বিজ্ঞানী A. W. Hedrich ১৯৩৩ সালে American Journal of Epidemiology-এর তৃতীয় সংখ্যায় Epidemiology of measles in Baltimore সম্পর্কে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ওই বিজ্ঞানী তার গবেষণায় দেখতে পান যে অনেক শিশু হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধী বা অনাক্রম্য হয়ে উঠছে। ফলে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের মধ্যে নতুন করে হামে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে। স্বাভাবিক কোনো ঘটনা হিসেবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’র ধারণা সর্বপ্রথম এই প্রবন্ধের মাধ্যমেই উল্লেখ করেন A. W. Hedrich। হার্ড ইমিউনিটি একটি রোগতত্ত্ববিষয়ক ধারণা, যা এমন এক অবস্থাকে বর্ণনা করে, যেখানে একটি জনগোষ্ঠীর যথেষ্টসংখ্যক মানুষ কোনো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে এমনভাবে প্রতিরোধী হয় যে সংক্রমণটি আর ছড়ায় না, এমনকি সংবেদনশীলদের মধ্যেও। অর্থাৎ যেসব লোক কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনে অক্ষম, তারাও ওই রোগ থেকে অন্যদের সঙ্গে একইভাবে সুরক্ষিত থাকবে।

এবার হার্ড ইমিউনিটির ধারণাকে আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। ধরুন কেউ একজন একটি সংক্রামক ভাইরাসে আক্রান্ত হলো। এরপর কয়েক দিন সে কিছুসংখ্যক সুস্থ লোকের সংস্পর্শে এল। সংক্রামক হওয়ার কারণে ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষগুলোকেও সংক্রমিত করতে পারে। সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ যদি ভাইরাসটির প্রতি সংক্রমণ প্রতিরোধী হয়, তবে এটি তাকে সংক্রমিত করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, সেই প্রতিরোধী ব্যক্তির মাধ্যমে অন্য আরেকজনকে—সংবেদনশীল হলেও—সংক্রমিত করা সম্ভব হবে না। এভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি যাদের সংস্পর্শে আসবে, তাদের মধ্যে ওই সংক্রমণ প্রতিরোধীর সংখ্যা যত বেশি হবে, সংবেদনশীলদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর সুযোগ তত কমে যাবে। তখন ভাইরাসটি নিজেকে ওই জনসংখ্যার মধ্যে টিকিয়ে রাখতে পর্যাপ্তসংখ্যক সংবেদী লোক পাবে না। ফলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বন্ধ হবে, এমনকি যারা সংবেদনশীল তাদের মধ্যেও। একটি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষকে এভাবে কোনো বিশেষ সংক্রমণের প্রতি প্রতিরোধী বানিয়ে অন্য যারা সংবেদনশীল, তাদেরকে সংক্রমণের হাত থেকে পরোক্ষ সুরক্ষা প্রদান করাকে হার্ড ইমিউনিটি বলে। হার্ড ইমিউনিটিকে বর্তমানে কমিউনিটি ইমিউনিটি, পপুলেশন ইমিউনিটি বা সোস্যাল ইমিউনিটিও বলা হয়। কোনো সমাজে সংক্রমণ প্রতিরোধী ব্যক্তির সংখ্যানুপাত যত বেশি হবে, সেখানে সংবেদনশীল ব্যক্তি সংক্রামক ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার সুযোগ তত কমে যাবে। এতে সম্ভাব্য সংক্রমণ থেকে সংবেদী লোকরা সুরক্ষা পাবে। হার্ড ইমিউনিটির মাধ্যমে মূলত সুরক্ষা পায় অতি অল্প বয়সী শিশু, যাদের ভ্যাকসিন বা টিকা দেয়া যায় না; ইমিউনোকম্প্রোমাইজড রোগী, যাদের ভ্যাকসিন নেয়া বারণ; প্রবীণ, যারা কোনো ভ্যাকসিন প্রয়োগের পরেও পর্যাপ্ত প্রতিরোধ তৈরি করতে পারেন না; এমন ব্যক্তি, যাদের ভ্যাকসিনের মাধ্যমে অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে; সেসব ব্যক্তি, যাদের ভ্যাকসিন কর্মসূচির আওতায় আসার উপায় নেই এবং সেসব লোক, যারা স্বেচ্ছায় ভ্যাকসিন গ্রহণ থেকে বিরত থাকে।

