করোনায় দেশের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার ঘোষণা করেছে ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ। এর মোট আকার ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৪১ টাকা। তার মধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকার নয়টি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে। এসব প্যাকেজের সার্বিক বাস্তবায়ন হার প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে দুটি প্যাকেজের বাস্তবায়ন গতি বেশ শ্লথ। এখন পর্যন্ত এ দুটি প্যাকেজের গড় বাস্তবায়ন হার ৫ শতাংশেরও কম বলে খবর মিলছে। প্যাকেজ দুটির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরো সক্রিয় ভূমিকা ও তদারকি জরুরি।
ক্রান্তিকালে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়েছে। সঠিক সময়ে প্যাকেজ ঘোষণা এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান। ধীরে ধীরে দেশের অনেক শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কভিডের অভিঘাত থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু দু-একটি প্যাকেজ বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সার্বিকভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকা প্যাকেজের একটি হলো প্রাক-জাহাজীকরণ ঋণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি। এ প্যাকেজে তহবিলের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা। এর আওতায় কভিডে ক্ষতিগ্রস্ত রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প সুদে দেয়া হচ্ছে ঋণসহায়তা। তবে নানা শর্তের বেড়াজালে এ প্যাকেজের অর্থ ছাড় মন্থর। মাঝে কিছু শর্ত শিথিল করা হয়েছে। আগে এ প্যাকেজের ঋণের মেয়াদ ছিল এক বছর। এখন তিন বছর করা হয়েছে। প্রথমে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ একবার ঋণ পাবেন বলা হয়েছিল। পরে সেটি সংশোধন করে এ প্যাকেজে একাধিকবার ঋণ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। শর্তে কিছুটা রদবদলের পরও দেখা যাচ্ছে চলতি মাসের জুলাই পর্যন্ত আলোচ্য প্যাকেজের বাস্তবায়ন হার মাত্র ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ। একইভাবে পিছিয়ে থাকা আরেকটি প্যাকেজ হলো সিএমএস উদ্যোগ খাতে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম। সিএমএসএমই খাতে কভিডের বিরূপ প্রভাব পড়লেও ক্রেডিট গ্যারান্টির অনিশ্চয়তায় এসএমই উদ্যোক্তারা আশানুরূপ ঋণ পাচ্ছিলেন না। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কারণে তাদের কাছে ঋণ বিতরণে অনীহ। এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম প্যাকেজটি চালু করে, যাতে তাদের ঋণ পেতে কোনো অসুবিধা না হয়। প্রথমে আলোচ্য প্যাকেজের সুবিধা কেবল চলতি মূলধনের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ক্ষুদ্র উদ্যোগ হওয়ায় তারা অনেক সময় চলতি মূলধন গ্রহণ না করে স্বল্পমেয়াদি ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণ করেন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরে ক্রেডিট গ্যারান্টি চলতি মূলধনের পাশাপাশি মেয়াদি ঋণ/বিনিয়োগের জন্যও উন্মুক্ত করা হয়। এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও আলোচ্য প্যাকেজ বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। গত এক বছরে এ প্যাকেজের বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি, যা হতাশাজনক।
কভিড-সৃষ্ট অর্থনৈতিক অভিঘাত থেকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রায় প্রতিটি দেশই প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালিসহ পশ্চিমা উন্নত দেশ থেকে শুরু করে এশিয়া-আফ্রিকার স্বল্পোন্নত দেশ সবাই নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। প্রতিবেশী ভারতও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। দেশটি ক্ষতিগ্রস্ত সব খাতের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে এবং বাস্তবায়ন করছে। আমাদের মতো ভারতেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজের মূল ভূমিকায় রয়েছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয় নীতি-নির্দেশনায় সেখানে প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। প্যাকেজগুলো থেকে অর্থ পেতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, শর্ত পূরণ কঠিন হচ্ছে কিনা, হয়রানি হতে হচ্ছে কিনা, ব্যাংকগুলো যথাযথভাবে সহযোগিতা করছে কিনা প্রভৃতি বিষয় নিবিড়ভাবে তদারক করছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শর্ত কঠিন হলে প্রয়োজনে প্রজ্ঞাপন দিয়ে শিথিল করা হচ্ছে। অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে, তাদের দাবিদাওয়া যথাযথভাবে আমলে নেয়া হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটিই, সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রণোদনার ঋণ পৌঁছে দিয়ে দেশের অর্থনীতি দ্রুত চাঙ্গা করা। ভারতসহ অন্য দেশের কর্মপ্রক্রিয়া, নীতি-কৌশল আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু প্যাকেজের অর্থছাড়ে এমন শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে, বাস্তবে তা পূরণ করা কঠিন। বাস্তবায়নে ধীরগতির এটি অন্যতম কারণ। কিছু শর্ত শিথিল করা হলেও প্রাক-জাহাজীকরণ ঋণ পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির ক্ষেত্রে আরো কয়েকটি কঠিন শর্ত রয়ে গেছে। যেমন প্যাকেজটি প্রাক-জাহাজীকরণের জন্য প্রযোজ্য হলেও তার সুবিধা পেতে নাকি জাহাজের নাম ও ভাড়া উল্লেখ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য হলো, এটা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কভিডে রফাতানিমুখী অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানই নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে। ক্রেতা আদেশ পেলেও জাহাজ পর্যন্ত পণ্যগুলো পরিবহনের খরচ চালাতে পারছে না। এ অবস্থায় তারা আলোচ্য সুবিধা পেতে আগ্রহী হলেও অযৌক্তিক ও কঠিন শর্তের কারণে অনেকেই এ সুবিধা নিতে পারছেন না। আবার এ সুবিধা সম্পর্কে অনেকেই ঠিকভাবে জানেনও না। এটা সম্পর্কে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে প্রচার-প্রচারণা চালায়নি। এসএমই ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এ সুবিধার কথা অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা জানেনই না। তদুপরি কিস্তি পরিশোধে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হলেই এ খাতের উদ্যোক্তারা আলোচ্য প্যাকেজের সুবিধা নিচ্ছেন। ফলে এর বাস্তবায়ন শ্লথ। কাজেই প্যাকেজ দুটির বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে দূর করতে হবে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের জন্য প্যাকেজের সুবিধাপ্রাপ্তি আরো সহজ করতে প্রয়োজনে প্রজ্ঞাপন সংশোধনে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই। দিচ্ছে সময়োপযোগী নীতি-নির্দেশনা। শুধু নির্দেশনা দিলে হবে না, তার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নের কার্যক্রম তদারক করছে। বিদ্যমান লোকবল দিয়েই সেটি করছে। ফলে কাজটি করতে সংস্থাটি অনেক সময় হিমশিম খাচ্ছে। লোকবল বাড়িয়ে সংস্থাটির সক্ষমতা আরো কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটিও ভাবতে হবে। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সক্রিয় হলে হবে না, এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকেরও আরো দায়িত্বশীলতা দরকার।
রফতানিমুখী শিল্প ও এসএমই দুটোই আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালক। এ দুটো খাতের কার্যক্রম চাঙ্গা করা না গেলে প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা কঠিন। আর এটি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের সহায়তা প্রাপ্তির ওপর। সুতরাং উল্লিখিত দুটি প্যাকেজ বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও সরকার জোরালো পদক্ষেপ নেবে বলে প্রত্যাশা।










