বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়া। আর সে লক্ষ্য পূরণেই এগিয়ে যাচ্ছে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ। এই এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ প্রধান শহরগুলো হয়ে উঠছে দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। শুধু যদি ঢাকার দিকেই তাকাই তাহলে দেখা যায়, বাংলাদেশের জিডিপির এক-পঞ্চমাংশ আসে কেবল ঢাকা থেকে আর দেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ বাস করে ঢাকা নগরীতেই। আমাদের ঢাকা নগরীই আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় অর্ধেকের জোগান দিয়ে থাকে। সে বিবেচনায় একটি আধুনিক ও উন্নত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকতে হলে শহরগুলোর দিকে নজর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। বলা যায়, ঢাকার রূপান্তরের ওপর অনেকটা নির্ভর করবে বাংলাদেশের রূপান্তর। ঢাকার রূপান্তর মানে কেবল মৌলিক অবকাঠামো নয়, ঢাকার রূপান্তর হতে হবে নাগরিক সুবিধাবিষয়ক গণপরিসরের মতো অবকাঠামো।

এ নগরী আমাদের এতগুলো মানুষের বেঁচে থাকার রসদ জুগিয়ে চলছে। রাত নামলে আলোর ঝলকানি দেয়া এ নগরীর বুকে কত শত স্বপ্ন হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাই এ নগরে এখনো প্রতিদিন মানুষ দেশের অন্যান্য শহর ও গ্রাম থেকে ছুটে আসে চাকরি, ভালো চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি কাজের উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে এ নগরীর প্রতিটি রাস্তা ও অলি-গলিতে উন্নয়নের অবিরাম চেষ্টা। উঁচু দালানেরা আকাশ ছুঁয়ে ফেলার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতায় নেমেছে যেন। যার বেশির ভাগই অপরিকল্পিত। এই অপরিকল্পিত নগরায়ণ অফুরন্ত সম্ভাবনার নগরী ঢাকাকে জর্জরিত করেছে হাজারো সমস্যায়। ঢাকার কথা বললেই তাই যানজট, ভাঙা ও সরু রাস্তাঘাট, চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত ফুটপাতের অভাব, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, পরিবেশ দূষণ, গাছপালার অভাব, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সমস্যা, নোংরা জলাবদ্ধতা, আগুন লাগা, নাগরিক নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদির মতো হাজারো সমস্যার কথা উঠে আসে। উঠে আসে নাগরিক সুবিধাবান্ধব অবকাঠামোর কথা। রোজাকার নাগরিক জীবনের ঝুলিতে হাজারো অভিযোগ। নাগরিক হিসেবে আমাদের রোজকার অনেক প্রশ্ন? ‘পূর্ণ বয়স্ক বা শক্ত-সবলদের কথা বাদ দিলাম, এত মানুষের এ নগর কি শিশু, নারী আর বৃদ্ধদের কথা ভাবে? এ নগর কি ভেবে দেখে একজন দৃষ্টিহীন, হুইলচেয়ারে বসে থাকা মানুষের কথা? পথে চলতে ক্লান্তি এসে গেলে পথিকের একটুখানি জিরিয়ে নেয়ার কথা ভাবে? তার জন্য বেঞ্চ বা বসার জায়গা, আলোর ব্যবস্থার কথা ভাবে কি? এ যদি বা থাকেও, তা অক্ষত বা ব্যবহার উপযোগী তো?’ একরাশ অভিযোগ আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে। নগর পরিকল্পনা নিয়ে।

প্রশ্ন আসবে না কেন! কেননা হাতছানি দিয়ে ডাকা স্বপ্নের নগরীতে বসবাসকারী নগরবাসী বাসা থেকে কাজ, আর কাজ থেকে বাসা। বাকিটা সময় যানজটে কাটানোর বাইরে দম ফেলার, বিনে পয়সায় দুদণ্ড স্বস্তি নেয়ার জায়গার বড়ই অভাব। বড্ড অভাব আমাদের কাজের বাইরে পথে চলতে-ফিরতে নাগরিক সুবিধাগুলোর। যাও আছে, তাও ভীষণ অপ্রতুল, রয়েছে ব্যবস্থাপনা বা নিরাপত্তার অভাব, নেই সর্বজনগম্যতা; নগরী পরিণত হয়েছে ইট-কংক্রিটের জঙ্গল আর ইট নাগরিক জীবন হয়েছে যান্ত্রিক এক জীবন। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত নগর ঠিক নাগরিকবান্ধব বা মানবিক নগর হয়ে উঠতে পারেনি এখনো। উন্নত দেশের মানদণ্ডে বাংলাদেশকে দাঁড়াতে হলে তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশকে জোর দিতে হবে এখন জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে। আর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে নাগরিক সুবিধাবান্ধব গণপরিসরের মতো অবকাঠামো। গণপরিসরের ব্যাপ্তি অনেক বড়। সহজ কথায়, গণপরিসর হলো গণমানুষের জায়গা। এমন জায়গা, যা আর্থিক বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তৈরি নয়। ধর্ম, বয়স, বর্ণ, লিঙ্গ, আর্থিক অবস্থাভেদে যে কেউ ব্যবহার করতে পারে, সময় কাটাতে পারে, বাধাহীন খুব সহজে উপভোগ করতে পারে। ইউএনহ্যাবিটেটের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো উদ্যান বা পার্ক, উন্মুক্ত স্থান বা খেলার মাঠ, নদীর ধার, লেক, জলাশয়, সবুজ বনায়ন, রাস্তাঘাট, হাঁটার পথ, স্টেডিয়াম, কমিউনিটি স্পেস, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, কমিউনিটি লাইব্রেরি ইত্যাদি যেকোনো কিছুই গণপরিসর হতে পারে। এ গণপরিসরগুলোয় প্রয়োজন বসার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো, ব্যয়াম বা শিশুদের খেলার সুবিধা, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবচেয়ে জরুরি এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা।