সংক্রামক রোগ-জীবাণুর জীবনাচরণ যদি না বদলায়, তবে একবার হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হলে কোনো জনগোষ্ঠীতে ওই রোগের সংক্রমণ ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। এভাবে সংক্রমণ সংখ্যা স্থায়ীভাবে ‘শূন্যে’ নেমে এলে রোগটি সারা পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ অপসারিত হয় এবং এ অবস্থায় রোগটি ‘নির্মূল’ হয়েছে বলে গণ্য করা হয়। হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের মধ্য দিয়ে ১৯৮০ সালে পৃথিবী থেকে গুটি বসন্ত সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। হার্ড ইমিউনিটি সব সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী, এমনটি কিন্তু নয়। কেবল মানুষের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়, এমন ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর হয়। যেমন হাম, পোলিও, মাম্পস, জল বসন্ত, গুটি বসন্ত, ইবোলা ইত্যাদি।  পক্ষান্তরে কোনো সংক্রামক রোগ যদি সংক্রামক হয়েও ছোঁয়াচে না হয় অর্থাৎ মানুষের সংস্পর্শের মাধ্যমে না ছড়ায়, তবে সেক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি ধারণাটি প্রযোজ্য হয় না, যেমন টিটেনাস। কোনো লোকালয়ে যদি স্থানীয়ভাবে হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হয়, তবে তা ততক্ষণই কার্যকর থাকবে যতক্ষণ ওই এলাকা অন্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। বর্তমানে আমরা অত্যন্ত গতিময় এক সমাজে বাস করি। এখানে যদি লোকজন মুক্তভাবে ঘোরাঘুরি করতে পারে, যদি লোকেরা বাস, ট্রেন ও প্লেনে উঠে স্বাভাবিক সময়ের মতো অন্য সব অঞ্চল ঘুরে বেড়ানো শুরু করে, তবে ‘স্থানীয় হার্ড ইমিউনিটি’ বলে কিছুই থাকবে না।

এবার আমরা পরিচিত হব ‘হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ডস’-এর সঙ্গে। এই পরিচিতির আগে আমাদের ‘রোগ সংক্রামকতা’র সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার। প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি সংবেদনশীল কোনো জনগোষ্ঠীর কতজনকে নতুন করে সংক্রমিত করতে পারে, তা দ্বারা ওই রোগের সংক্রামকতা নির্দেশ করা হয়। গাণিতিক প্যারামিটার R0 (Basic reproduction number)-কে সংক্রামকতার পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। R0-এর মান থেকে একটি রোগ কোনো জনগোষ্ঠীতে কত দ্রুত এবং কী পরিমাণে বিস্তার লাভ করবে, সে ধারণা পাওয়া যায়। R0-এর মান ১-এর অধিক হলে সংক্রমণ দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করবে। R0-এর মান ১-এর কম হলে সংক্রমণটি স্থায়ী হবে না। আবার R0-এর মান ১-এর সমান হলে (একজন আক্রান্ত কেবল নতুন একজনকে সংক্রমিত করতে পারবে) রোগ ছড়ানোর গতি স্থিতিশীল থাকবে। R0-এর মান যত বড় হয়, রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা তত কঠিন হয়ে পড়ে। R0-এর মান দেখেই কোনো রোগ সম্পর্কে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তাহলে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড আসলে কী? কোনো জনগোষ্ঠীতে সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ব্যক্তির সংখ্যানুপাত একটি নির্দিষ্ট মানের চেয়ে বেশি হলেই কেবল রোগটি আর ছড়াতে পারে না। প্রতিরোধী ব্যক্তির সংখ্যানুপাতের এই সর্বনিম্ন মানকেই ওই রোগের জন্য ওই জনগোষ্ঠীর ‘হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড বা প্রান্তিক মান (pc)’ বলা হয়। রুবেলার হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড ৮৩-৮৫ শতাংশ, যার অর্থ হার্ড ইমিউনিটি প্রদর্শনের জন্য জনগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৮৩-৮৫ শতাংশ মানুষকে রুবেলার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। মনে রাখা দরকার হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড সব সংক্রামক রোগের জন্য এক রকম হয় না। কারণ রোগ বিস্তারে সব সংক্রামক রোগ সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

