সেতু অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বিয়ারিং। পিলারের সঙ্গে ওপরের কাঠামো জোড়া দেয়ার সংযোগস্থলে বসানো হয় এটি। এর কাজ অনেকটা কুশন বা বালিশের মতো। ভার বহনের চাপ সেতুর সবখানে ছড়িয়ে দেয় বিয়ারিং। ঝাঁকুনি প্রতিরোধের পাশাপাশি অবকাঠামোকে টেকসই করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এটি। দুঃখজনকভাবে বঙ্গবন্ধু সেতুর বিয়ারিংগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর মিলছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এরই মধ্যে ৪৫ শতাংশ বিয়ারিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া না হলে পুরো অবকাঠামোটিই ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কাজেই বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সক্রিয়তা প্রয়োজন।
নির্মাণকাজ শেষে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ সেতু সচল করা হয়েছিল ১৯৯৮ সালের জুনে। স্বাভাবিক প্রকৌশলগত চর্চার অংশ হিসেবে নির্মাণকালে সেখানে বসানো হয়েছিল ১১২টি বিয়ারিং। মাঝখানে ২৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে ফুরিয়ে আসছে ব্যবহূত বিয়ারিংগুলোর মেয়াদ। প্রায় অর্ধেকই এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকিগুলোও ক্ষতির মুখে। সেগুলো ক্রমেই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। মেয়াদের একটি বিষয় থাকলেও বিয়ারিংয়ের স্থায়িত্ব অনেকটা নির্ভর করে রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। এখানে আমাদের ঘাটতি প্রবল। নিবেদিতভাবে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করা হলেও বিয়ারিংগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না বলে অভিযোগ। বিয়ারিংগুলোর সর্বোচ্চ মেয়াদ ৩০ বছর। তার বেশ আগেই আয়ু ফুরিয়ে আসার এটিও একটি কারণ। এছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুতে যানবাহনের চাপটাও অত্যধিক। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার একমাত্র সংযোগকারী সেতু হওয়ায় এটি সচল থাকে হরদম। এতটুকু বিরতিরও ফুরসত নেই। আবার সেতুর এক্সেল লোড তথা পণ্য ওজনসীমা নির্ধারণ করে দেয়া হলেও সেটি যথাযথভাবে মানা হয় না। নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি পণ্য নিয়ে সেতুটি পার হচ্ছে যানবাহনগুলো। তদুপরি আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নৈমিত্তিক ঝাপটা। বছরের বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। ঘরবাড়ি, গাছপালা, ভবন এবং অন্য অবকাঠামোর মতো এর ধকলটা সেতুর ওপর দিয়েও বয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু সেতুও তার বাইরে নয়। বলা চলে, নানা কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর বিয়ারিংগুলো অকেজো হওয়ার পথে।
বিভিন্ন দেশে টেকসইভাবে নির্মাণের পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয় সেতু রক্ষণাবেক্ষণে। যুক্তরাষ্ট্রে সব অঙ্গরাজ্যেই নিজস্ব জলবায়ুগত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বড় সেতুগুলো নিয়মিত পরিদর্শনের মধ্যে রাখা হয়। নির্মাণকালে ব্যবহূত বিয়ারিংগুলোর তথ্য সবিস্তারে নথিবদ্ধ করা হয়। কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা, কোথাও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে কিনা, সেগুলো যাচাই করা হয়। নিয়মিতভাবে করা হয় স্ক্যান। ত্রুটি পেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত প্রতিস্থাপন করা হয়। কর্তৃপক্ষ স্পেসিফিকেশন তৈরি করে চাহিদাপত্র পাঠিয়ে দেয়। চুক্তিবদ্ধ সার্ভিস কোম্পানি এসে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত ত্রুটি সারানো বা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করে। চীনেও একই অবস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে সেতু নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে দেশটি বেশ পারদর্শিতা দেখিয়েছে। সেখানে এ-সংক্রান্ত অনেক সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা বড় বড় সেতু সংস্কার বা বিয়ারিংয়ের অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গগুলো পেশাদারিত্বের সঙ্গে প্রতিস্থাপন করে। ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। দেশটিতেও অনেক ব্রিজ বিয়ারিং রিপ্লেসমেন্ট সার্ভিস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাদারি দল দিয়ে তারা নিরাপদে ও যথাসময়ে বিয়ারিং প্রতিস্থাপনের কাজ করছে। আমাদের দেশে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, প্রধান নদীগুলোর ওপর দীর্ঘ সেতু করা হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো মেরামত বা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোর প্রতিস্থাপন করে দেয়ার মতো নিজস্ব সাপোর্ট সিস্টেম এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে ছোটখাটো কাজের জন্যও আমাদের বিদেশনির্ভরতা কাটছে না। সুতরাং এ প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিদ্যমান বিয়ারিংগুলো কেনা হয়েছে ইতালির একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। জীবত্কাল প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় প্যাডগুলো বদলে ফেলার সময় এসেছে। প্রথমে দেখতে হবে কোনগুলো কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যমান ম্যানুয়েল অনুসরণ করে এরপর পট বিয়ারিংয়ের স্পেসিফিকেশন ও প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় কাজটি করতে হবে সওজকেই। যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে বিয়ারিংগুলো আনতে হবে। তারা দিতে না পারলে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী অন্য যেখানে পাওয়া যায় সেখান থেকে আনার ব্যবস্থা করতে হবে এবং দ্রুত প্রতিস্থাপন করতে হবে। বঙ্গবন্ধু সেতু দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ ও পূর্বাংশের মধ্যে সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগের প্রধান কৌশলগত পয়েন্ট। সময়মতো বিয়ারিংগুলো প্রতিস্থাপন করা না হলে মূল কাঠামো ও পিলারের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে, যা আয়ুষ্কাল কমিয়ে দেবে সেতুর। সময়মতো কাজ সমাধা না করলে পরে ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি অবকাঠামোর অর্থনৈতিক সুফলও ক্রমেই নিঃশেষিত হয়। এর আগেও বঙ্গবন্ধু সেতুতে ফাটল দেখা দিয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ এবং তদারকিতে গাফিলতির কারণে এমনটা হয়েছে। সুতরাং আগের অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে বিয়ারিং প্রতিস্থাপনে ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শৈথিল্যও কাম্য নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিয়ারিংগুলো এখনই সেতুর কাঠামোর জন্য হুমকি তৈরি করছে না। কিন্তু এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের গা-ছাড়া ভাবের কোনো সুযোগ নেই। বিয়ারিংয়ের মেয়াদ যেহেতু ফুরিয়ে আসছে, সেহেতু একটু না একটু নেতিবাচক প্রভাব সেতুর ওপর নিশ্চয়ই পড়ছে। এটাকে মাথায় রেখে আমাদের কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষণাবেক্ষণে মনোযাগী হতে হবে। ঠিকঠাকভাবে বিয়ারিংগুলো কাজ করছে কিনা তা সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে হবে। নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, গ্রিজ দেয়াসহ সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম আরো বেগবান করতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের। প্রতিস্থাপন না করা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণে বাড়তি নজর দেয়াটাই আপাতত সমীচীন।
বঙ্গবন্ধু সেতু সড়ক ও রেলপথ পুরো উত্তরবঙ্গকে ঢাকার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। যোগাযোগ করিডোর হিসেবে পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এনেছে লক্ষণীয় গতি। অবদান রাখছে অর্থনীতিতে। যানবাহনের আধিক্য এবং পরিবেশ-আবহাওয়াগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুর বিয়ারিংগুলো নাজুক হচ্ছে। ক্রমেই নিঃশেষিত হচ্ছে সেগুলোর আয়ু। এখনো বড় ক্ষতি না করলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিয়ারিংগুলো বঙ্গবন্ধু সেতুতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। সুতরাং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ারিংগুলো প্রতিস্থাপনের বিকল্প নেই।










