ছা ছাড়া সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা, এর সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত। তার পরও কিছু নিয়ম-কানুন এবং যথাযথ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল দেয়ার লাগাম এখনই টেনে ধরতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সামনে খুবই খারাপ অবস্থা অপেক্ষা করছে, সেটা সহজেই অনুমেয়। এক্ষেত্রে মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও রাসায়নিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পরিবেশের হাইজিন নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে নিরাপদ খাদ্যও অনিরাপদ হয়ে যেতে পারে। নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমেই আমরা পাব অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং সুস্থ, সবল, কর্মঠ ও দক্ষ মানবসম্পদ।