R0-এর মান থেকে ‘pc=1-1/R0’ গাণিতিক সমীকরণের সাহায্যে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড, pc নির্ণয় করা হয়। (সমীকরণ মতে, যে রোগের R0 = 2, তার হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড ৫০ শতাংশ; আবার যার  R0 = 10, তার হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড ৯০%)। R0-র মান কম হলে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড কম হয় এবং R0-এর মান বেশি হলে ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ডও বেড়ে যায়। বাস্তবিক উদাহরণ হিসেবে হাম ও পোলিও এখানে প্রাসঙ্গিক। উচ্চমাত্রায় সংক্রামক হামের R0 = 12-18, অর্থাৎ একজন সংক্রমিত ব্যক্তি গড়ে অন্য ১২-১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমণ ছড়াতে পারে। হিসাব করে দেখা গেছে হামের হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড ৯২-৯৪ শতাংশ। অনুরূপভাবে তুলনামূলক কম সংক্রামক হওয়ায় পোলিওর R0 = 6-8 এবং হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড ৮০-৮৬ শতাংশ।

এবার আসা যাক কভিড-১৯ প্রসঙ্গে। SARS-CoV-2 বা নভেল করোনাভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট কভিড-১৯ রোগটি চীনের উহানে সর্বপ্রথম শনাক্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে কভিড-১৯-কে বিশ্বমহামারী ঘোষণা করেছে। ওয়ার্ল্ভ্রোমিটারের তথ্যমতে, ৯ মে পর্যন্ত পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রাণহানি পৌনে তিন লাখ এবং আক্রান্ত ৪০ লাখ অতিক্রম করেছে। ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে ভাইরাসটি। আর প্রতিনিয়ত হু-হু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। এ বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর এখানেও বেড়েছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ৯ মে পর্যন্ত পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৩ হাজার ৭৭০ জন আক্রান্ত এবং ২১৪ জন মৃত্যুবরণ করেছে। আতঙ্কের বিষয় হলো, SARS-CoV-2 একটি নতুন ভাইরাস; যা আগে কখনো সংক্রমিত করেনি। যার অর্থ প্রত্যেকেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, কভিড-১৯-এর সংক্রামকতা মৌসুমি ফ্লু (seasonal flu, R0=1.3)-এর চেয়ে অধিক কিন্তু হামের (R0=12-18) চেয়ে কম। এ-যাবৎ প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফল ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়, কভিড-১৯-এর R0-এর গড় মান ২ থেকে ২ দশমিক ৫-এর মধ্যে (কোনো কোনো গবেষক দলের রিপোর্ট মতে এই মান ২ থেকে ৩)। এর অর্থ একজন কভিড-১৯ সংক্রমিত ব্যক্তি গড়ে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ জনকে নতুনভাবে সংক্রমিত করে। রোগতত্ত্ববিদদের অনেকের মতে, সক্রিয় হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য মোট জনগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৬০ শতাংশকে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধী হতে হবে। যুক্তরাজ্য সরকারের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা Sir Patrick Vallance এ বিষয়ে সহমত হলেও গবেষকদের অনেকে মনে করেন যে এ সংখ্যা আরো অধিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল মেডিসিন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ Dr. Joseph Vinetz-এর মতে, এ সংখ্যা ৭০ শতাংশ।

এখন প্রশ্ন, জনগোষ্ঠীর এই ৬০-৭০ শতাংশ কীভাবে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর (৬০-৭০%) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের জন্য আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে—১. কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে নিজে নিজেই সেরে ওঠা অথবা ২. SARS-CoV-2 ভাইরাসের বিরুদ্ধে সঠিক ও কার্যকরী ভ্যাকসিন উত্পাদন এবং সফল প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধী হওয়া। এ দুটির যেকোনো একটি অথবা উভয় উপায়ে ৬০-৭০ শতাংশ লোক রোগ প্রতিরোধে সক্ষমতা অর্জন করলেই কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি কার্যকর হবে।

প্রথমেই বিবেচনা করা যাক প্রথম উপায় তথা কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে নিজে নিজেই সেরে ওঠার বিষয়টি। সারা বিশ্বে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও এভাবে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের সম্ভাব্যতা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। একবার সংক্রামক ব্যাধিতে স্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত হয়ে নিজে নিজেই সেরে উঠলে দেহে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি উত্পন্ন হয়, যার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি সক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই উপায়ে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য জনসংখ্যার কমপক্ষে ৬০ শতাংশকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় SARS-CoV-2 দ্বারা সংক্রমিত হয়ে নিজে নিজেই সেরে উঠতে হবে। যুক্তরাজ্যের সেন্টার ফর এভিডেন্স বেজড মেডিসিনের (সিইবিএম) তথ্যমতে, SARS-CoV-2-এর ‘সংক্রমিতদের মৃত্যুহার’ মোটামুটি শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক শূন্য শতাংশ। সুতরাং এক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠী SARS-CoV-2-এ আক্রান্ত হলে মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ মৃত্যুবরণ করবে।

উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের কথাই ধরা যেতে পারে। কভিড-১৯ হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হলে ১৬ কোটি মানুষের ৬০-৭০ শতাংশ অর্থাৎ কমবেশি ১০ কোটি মানুষকে SARS-CoV-2  দ্বারা সংক্রমিত হয়ে পুনরায় নিজে নিজেই সুস্থ হতে হবে। উল্লিখিত ‘সংক্রমিতদের মৃত্যুহার’ হিসাব করলে দেখা যায়, এ সময়ে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করবে; যা এক সর্বনাশা বিপর্যয় ডেকে আনবে। উল্লেখ্য, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সংক্রমিতদের মৃত্যুহার আরো অধিক। শুধু তাই নয়, যদি আক্রান্তদের ১০ শতাংশকেও হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিত্সা দেয়ার প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রেও বিপুলসংখ্যক রোগীর ধকল সইতে হবে দেশকে; যা সামলানো যে কত কঠিন, তা আমরা এরই মধ্যে অনেক উন্নত দেশেও প্রত্যক্ষ করেছি। এভাবে রোগ ছড়াতে দিলে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকবে যারা বৃদ্ধ, বিভিন্ন কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অপরিপক্ব বা দুর্বল এবং যাদের অন্যান্য কো-মরবিডিটি রয়েছে। শুধু তাই নয়, যেসব দেশে মানসম্মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সুলভ নয়, সেসব দেশে এ পদ্ধতি অবলম্বন করলে অনেক বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ঘটবে। তাই এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে মরণঘাতী কভিড-১৯-এ স্বাভাবিকভাবে সংক্রমিত হতে দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার প্রচেষ্টা আক্ষরিক অর্থেই ঝুঁকিপূর্ণ এবং আত্মঘাতী।

বিশ্বে প্রথমবারের মতো প্রাদুর্ভাব ঘটার কারণে বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসের জীবনাচরণ এখনো পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেননি। কভিড-১৯ সম্পর্কে মানুষের এ পর্যন্ত অর্জিত জ্ঞানের অধিকাংশই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এপিডেমিওলজি ও বায়োস্ট্যাটিকসের অধ্যাপক Greta Bauer সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে দেয়া সাক্ষাত্কারে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়ার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন। এই পথে ইমিউনিটি তৈরির সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা নিয়ে আরো অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিম্নে এ সীমাবদ্ধতাগুলো অতিসংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

১. অ্যান্টিবডি কর্তৃক ইমিউনিটি তৈরির অনিশ্চয়তা: SARS-CoV-2 দ্বারা সংক্রমিত হয়ে নিজে নিজেই সুস্থ হয়ে উঠলে শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্থায়িত্বকাল এখনো অজানা। দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ শক্তি হার্ড ইমিউনিটির পূর্বশর্ত। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।

২. পুনর্সংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনা: ভাইরাস সংক্রমণ থেকে আরোগ্য লাভ করে পুনর্সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা বিরল নয়। অনেক সময় পরীক্ষার ভুল ফলাফলের কারণেও পুনর্সংক্রমণ হয়েছে বলে মনে হতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের বেলায় পুনর্সংক্রমণ ঘটতে দেখা গেছে, যা কখনো কখনো প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে অর্জিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থায়ী নয়, বরং মৌসুমি। কভিড-১৯-এর বেলায় পুনর্সংক্রমণ হবে কিনা, হলেও রোগের তীব্রতা কেমন হবে—এখনো তা জানা যায়নি। সাধারণত প্রথম সংক্রমণের ফলে উত্পাদিত অ্যান্টিবডি দ্বিতীয়বার সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।

