আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি। ইতিহাসের পথযাত্রায় নিঃসন্দেহে এটি একটি মহতী মাইলফলক। এ সময়ে অন্যসব বিষয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রযাত্রা, সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। গত পাঁচ দশকের অভিযাত্রায় স্বাস্থ্যসেবার সফলতার জায়গাগুলো অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। অন্যদিকে যেসব প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রজাতন্ত্রের মূল মালিকদের প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হয়েছে সেগুলোকেও চিহ্নিত করা জরুরি। আমাদের বিদ্যমান বাধা দূর করে অগ্রযাত্রার পথ অনুসন্ধান করতে হবে। সবাই জানি, দেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য হলো উন্নয়নযাত্রার পূর্বশর্ত।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা হয়। গত ৫০ বছরে স্বাস্থ্যসেবা খাতে উল্লেখ করার মতো অনেকগুলো অর্জনের মাইলফলক আমাদের রয়েছে। ১৯৭০ সালে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৫২ বছর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৮ বছর। এর মধ্যে পুরুষের ৭১ দশমিক ২ বছর এবং নারীর গড় আয়ু ৭৪ দশমিক ৫ বছর। ১৯৭০-এর দশকে প্রতি এক হাজারে নবজাতকের মৃত্যুর হার ছিল ১৫০। এখন সে হার কমে হয়েছে ১৭ দশমিক ১। চার দশক আগে সন্তান জন্মদানের সময় প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে ৮০০ জন মারা যেত। চলতি বছর ৭ জানুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এ হার বর্তমানে ১৬৫-তে নেমে এসেছে। শিশুদের পাঁচটি সংক্রামক রোগপ্রতিরোধী টিকা বা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারা পৃথিবীতে রোল মডেল হিসেবে সম্মানিত হয়েছে। পোলিও মুক্ত দেশের তালিকায় একটি উজ্জ্বল নাম হচ্ছে বাংলাদেশ। গত পাঁচ দশকে দেশে সংক্রামক রোগের প্রকোপ অনেক কমে এসেছে। নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য, শিশু ও নারীর পুষ্টির ক্ষেত্রে বিপুল অগ্রগতি হয়েছে। মেডিকেল শিক্ষা, নার্সিং শিক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের অর্জন উল্লেখযোগ্য। প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরি করার ধারাবাহিকতায় দেশে প্রায় ১৩ হাজারের মতো কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরি হয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় হাসপাতাল (প্রাইমারি হাসপাতাল) এবং প্রতিটি জেলায় জেলা হাসপাতাল (সেকেন্ডারি হাসপাতাল) স্থাপন করা হয়েছে। রাজধানী, বিভাগীয় শহর এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো মূলত টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতাল। বর্তমানে দেশে ১১০টির মতো মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গত ৫০ বছরে পৃথিবীতে বিপুল এবং অচিন্তনীয় পরিবর্তন ও অগ্রগতি ঘটে গিয়েছে। সময়ের সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের স্বাস্থ্যযাত্রা কি সন্তোষজনক গতিতে সামনে চলতে পেরেছে? স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন কি সুসমন্বিত এবং জনচাহিদা পূরণ করতে সক্ষম? একজন মানুষের শরীরে অনেকগুলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে। মানুষটির একটি হাত, একটি পা ও দুটি কানসহ বেশকিছু অঙ্গ সুস্থ আছে কিন্তু বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সুস্থ বা কর্মোপযোগী নয়। এ অবস্থায় মানুষটিকে আমরা সুস্থ বলতে পারি কি? অবশ্যই না। কেবল সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকলেই ব্যক্তিটির শরীরকে সুস্থ বলা যাবে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও তদ্রূপ। আলোচনার সুবিধার্থে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার একটি গ্রামকে ঠিক করা হলো। গ্রামটির নাম ছনকা। এর পাশের গ্রামের নাম বরাইদ। সাধারণভাবে দুটি গ্রামকে একত্রে লোকজন ‘ছনকা-বরাইদ’ নামে ডাকে। এ গ্রাম থেকে সাটুরিয়া উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের দূরত্ব নিদেনপক্ষে ছয় মাইল বা নয় কিলোমিটার। অন্য উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের অবস্থান আরো দূরে। ছনকা থেকে সাটুরিয়া উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে যেতে ধলেশ্বরী নদী পার হতে হয়। একমাত্র বাহন হচ্ছে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল। এছাড়া পদব্রজ, রিকশা ইত্যাদির ব্রেক জার্নি করেও উপজেলা হাসপাতালে যাওয়া যায়। পথের অবস্থা বিবেচনায় মোটরসাইকেলে সময় লাগে ১ ঘণ্টার মতো এবং ব্রেক জার্নিতে ঘণ্টা তিনেক। ছনকা বা বরাইদ গ্রামের কোনো ব্যক্তির হার্ট অ্যাটাকসহ যাবতীয় জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে কোথায় যাবে বা কী করবে? বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রামের অবস্থা ছনকা বা বরাইদ গ্রামের মতো। জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য হাওর, বাঁওড়, চরাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকার মতো ‘হার্ড টু রিচ’ এলাকার কথা আলোচনায় না আনাই স্বস্তিকর। তথ্যের চিত্র খুঁড়ে কে হায় বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

