করোনা মহামারীতে প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর আজ খুলেছে দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা সশরীরে ক্লাসে ফিরেছে। করোনা সংক্রমণের হারও কমছে, জনচাহিদা ও বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারের এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী বৈকি। তবে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার বিষয়গুলোয় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সরকার থেকে দেয়া গাইডলাইন পরিপালনে কোনো ধরনের ব্যত্যয় যেন না ঘটে তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও তাদের জন্য প্রদত্ত নির্দেশনাগুলো মানা জরুরি। প্রিয় শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থীদের ফেরা নিরাপদ, ঝুঁকিমুক্ত ও আনন্দময় করতে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনে কোনো ধরনের শৈথিল্য কাম্য নয়। 

স্বাভাবিকভাবেই করোনা সংক্রমণ বাড়তে পারে এবং অনেক শিক্ষার্থীই তাতে আক্রান্ত হতে পারে, বিশেষ করে করোনার ডেলটা ধরন খুবই সংক্রামক। যদিও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ সফলভাবে এ ধরনটির মোকাবেলা করছে, তবু ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আমাদের অনেকটা সমন্বয়হীনতা ও সীমাবদ্ধতা আছে বৈকি; যা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। করোনার নতুন এ বাস্তবতায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে ফিরেছে। তাদের শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করা বা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা, শ্রেণীকক্ষ বিন্যাস, এক বেঞ্চে কয়জন বসবে, কমন রুম কিংবা সাধারণ পরিসর ব্যবহার, টিফিন গ্রহণ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মোতাবেক সম্পন্ন হয়, সে ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত তদারকি জারি রাখতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে নিচ্ছে।

গত জুলাইয়ে জাপানে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সাপ্তাহিক গড় এক হাজারের কাছাকাছি থাকলেও জুলাইয়ের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম পর্যন্ত তা বেড়ে ২০ হাজারের কাছাকাছি চলে যায়। আক্রান্তের ৯০ শতাংশই ডেলটা ধরন। এর মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই ১০ বছরের নিচের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। তার পরও দেশটির সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করেনি। এক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত নীতি ও দিকনির্দেশনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করছে। যেমন কোনো স্কুলের একজন শিক্ষার্থী করোনা আক্রান্ত হলে সে ক্লাসের সব শিক্ষার্থী তিন থেকে সাতদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে পারবে না। পাশাপাশি সবারই করোনা পরীক্ষা হবে। প্রয়োজনে পুরো প্রতিষ্ঠান তিনদিনের জন্য বন্ধ করতে হবে এবং সব কন্ট্যাক্ট শনাক্ত করে তাদেরও করোনা পরীক্ষা করতে হবে। আর আক্রান্ত শিক্ষার্থী বা শিক্ষক ১৪ দিন প্রতিষ্ঠানে আসতে পারবেন না। আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য হাসপাতালে বেড নিশ্চিত করবে সরকার। এছাড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাপিড করোনা টেস্টের কিট পাঠিয়েছে দেশটির সরকার।

আমাদের দেশেও শিক্ষার্থীরা যাতে করোনা আক্রান্ত না হয়, সেজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে অনুসরণ, ক্লাস নেয়ার পদ্ধতি-সংক্রান্ত ৬৩ দফা করণীয় নির্দেশিকা দিয়েছে শিক্ষা অধিদপ্তর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে তা পাঠিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে (এসওপি) শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিন ফুট দূরত্বে ক্লাসরুমের বেঞ্চগুলো স্থাপন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া স্কুলে ঢোকার আগেই থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। ওই গাইডলাইন ও নির্দেশনাপত্র দৈনিক ভিত্তিতে গুগল ডকসের মাধ্যমে প্রতিদিন শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানোর বাধ্যবাধ্যকতাও রয়েছে। তাছাড়া অভিভাবকদের জন্যও সন্তানকে মাস্ক পরিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো, নিজ স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতন করা, সন্তান অথবা পরিবারের কোনো সদস্য করোনায় আক্রান্ত হলে দ্রুত প্রধান শিক্ষককে তা অবহিত করা বা বাইরের খাবার না খাওয়ার বিষয়ে সন্তানকে সচেতন করাসহ আট নির্দেশনা রয়েছে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করে পাঠদান, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার প্রদত্ত নির্দেশনা অনুসরণপূর্বক দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় যদিও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করা খানিকটা চ্যালেঞ্জিং। গ্রামে ও শহরে, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বৈষম্য বিদ্যমান। গ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়তো ওই নির্দেশনামাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে জীবাণুনাশক ছিটানোর লোকবলের অভাব রয়েছে। বাড়তি খরচ ও বাজেটের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে সে অর্থের জোগান দেয়া যায়, সেটিও ভাবতে হবে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যালয় ও শ্রেণীকক্ষে তারা যেন আনন্দঘন পরিবেশে থাকতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা চাই। তাদের শিখন-পঠন-মনরসামাজিক কার্যক্রমের বিন্যাস পরিকল্পনায় প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে এমন কোনো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা বা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা যাবে না, যা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষকরাও দীর্ঘবিরতির পর ক্লাসে ফিরেছেন, তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। কীভাবে তাদের বিদ্যালয়ে আনা যায়, সে পথ অনুসন্ধান জরুরি।

করোনা মহামারী আমাদের এক ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করতে অভিভাবক, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বৃহত্তর কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী স্কুল খোলার পর এসএসসি, এইচএসসি ও পিইসি পরীক্ষার্থীদের ক্লাস সপ্তাহে ছয়দিন, প্রথম থেকে চতুর্থ এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর ক্লাস হবে সপ্তাহে একদিন। তবে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের সশরীরে ক্লাস আপাতত বন্ধ থাকছে। নির্দেশনা যথাযথাভাবে পালন হচ্ছে কিনা, তা তদারক করা জরুরি।

শিক্ষাই হলো সব উন্নয়নের ভিত্তি। সেই শিক্ষা এভাবে বন্ধ রেখে এ খাতকে আর ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পরীক্ষাগুলো বাতিল বা পিছিয়ে যাচ্ছে। এজন্য যারা খ্যাতিমান আছেন তারাই কৌশল বের করেছেন। কৌশল যেন কোনোক্রমেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পক্ষে না হয়। সরকার যে নির্দেশনা দিয়েছে তা পালন করা কোনো কঠিন কিছু নয়। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে দল-মত নির্বিশেষে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো পালন করে শিক্ষা খাতকে সচল রাখতে সহায়তা জোগাবে বলে প্রত্যাশা।