আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যের কিছু সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি চমকপ্রদ। কিন্তু অপুষ্টি এখনো অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। চলমান কভিড পরিস্থিতি এ চ্যালেঞ্জ বরং কিছুটা বাড়িয়েছে। তথ্য বলছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি বা খর্বকায়তায় ভুগছে ৩১ শতাংশ। ৮ শতাংশ ভুগছে তীব্র অপুষ্টি বা কৃশতায়। বয়স অনুপাতে কম ওজন ২২ শতাংশ শিশুর। এছাড়া ৪০-৪২ শতাংশ শিশু ও নারী আয়োডিনস্বল্পতায় ভুগছে। রক্তস্বল্পতায় ভুগছে নারীদের একটা অংশ। এগুলো অপুষ্টিরই নানা অভিপ্রকাশ। অপুষ্টি দূরীকরণে প্রতি অর্থবছরই এ খাতে বিপুল বরাদ্দ রাখে সরকার। নানা প্রকল্পের আওতায় এ অর্থ খরচ হচ্ছে। তবে এ বার্ষিক বরাদ্দের ৯৮ শতাংশই পুষ্টিসংক্রান্ত সভা, সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের মতো পরোক্ষ কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে বলে খবর মিলছে। ফলে জনসাধারণের পুষ্টিনিরাপত্তায় আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রত্যক্ষ কার্যক্রমেই বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কিছু অর্জনের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা, নবজাতক ও অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যুহার হ্রাস, মাতৃমৃত্যু কমানো, টিকাদানের ব্যাপ্তি বাড়ানো, সংক্রামক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতির কথা বলা হয়েছে সেখানে। অথচ পুষ্টি খাতে উন্নয়ন আশাব্যঞ্জক নয়। এখনো বিভিন্ন বয়স শ্রেণীর জনগোষ্ঠী বহুমাত্রিক অপুষ্টিতে ভুগছে। এর পেছনে নানা ফ্যাক্টর কাজ করছে। বিগত সময়ে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও অনেক পরিবারে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা দূর হয়নি। দরিদ্রতার কারণে তাদের অনেকেরই পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। কভিডের অভিঘাতে এটি আরো অবনতিশীল। আবার অনেকের কেনার সামর্থ্য থাকলেও পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত নয়। খাদ্যের পুষ্টিমান সম্পর্কেও কারো কারো মধ্যে অসচেতনতা বিরাজমান। সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাড়লেও বিশেষত গ্রামীণ পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা এখনো অপ্রতুল ও দুর্বল। এটিও পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছু এলাকায় খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা হুমকিতে। এতে সেসব অঞ্চলে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের লভ্যতা কমছে। সর্বোপরি সরকারি কর্মসূচিগুলোর সমন্বয়হীনতা ও বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ে ভারসাম্যহীনতারও একটা বিরূপ প্রভাব আছে। বর্তমানে প্রচার-প্রচারণার মতো পরোক্ষ কার্যক্রমে পুষ্টি খাতের সিংহভাগ ব্যয় হচ্ছে। বিপরীতে চিকিৎসা, সরাসরি খাদ্য বিতরণ ও ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, এমআইএনটি পাউডার, মিনারেল খাওয়ানোর মতো প্রত্যক্ষ পুষ্টি কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে সামান্য! সব মিলিয়ে জনসাধারণের পুষ্টিগত উন্নয়নের গতি শ্লথ।
অপুষ্টিকে লুক্কায়িত নীরব ক্ষুধা বলা হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এর শিকার প্রায় ৬৯ কোটি মানুষ। অপুষ্টি দূর করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি বৈশ্বিক পুষ্টি উন্নয়ন টার্গেট ঘোষণা করেছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে অপুষ্টির প্রাধান্য থাকা দেশগুলো নিজেদের পুষ্টি কার্যক্রম ও নীতি-পরিকল্পনা সাজিয়েছে। জনসাধারণের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দেশ ভালোও করেছে। যেমন পেরু, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। এ তালিকায় আরো আছে ইথিওপিয়া, গুয়াতেমালা, মালাউই, তানজানিয়া, নেপালের মতো দেশ। পুষ্টি উন্নয়নে দেশগুলোর সাফল্যের একটিই রেসিপি। সেটি হলো নিজস্ব প্রেক্ষাপট উপযোগী যথাযথ ও লক্ষ্যাভিমুখী কৌশল গ্রহণ। প্রতিটি দেশই রাজনৈতিক দৃঢ় অঙ্গীকার, শক্তিশালী নেতৃত্ব, প্রমাণভিত্তিক নীতি হস্তক্ষেপ, নিবিড় তদারকি, পারস্পরিক সমন্বয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও যথাযথ জায়গায় সেটি ব্যবহার এবং জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পুষ্টি কার্যক্রম বেগবান করেছে। ফলে এসেছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। উল্লিখিত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও কৌশল আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
বৈশ্বিক ঘোষিত টার্গেটের সঙ্গে বাংলাদেশও অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকারি নীতি এজেন্ডায় স্বভাবত অপুষ্টি মোকাবেলার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নীতি ২০২০ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে নানা কর্মসূচি। পুষ্টি কার্যক্রমের পরিধিও আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু প্রত্যক্ষ কার্যক্রম খুব একটা বাড়েনি। ফলে অপুষ্টির চক্র থেকে আমরা বেরোতে পারছি না। এ অবস্থার বদলে টার্গেটেড নীতি হস্তক্ষেপ দরকার।
দেশের কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টিহীনতার প্রাবল্য বেশি, সেটি মোটামুটি চিহ্নিত। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে মূলত প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীই অধিক হারে অপুষ্টির শিকার। কিন্তু বিদ্যমান কার্যক্রমে তারাই থাকছে উপেক্ষিত। তাদের সরাসরি পুষ্টিসেবা দেয়ার কার্যক্রমে ব্যয় হচ্ছে কম। মোট বরাদ্দের সিংহভাগই যাচ্ছে প্রচার-প্রচারণার মতো অপ্রত্যক্ষ কার্যক্রমে। যেকোনো কার্যক্রমের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক জায়গায় যথাযথ ব্যয়ের ওপর। বর্তমান পুষ্টি কার্যক্রমের ব্যয় ভুল টার্গেটিংয়ের সমস্যায় ভুগছে। পরোক্ষ কাজে ব্যয় হচ্ছে বেশি, আসল কাজে অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে না। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই মানুষের পুষ্টিনিরাপত্তায় কাজ করছে। অনেক কর্মসূচিই চালু রয়েছে। অথচ একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় নেই। জাতীয় পুষ্টি পরিষদ এক্ষেত্রে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করার কথা থাকলেও কার্যত প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। ফলে আশানুরূপ উন্নয়ন হচ্ছে না জনসাধারণের পুষ্টিতে। সুতরাং সুসমন্বিতভাবে কীভাবে লক্ষ্যাভিমুখী কৌশল গ্রহণ করা যায়, প্রকৃত সুফলভোগীদের সেবা দেয়া যায়, তার উপায় বের করতে হবে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য পাথেয় হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েছে। কভিডের অভিঘাত বাদে এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছি। জিডিপি বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যেভাবে বহুমাত্রিক অপুষ্টিতে ভুগছে, তাতে একটি রূপান্তরশীল অর্থনীতির উপযোগী জনশক্তি পাওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। অপুষ্টির সঙ্গে উৎপাদনশীলতার সংযোগ প্রত্যক্ষ। অপুষ্টি দূর হলে শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা আরো বাড়বে। অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে গুণিতক হারে। সুতরাং উন্নয়ন ডিসকোর্সের জায়গা থেকেও অপুষ্টি মোকাবেলার কাজটি জরুরি। একটি সুসংহত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র মানুষের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো সক্রিয় হবে, এটিই প্রত্যাশা।










