করোনার কারণে বিশ্বে যেসব খাতে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে, তার মধ্যে বিমান পরিবহন সেবা অন্যতম। এর প্রভাব থেকে বাদ পড়েনি বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতও। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল সীমিত ও ক্ষেত্রবিশেষে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এ খাত। এরই মধ্যে একটি বেসরকারি এয়ারলাইনস তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। বাংলাদেশে এভিয়েশনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ খুব বেশি দিনের নয়। কেউই এখনো পরিণত হয়ে উঠতে পারেনি। করোনার আগে থেকেই বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। এর মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত ফি ও সারচার্জ নিয়ে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর অভিযোগ বহুদিনের। নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফি পরিশোধ করতে না পারলে বকেয়া পাওনার ওপর মাসিক ৬ শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপ করা হয়, যা চক্রবৃদ্ধি হারে বছরে ৭২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায় বলে খবর মিলছে। মাত্রাতিরিক্ত সারচার্জ পরিশোধ করতে না পারায় দেনার দায়ে দেউলিয়া অবস্থায় অনেক এয়ারলাইনস। সারচার্জ কমানোর জন্য সম্প্রতি বেসরকারি এয়ারলাইনসের সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি চিঠি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে দেয়া হয়েছে। করোনার সময়ে বেবিচক এয়ারলাইনসগুলোর ফি-সারচার্জ মওকুফ করেছিল বা কমিয়েছিল। এবারো তারা কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে প্রত্যাশা।

বাংলাদেশে বিমান চলাচল খাতের অনেক সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে টিকে থাকতে পারছে না বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো। অসম প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছে তারা। এয়ারক্রাফট ক্রয়ে উচ্চসুদের অর্থায়ন, বেশি দামের জেট ফুয়েল, এয়ারপোর্ট চার্জ, ভাড়ার প্রতিযোগিতা, যন্ত্রাংশ আমদানি, ব্যয়বহুল রক্ষণাবেক্ষণ, হ্যাঙ্গার, বন্ডেড ওয়্যারহাউজসহ বিভিন্ন বৈষম্যে নানা সংকট তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত নীতিসহায়তা, আর্থিক সক্ষমতার অভাব, ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, যুগোপযোগী ব্যবসায়িক কৌশলের অভাবসহ আরো নানা কারণে বিদেশী এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে গত ২২ বছরে লাইসেন্স পাওয়া অনেক এয়ারলাইনসকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হয়েছে। বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি কাজে লাগিয়ে দেশের এভিয়েশন শিল্পের বেশির ভাগই দখল করে আছে বিদেশী এয়ারলাইনস। বহির্গামী যাত্রীদের ৭০ শতাংশই বহন করছে বিদেশী এয়ারলাইনস। বিকাশমান এ বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশীয় এয়ারলাইনসের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা যেত।

দেশী-বিদেশী সব এয়ারলাইনসকে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ পরিশোধ করতে হয়। এ অর্থ দিয়েই বিমানবন্দর মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো হয়। ফি ও চার্জ আদায় ছাড়া বেবিচকের কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন। আবার মাত্রাতিরিক্ত ফি ও সারচার্জের কারণে বেসরকারি এয়ারলাইনসের সেবা বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়বে। বড় অভিযোগ হলো, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে সারচার্জ অনেক বেশি। বাংলাদেশের সারচার্জ বার্ষিক ৭২ শতাংশ, ভারতের ১২ থেকে ১৮, সিঙ্গাপুরের ৮, ওমানের ১০ ও পাকিস্তানের ২ শতাংশ। এয়ারলাইনসগুলো একবার বকেয়া সারচার্জের ঝুঁকিতে পড়ে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসার আর পথ থাকে না। বিষয়টি বেবিচক ও বেসরকারি এয়ারলাইনস কারো জন্যই সুখকর নয়। বছরের পর বছর অর্থ বকেয়া পড়ে থাকায় বেবিচকও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভ্যাট বাবদ তাদেরও অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, আবার বকেয়াও পাচ্ছে না। এদিকে বোঝা নিয়ে এয়ারলাইনসগুলোও সেবার মান বাড়াতে পারছে না। এর একটি যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন।

