বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। তথ্য বলছে, বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৯ বিলিয়ন ডলার। এরই মধ্যে পোশাক রফতানি, রেমিট্যান্স, এফডিআই, জ্বালানি, ব্যাংক, বীমা, এভিয়েশনসহ বেশকিছু খাতে দেশটি প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দ্বিপক্ষীয় এ অর্থনৈতিক সম্পৃক্তি ক্রমেই নিবিড় হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ এখন মার্কিন বিনিয়োগের এক সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত। এ সুযোগ কাজে লাগাতে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করে একটি সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশ বিনির্মাণ জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের উন্নয়ন যাত্রার অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করছে দেশটি। ১৯৭২ সাল থেকে ইউএসএইড প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে বাংলাদেশকে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে করেছে সহায়তা। ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা সত্ত্বেও নতুন মার্কিন বিনিয়োগ আসার গতি এখনো শ্লথ। এর পেছনে আমাদের দিক থেকেও এখনো ভৌত ও অভৌত কিছু ঘাটতি বিরাজমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়লেও নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানিপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। নিবন্ধন, ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়াগুলোও এখানে বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। পদে পদে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বিদ্যমান। আইন-কানুনে আছে অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা। পুঁজি প্রত্যাবাসন কিংবা মুনাফা স্থানান্তর প্রক্রিয়া তেমন একটা সহজ নয়। অন্য দেশগুলোর চেয়ে করপোরেট করহার এখানে তুলনামূলক বেশি। তদুপরি কর-ভ্যাট আহরণ প্রক্রিয়ায় রয়ে গেছে জটিলতা। অনেক ক্ষেত্রে দ্বৈত করের সমস্যাও আছে। প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে এখানে সার্বিক প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগুলো বেশ ধীর। সব মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত হারে নতুন বিনিয়োগ আসছে না যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ অনেক দেশেই বিদ্যমান। দেশটির ঐতিহ্যিক বিনিয়োগ গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে জাপান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, বেলজিয়াম ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো। সেসব দেশে এখন শ্রম মজুরি ও আনুষঙ্গিক ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী। এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন কোম্পানিগুলো ধীরে ধীরে নতুন নতুন গন্তব্যে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইসরায়েল, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে দেশটি। কোনো কোনোটির সঙ্গে টিফা চুক্তি করেছে, কোনো কোনোটির সঙ্গে এফটিএ করেছে। দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরো বাড়াতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। নিজেকে বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে আকর্ষণীয় করে তুলতে ব্যাপক কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করেছে দেশগুলো। ভৌত অবকাঠামো সুবিধা বাড়িয়েছে। নীতিকাঠামো সহজ ও পরিপূরক করেছে। প্রক্রিয়াগত ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা কমিয়েছে। কর কাঠামোয় এনেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। কর আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করেছে। সর্বোপরি নিশ্চিত করেছে একটি সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশ। বৈশ্বিক নীতি-কৌশল পর্যালোচনা করে আমাদেরও এসব ক্ষেত্রে উন্নতি দরকার। তা না হলে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় আমরা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ব।
এখন পর্যন্ত একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশে সবচেয়ে বৃহৎ বিনিয়োগকারী। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রসারের আরো সুযোগ আছে। এটি মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো করতে হবে। এরই মধ্যে সরকার কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে একটি নিবেদিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। করপোরেট করহারও কিছুটা কমিয়েছে, আরো কমানো প্রয়োজন। অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিছু আইনি সংস্কার করা হয়েছে। এখন দেশে শতভাগ বিদেশী মালিকানার কোম্পানি পরিচালনা, শতভাগ লভ্যাংশ ও পুঁজি প্রত্যাবাসনের সুযোগ বিদ্যমান। নানাভাবে বিনিয়োগ বাধাগুলো নিরসনের চেষ্টা চলছে, তবে তা হচ্ছে বেশ ধীরগতিতে। কাজটি আরো বেগবান করতে হবে বৈকি।
সংশ্লিষ্টরা বলেছিল, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি (টিকফা) হলে দুই দেশের অংশীদারিত্ব আরো বাড়বে। বেশ আগেই এ চুক্তি সই হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় এ ফোরামটি একটি কার্যকর ফোরামে পরিণত হতে পারেনি। দ্বিপক্ষীয় নানা ইস্যুতে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে, অথচ কার্যকর সুফল মিলছে না। ফোরামটিকে আরো কার্যকর করতে হবে। বাড়াতে হবে অর্থনৈতিক কূটনীতি। আমাদের প্রতিযোগী কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করেছে। তার মধ্যে ভিয়েতনামও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাণিজ্য বাড়াতে আমাদেরও এ ধরনের চুক্তি করতে হবে।
দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে কিছু খাতের সম্ভাবনা সমুজ্জ্বল। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, অটোমোবাইল, হালকা প্রকৌশল, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, সামুদ্রিক অর্থনীতি, পর্যটন, হাইটেক শিল্প প্রভৃতি খাত। এসব খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে নতুন প্রযুক্তির সন্নিবেশ যেমন ঘটবে, তেমনি বিপুল কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে গুণিতক। বিদ্যমান বিনিয়োগ ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার সব ধরনের প্রচেষ্টা নেবে, এটিই প্রত্যাশা।