৩. আক্রান্তের দেহে ভাইরাস থেকে যাওয়া: কখনো কখনো দেখা গেছে সুস্থ হওয়ার পরেও চিকেন পক্স, হেপাটাইটিস-বি ইত্যাদি ভাইরাস রোগীর দেহ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ হয় না। আক্রান্তের দেহের কোনো অংশে চুপচাপ থেকে পরবর্তী সময়ে সুযোগ বুঝে পুনর্বার রোগ তৈরি করে। কভিড-১৯ রোগীর দেহেও এ ভাইরাস থেকে যাবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

৪. কম বয়সীদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা: যেকোনো বয়সের মানুষই এ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। কম বয়সীদেরও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমেরিকার সিডিসির দেয়া হিসাব মতে, ২০-৪৪ বছর বয়সী আক্রান্তদের প্রতি পাঁচ-ছয়জনের একজনকে হাসপাতালে ভর্তির দরকার হয়েছে। ব্যাপক হারে সংক্রমণ হতে দিলে এ ঝুঁকি আরো বেড়ে যাবে। আর তাই কভিড-১৯ রোগীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে অনেক বেশি পরিমাণে হাসপাতাল বেড এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির প্রয়োজন পড়বে।

৫. সেরে ওঠা রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি: মৃত্যুঝুঁকিসহ আরো কিছু উপসর্গ, যেমন জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট এসবের কথা এরই মধ্যে জানা গেছে। পত্রপত্রিকার রিপোর্টে এরই মধ্যে আরো কিছু জটিল নতুন উপসর্গ, যেমন ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধা, হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক ইত্যাদির কথা জানা গেছে। অনুরূপভাবে এ রোগের ফলে অন্য কী কী জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে, তার পূর্ণ চিত্র এখনো অজানা। তাই একবার আক্রান্ত হয়ে আপাত সুস্থ হলেও পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটুকু, তা পরিষ্কার নয়।

৬. মৃদু লক্ষণের রোগীর সম্ভাব্য ঝুঁকি: কভিড-১৯ রোগীদের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন না হলে পেশাদার স্বাস্থ্যসেবীরা তাদের ‘মাইল্ড কেস’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই মাইল্ড কেস কতদিন মাইল্ড থাকবে? এসব মাইল্ড কেস সত্যিকারেই ঝুঁকিবিহীন হালকা হতে পারে আবার নিউমোনিয়া অন্তর্ভুক্ত হয়ে মারাত্মক রূপও ধারণ করতে পারে।

৭. শর্টকাটে ইমিউনিটি অর্জনের ঝুঁকি: হার্ড ইমিউনিটির জন্য জনগণের বিপুল অংশকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে হয়। হুলুস্থুল কাণ্ড করে দ্রুত এই অর্জন সম্ভব নয়। এতে কেবল অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ অনিচ্ছাকৃত সংক্রমণের শিকার হয়ে হাসপাতালের বোঝা বাড়াবে। এ সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে গেলে ঝুঁকিগ্রস্তরা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে।

৮. SARS-CoV-2 ভাইরাসের এ জেনেটিক পরিবর্তন: প্রথমবার সংক্রমণের ফলে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে, তা ভাইরাস যদি জেনেটিক মিউটেশনের ফলে পরিবর্তিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে কার্যকর না-ও হতে পারে।

উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন যে বর্ণিত প্রায় সব সীমাবদ্ধতা কভিড-১৯ সম্পর্কে আমাদের অপর্যাপ্ত জ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ অবস্থায় কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়া ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সংক্রমিত হতে দেয়ার মানে SARS-CoV-2 ভাইরাসকে তার ইচ্ছেমতো তাণ্ডব চালাতে দেয়া; যা সঠিক নয় বলেই মনে করেন অধিকাংশ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এ বিষয়ে অধ্যাপক Greta Bauer-এর মতও অভিন্ন। ইংল্যান্ড ও সুইডেন প্রথমে এই পথে হাঁটার চিন্তাভাবনা করে পরবর্তীতে সরে এসেছে। আমরাও মনে করি, কভিড-১৯ সংক্রমণের বর্তমান স্তরে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের কৌশল হিসেবে ইচ্ছাকৃত সংক্রমণের কথা চিন্তা করা অপরিপক্বতার পরিচায়ক। কাজেই হার্ড ইমিউনিটির জন্য দ্বিতীয় উপায়টিই এখন পর্যন্ত আমাদের ভরসা!  [চলবে]

 

ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান: অধ্যাপক, ফার্মেসি ডিসিপ্লিন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়