বেবিচক বলছে, সারচার্জ অর্থ মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে। বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ম্যান্ডেট ব্যক্তি খাতের ব্যবসা বিকাশে সহায়তা জোগানো। সেক্ষেত্রে সারচার্জের হার পুনরায় নির্ধারণে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করতে পারে। বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো বিপুল অংকের বোঝা নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কয়েকটি এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি এয়ারলাইনস তাদের অপারেশন বন্ধ রেখেছে। তাদের কাছেও বেবিচকের পাওনা কম নয়। এর মধ্যে সারচার্জের পরিমাণই বেশি। করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে গত বছর সারচার্জ মওকুফ করেছিল বেবিচক। এমন কোনো সিদ্ধান্ত এলে তা বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। এয়ারলাইনসগুলোরও উচিত দ্রুত বকেয়া পরিশোধ করা। বেবিচকের পাওনা সঠিক সময়ে সঠিকভাবে পরিশোধ করা হলে বিমানবন্দর পরিচালনায় দক্ষতা আরো বাড়ানো সম্ভব হতো। বেসরকারি এয়ারলাইনসের কাছে বিপুল অর্থ আটকে থাকায় বেবিচককেও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে কীভাবে উইন-উইন সিচুয়েশন নিশ্চিত করা যায়, তা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে এয়ারলাইনসের বিভিন্ন ফি হারও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী দেশী-বিদেশী সব এয়ারলাইনসকে উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং, পার্কিং, রুট নেভিগেশনসহ বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল খাতে বেবিচককে চার্জ  দিতে হয়। তবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এ চার্জ আরোপ করা হয় আলাদাভাবে। বাংলাদেশে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবহূত এয়ারক্রাফটের ক্ষেত্রে বিদেশ প্রত্যাগত ফ্লাইটের জন্য ডমেস্টিকের তুলনায় প্রকারভেদে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ প্রায় ৫ থেকে ১৪ গুণ বেশি। এতে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনায় নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এছাড়া পার্কিং চার্জও বিদেশী এয়ারলাইনসের মতো সমহারে দিতে হচ্ছে। অথচ ভারতে তাদের দেশীয় এয়ারলাইনসের স্বার্থে ৮০ আসনের নিচের কোনো উড়োজাহাজের জন্য ল্যান্ডিং চার্জ দিতে হয় না। সরকারি-বেসরকারি এয়ারলাইনসের জন্য দেশের বিমানবন্দরে কোনো হ্যাঙ্গার সুবিধা নেই। মেইনটেন্যান্স চেকআপ, সি চেক, ডি চেক, এ চেকসহ নানা প্রকার চেকের জন্য তাদের বিদেশে পাড়ি দিতে হচ্ছে। হ্যাঙ্গার সুবিধা থাকলে প্রতি বছর বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর অর্থ সাশ্রয় হতো। গত কয়েক বছর অ্যারোনটিক্যাল চার্জ কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিল এয়ারলাইনসগুলো। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণের সমান রেটে চার্জ নির্ধারণ করা যেতে পারে। অন্যান্য দেশ নিজস্ব এয়ারলাইনসকে সুবিধা দেয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ চার্জ মওকুফ করেছে, যা প্রতিবেশী ভারতেও বিদ্যমান। কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্বমানচিত্রে একটি ক্রমবর্ধমান হাবে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এ খাত সম্পূর্ণই বিদেশী স্বনামধন্য কার্গো বিমান সংস্থার নিয়ন্ত্রণে। এক্ষেত্রে দেশী কোনো বিকল্প এয়ারলাইনস এখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। যদিও কিছু কার্গো এয়ারলাইনস বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ডানা মেলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক স্থাপনের অদক্ষতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে সাফল্য লাভ করতে পারেনি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি এয়ারলাইনস ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নানা সুবিধা দিচ্ছে। ভারতের এয়ারলাইনসগুলোর জন্য মোদি সরকার ‘উড়াল’ নামে একটি স্কিম চালু করেছে, যেখানে দেশীয় এয়ারলাইনসের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশও বিশেষত করোনার প্রভাব প্রশমনে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। বাংলাদেশে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানি করতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রয়োজন। পাশাপাশি এভিয়েশন খাতের বিকাশে সরকারের পর্যাপ্ত নীতিসহায়তা জোগাতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর বিকাশে সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। উদ্যোক্তাদেরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। এ ব্যাপারে ভারতের সাফল্য বিগত পাঁচ বছরে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। আমরা ভারতের গৃহীত কর্মপন্থা এবং নীতিসহায়তা অনুসরণ করে অবশ্যই সাফল্যের মুখ দেখতে পারি। এ খাতে যেমন পর্বতপ্রমাণ সমস্যা বিদ্যমান, তেমনি আছে সীমাহীন সম্ভাবনা। বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে শুরু থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মুখে আজ পর্যন্ত খাতটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি এবং সাফল্যের মুখ দেখেনি। কিন্তু দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এ খাত নীরব ভূমিকা পালন করে। তাই একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সাফল্যজনক বেসরকারি এয়ারলাইনস খাতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এর উদ্যোক্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার এবং অংশীদারদের একসঙ্গে ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।