জরুরি চিকিৎসাসেবা নামের একটি ব্যবস্থা চিকিৎসা ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এর প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচনা করা নিতান্তই বাহুল্য। জরুরি ও জটিল রোগীর চিকিৎসার জন্য কার্যকর রেফারেল পদ্ধতি গড়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কমিউনিটি ক্লিনিক বা মেডিকেল সাবসেন্টার থেকে উপজেলা হাসপাতাল, উপজেলা থেকে জেলা হাসপাতাল এবং জেলা থেকে টারশিয়ারি অথবা বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত কার্যকর একটি রেফারেল পদ্ধতি এখন পর্যন্ত গড়ে উঠেনি। ফলে চিকিৎসা কার্যক্রমে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছে। জরুরি চিকিৎসাসেবার বিষয়ে বলা যায়—এক্ষেত্রে জীবনকে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়।

অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে জনসাধারণের জন্য সমতার ভিত্তিতে একটি অর্থসাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ সরকার অপরিহার্য স্বাস্থ্যসেবার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত মোট সাতটি সেবা। এগুলো হচ্ছে ১. মাতৃস্বাস্থ্য এবং নবজাতকের স্বাস্থ্য, ২. শিশুস্বাস্থ্য ও টিকা প্রদান, ৩. পুষ্টি, ৪. সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, ৫. মানসিক স্বাস্থ্য, ৬. পঙ্গুত্ব এবং ৭. অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ। স্বাস্থ্যসেবার এই প্যাকেজটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে জনগণের স্বাস্থ্যসেবার বিপ্লব সাধন হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই প্যাকেজের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কত অংশের বাস্তবায়ন হয়নি সেটা দেশের জনসাধারণ জানে না বা তাদের জানানো হয় না।

স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হচ্ছে প্রতিরোধী স্বাস্থ্যসেবা বা পাবলিক হেলথ বিভাগ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত পাবলিক হেলথ বা প্রতিরোধী স্বাস্থ্যসেবা একেবারেই গড়ে ওঠেনি। করোনা মহামারী শুরুর পর থেকে দেশের মানুষজন বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারে। দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হাসপাতালের বেড, আইসিইউর শয্যা, অক্সিজেন, ডাক্তার, নার্স ইত্যাদি বুঝেছে এবং বুঝিয়েছে। করোনা একটি সংক্রামক রোগ এবং জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে রোগটির গতিবিধি ভালোমতো বুঝতে হবে। প্রতিরোধ প্রস্তুতির জন্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে মহামারীর একটি প্রাক্কলিত চিত্র বা প্রজেকশন প্ল্যান তৈরি করতে হয়। সেই অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ কৌশল নির্মাণ করা হয়। বাংলাদেশে করোনাবিষয়ক একটি জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে। একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অথবা সংক্রামক রোগতত্ত্ববিদকে এই কমিটির সভাপতি হিসেবে নির্বাচন করা উচিত। কিন্তু বর্তমানে কমিটির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে। এই কমিটিতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে রোগ-চিকিৎসায় যুক্ত প্রতিটি বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন করে সদস্য থাকবেন। দেখা যাচ্ছে, করোনাযুদ্ধে যাদের সেনাপতিত্ব করার কথা, তারা রয়েছেন সবার পিছনে। ফলে যুদ্ধে তার প্রতিফলন ঘটতে বাধ্য। বাস্তবে সেটাই হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, চিকিৎসাসেবা হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার একটি মাত্র শাখা, অবশ্যই প্রধানতম শাখা। স্বাস্থ্যসেবাকে বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে জনস্বাস্থ্য বা প্রতিরোধী স্বাস্থ্যসেবা, প্রমোটিভ স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাসেবা, পুনর্বাসনমূলক সেবা এবং উপশমকারী সেবা। পুরো বিষয়টি আমাদের নীতিনির্ধারকদের মাথায় নেই, তাদের কাজেও এ অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রতিফলিত হয়।