এ তালিকা অনুযায়ী অনেক কিছুই আমাদের নগরীতে নেই। অথচ এমন জায়গা থাকলে কিন্তু জীবনের ক্লান্তিকে নিমিষেই মুছে ফেলা যেতে পারে। দিতে পারে নতুন উদ্যমে নতুন দিন শুরু করার শক্তি। নগরপরিকল্পনায় গণপরিসরকে শহরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে মনে করা হয়। নগরের সুস্থতা এমনকি মানুষের মানসিক সুস্থতায় ভীষণ রকম ভূমিকা রাখে এ গণপরিসর। গণপরিসর সামাজিক সংযুক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। গণপরিসরের উপস্থিতি, উন্মুক্ততা, সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা ও তার সুবিধার ওপর নির্ভর করে সেই শহর কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, কতটা মানবিক আর কতটা উন্নত।

এই নগরী আমাদের সবার জন্য ঝকঝকে চকচকে রেস্টুরেন্টের বাইরে বন্ধু ও প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠার পর্যাপ্ত জায়গা এখনো রাখেনি সেটা সত্য। এখনো খোলা উদ্যানে একাকী নারী দিনের আলো ও সন্ধ্যারাতে নির্ভয়ে আনমনে হারিয়ে যেতে পারে না জানি। এখনো এ নগরীর বেশির ভাগ শিশুর খেলাধুলা মানেই মুঠোফোনের গেম আর বারান্দার গ্রিল থেকে পাশের বাসার জানালাটাই বাইরের পৃথিবী। আমাদের পূর্বসূরি বয়স্ক গুরুজনরা একরকম গৃহবন্দি জায়গায় প্রবেশগম্যতার অভাবে। এ নগরীতে নেই পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট। মানছি আমাদের নেই নির্ভরযোগ্য নগর ব্যবস্থাপনা।

আমরা কিন্তু এ সমস্যাগুলো নিয়ে থেমে নেই। ঢাকা মহানগরীর জন্য প্রণীত হচ্ছে বিশদ অঞ্চল-পরিকল্পনা। আশার কথা, সিটি করপোরেশনের কাজ এখন রাস্তা আর ড্রেনেই আটকে নেই। অনেক মাঠ ও পার্ক সংস্কার হয়েছে। এখনো হচ্ছে। সেগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা সবার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করতে হবে। এ নগরীতেই কিন্তু আছে দেশের আনাচে-কানাচে থেকে আসা উদ্যমী মানুষ। হাত-পা গুটিয়ে কেবল রাষ্ট্রের ঘাড়ে সব দায়দায়িত্ব না চাপিয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করে চলেছেন নতুন উদ্যোক্তারা। সামাজিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভূমিজ সমাধান এনেছে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন পরিষেবার, গার্বেজম্যান নিশ্চিত করছে টেকসই বর্জ ব্যবস্থাপনার। গড়ে উঠেছে মেয়ে নেটওয়ার্ক। মেয়েদের যেকোনো সেবা, পরামর্শের নির্ভরযোগ্য প্লাটফর্ম সাহস জোগাচ্ছে মেয়েদের, মায়েদের রোজকার ছুটে চলায়। এই নগরীর বেশির ভাগ মানুষ এখন ইন্টারনেটসহ নানা তথ্য-প্রযুক্তির আওতায় এসেছে। আমাদের নগরীর গল্পগুলো কিন্তু বদলে যেতে শুরু করেছে।

 

ফারহানা রশীদ: স্থপতি ও প্রতিষ্ঠাতা, ভূমিজ