গত ৫০ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে ‘অব্যবস্থাপনা’। এ অভিযোগ কেন উত্থাপিত হয়? সত্যিকার অর্থেই দেশে পেশাদার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তৃণমূল থেকে যত উপরে যাওয়া যায়, এ অব্যবস্থাপনার চিত্র তত পরিষ্কার হয়ে ফুটে ওঠে। বাংলাদেশে জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে থাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মহাপরিচালক হলেন অধিদপ্তরের প্রধান নির্বাহী। গত অনেকগুলো মহাপরিচালক পদাধিকারীর দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, এরা সবাই অ্যানাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফিজিওলজি, মেডিসিন, সার্জারি, চক্ষু ইত্যাদি কোনো না কোনো বিষয়ের অধ্যাপক ছিলেন। সেখান থেকে তাদের মহাপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়। যাকে বলা হয় পার্শ্ব-প্রবেশ বা ল্যাটারাল এন্ট্রি। প্রবেশ-পদ বা এন্ট্রি পোস্ট থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে, যোগ্যতার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়ে, প্রমোশন পেয়ে পেয়ে কেউ মহাপরিচালক পদে আসীন হননি। স্বাস্থ্য ক্যাডারে চাকরিতে প্রবেশ-পদ হচ্ছে অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন। পদটি স্থানভেদে মেডিকেল অফিসার, লেকচারারসহ নানা নামে পরিচিত। একজন মেডিকেল অফিসার চাকরি জীবনের শুরুতে ইউনিয়ন পর্যায়ের মেডিকেল সাব-সেন্টার অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন। এদের মধ্যে যারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রমোশন দিয়ে ক্রমান্বয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক, সহকারী সিভিল সার্জন, সিভিল সার্জন/সহকারী পরিচালক, ডেপুটি পরিচালক, পরিচালক, যুগ্ম মহাপরিচালক এবং মহাপরিচালক পদে পদায়ন করা প্রয়োজন। গত ৫০ বছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ পদগুলো ‘ঠেকা কাজ’ চালানো বা অ্যাডহক ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়েছে। পুরো বিষয়টিকে এখন দ্রুত নিয়মিত করা সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ চিকিৎসকের রোগী দেখা নিয়ে দেশের মানুষ সন্তুষ্ট নয়। তারা মনে করে, চিকিৎসকরা আন্তরিকভাবে রোগী দেখেন না। অন্যদিকে চিকিৎসকরা মনে করে, লোকজন তাদের ঠিকভাবে মূল্যায়ন করে না। রোগীর চিকিৎসা একই সঙ্গে শুদ্ধ বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের যৌথ প্রয়োগ। মেডিকেল সায়েন্স হচ্ছে শুদ্ধ বিজ্ঞান। কিন্তু যে মানুষটিকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে সে এবং তার স্বজনদের সঙ্গে ব্যবহারের বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানের অন্তর্গত। আমাদের মেডিকেল শিক্ষা কারিকুলাম এবং ট্রেনিংয়ে ম্যানুয়েলে রোগী দেখার বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। জনবান্ধব ডাক্তার তৈরি করতে হলে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিদ্যমান সমাজমনস্কতা ও সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে হবে।

দেশে রোগীর চিকিৎসা নিয়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মারামারি, ভাংচুরের মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এসব ক্ষেত্রে রোগীর সঙ্গের লোকজন, চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে। এ রকম অনভিপ্রেত ঘটনা রোধে ‘চিকিৎসা সুরক্ষা’ আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ আইনে রোগী, ডাক্তার ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।

স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ টিম ওয়ার্ক। এই টিমের প্রধান হবেন একজন চিকিৎসক। তার সঙ্গে তিনজন নার্স থাকবেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি টিমে মোট ২২ জনের মতো প্রশিক্ষিত সদস্য থাকবেন। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জনসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমাণ চিকিৎসক থাকা দরকার, বাংলাদেশে চিকিৎসক রয়েছেন তার অর্ধেক। এখানে প্রতিজন চিকিৎসকের সঙ্গে আছে শূন্য দশমিক ৭ জন নার্স। অন্যান্য জনবলের সংখ্যা এতটাই অপ্রতুল যে তা নিয়ে আলোচনা করা যায় না। কর্তৃপক্ষের দিক থেকে জনসাধারণকে লাগাতারভাবে ধারণা দেয়া হয়েছে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে সমার্থক। ভুল ধারণার এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার অধীনে চিকিৎসাসেবায় সংযুক্ত দক্ষ জনবল তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে।

আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে, জিডিপির ৫ শতাংশের মতো অর্থ স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ দেয়া। বাংলাদেশে এক যুগের অধিককাল ধরে বাজেটে জিডিপির ১ শতাংশের কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থের কমবেশি ৭০ শতাংশ বেতন-ভাতা ইত্যাদির মতো অনুন্নয়নমূলক খাতে খরচ হয়। বাকি অর্থ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ব্যবহূত হওয়ার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামর্থ্যহীনতার কারণে প্রতি অর্থবছর স্বাস্থ্য বরাদ্দের একটি অংশ অব্যবহূত থেকে যায়। তাই দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামর্থ্যের পরিধি বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

গত তিন দশকে দেশে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতের একটি উল্লম্ফন ঘটেছে। সরকারি খাতের চেয়ে বেসরকারি খাতের সামর্থ্য অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য কর্তৃপক্ষের দিক থেকে বিস্তর উদাসীনতা রয়েছে। বেসরকারি খাতকে জনবান্ধব ও আইনানুগ পথে বিকশিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বিপুল অগ্রগতি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অর্জনগুলো বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দেশের জনসাধারণের সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য লাগসই পরিকল্পনা ও তার দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভক্ষণে আমাদের স্বাস্থ্যযাত্রা সেই দিকেই ধাবমান হোক।

 

লেলিন চৌধুরী: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