নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থের একটি বিখ্যাত উক্তি মোটামুটি এ রকম, ‘অর্থনীতির স্থবিরতা বা অবনমনের চেয়েও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেশি দুর্লভ।’ এ উক্তি এটাই প্রমাণ করে যে একটা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোন কোন নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে সেটা এখনো অনেকটাই রহস্যাবৃত। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং অন্যদের কেন হ্রাস পায় বা স্থবির থাকে এ নিয়ে হয়েছে বিস্তর গবেষণা এবং সেই সাথে উদ্ভাবন হয়েছে বিস্তর তত্ত্বের। এ তত্ত্বগুলোর মৌলিক কাঠামো আবর্তিত হয় উন্নত দেশগুলোকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করে। তারপর উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোতে এসব তত্ত্বের প্রয়োগ চলে। অর্থাৎ অনুন্নত দেশগুলো তত্ত্বের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য একটা আদর্শ ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং ভঙ্গুর অবকাঠামো পুনঃস্থাপন করা। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বৃদ্ধির ধনাত্মক হার বজায় রাখাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দশকে (১৯৭১-৮০) গড়ে মাথাপিছু দেশজ উৎপাদন কমেছে প্রায় সোয়া ১ শতাংশ হারে। উচ্চজন্মহারের সাথে জিডিপির সামান্য প্রবৃদ্ধি মলিন হয়ে যায়। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণসহ সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার সূচিত হয়। যেমন শিল্পোন্নয়নের নিমিত্তে সাবেক রাশিয়ার মতো একটি সমাজতান্ত্রিক মডেল অনুসরণ করা যাতে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে রাষ্ট্র। এ কৌশলের প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল আমদানি বিকল্প শিল্পের প্রসার। আর তাই বাংলাদেশে অবস্থিত তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। অধিকন্তু বাঙালি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জাতীয়করণ করা হয়। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার প্রথম দুই বছরে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ মাঝারি আকারের এবং বড় কোম্পানি জাতীয়করণ করা হয়।

তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধির প্রচেষ্টা এবং আমদানি বিকল্প শিল্পনীতি প্রাথমিকভাবে উৎপাদন এবং ভোগকে ত্বরান্বিত করলেও আদতে টেকসই হয় না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উদারনীতির দ্বারস্থ হয় বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশগুলো। বেসরকারীকরণ, উদারীকরণ ও স্থিতিশীলতা আনয়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে আসার সার্বিক প্রচেষ্টা চলে। তাই আশির দশকের গোড়ার দিক থেকে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারীকরণ এবং তাদের মূল মালিকদের কাছে ফেরত দিয়ে একটি বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতি চালু করা হয়। আমদানি বিকল্প শিল্প বিকাশের কৌশল অপরিবর্তিত রেখে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মাঝারি ও ভারী শিল্পের বিকাশে অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি প্রণয়ন করা হয়। প্রবৃদ্ধির হারে কিছুটা গতি আসে এই নীতির ফলে।

ক্রমবর্ধমান উদার নীতি, বৈশ্বিকীকরণ এবং আগ্রাসী বাজারনীতির ফলে নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে প্রবৃদ্ধির হার গতিময় করার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রথাগত ‘প্রবৃদ্ধি এবং সমতা’র নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে পশ্চিমে অনুসৃত এক ধরনের অপ্রথাগত ‘চুইয়ে পড়া’ নীতির দ্বারস্থ হয়। এ নীতির মূল কথা হলো, যেকোনো উপায়ে একটি ধনিক শ্রেণী তৈরি করা। অর্থাৎ একটা বড় পুঁজিপতি গোষ্ঠীর উদয় হলে তারা নিজেদের উন্নয়নের মাধ্যমে জাতিকে সামনে টেনে নিতে সমর্থ হবে। তাই প্রথমে ধনীদের সম্পদের ওপর করহার হ্রাস করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। করহার হ্রাসের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে পুঁজিপতিরা সম্পদ তৈরিতে আরো আগ্রহী হবে যা তাদের অধিকতর বিনিয়োগে উৎসাহী করবে। বিনিয়োগের উল্লম্ফন দেশজুড়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে। বর্ধিত কর্মসংস্থান সাধারণ মানুষের আয় বাড়িয়ে দেবে যা তাদের ক্রয়ক্ষমতার উন্নয়ন করে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করবে। অন্যদিকে ভোগের আধিক্য পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে এবং আরো বিনিয়োগ আকর্ষণ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। এ চক্রাকার বলয় অর্থনীতির উন্নয়নে অভাবনীয় ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস এ ধারার নীতিনির্ধারকদের।

বাংলাদেশও এ ধরনের নীতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে বিগত কয়েক দশকে। ২০০১-১০ দশকে জিডিপির গড় বৃদ্ধির হার ছিল সাড়ে ৫ শতাংশেরও বেশি (মাথাপিছু আয়ের গড় ৪ শতাংশ), যা ২০১১-২০ দশকে দাঁড়ায় সাড়ে ৬ শতাংশে (মাথাপিছু আয়ের গড় প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ)। একইভাবে গত তিন দশকে মাথাপিছু জিডিপি বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ। ১৯৯০ সালে মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ছিল ৮৫০ মার্কিন ডলার (ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে), যা ২০২০ সালে ৩ হাজার ৮২২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। কিন্তু মাথাপিছু জিডিপি নেহাতই একটা সংখ্যা মাত্র, যে সংখ্যা দিয়ে সত্যিকারের উন্নয়নকে বোঝা সম্ভব নয়। জিডিপির প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে জনসংখ্যার ক্রমহ্রাসমান ধারা মাথাপিছু আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রভূত ভূমিকা রেখেছে গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকেই।

তবে ‘চুইয়ে পড়া’ নীতির যে সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে তার দেখা মিলছে খুব কমই। অন্যদিকে এ নীতির যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে ‘চুইয়ে পড়া’ নীতির প্রধান নেতিবাচক দিক হচ্ছে যে রাষ্ট্রের দেয়া সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে ধনীরা আরো বেশি ধনী হচ্ছে। তাতে কোনো সংশয় ছিল না, যদি না ধনীদের সম্পদ চুইয়ে গরিবের মধ্যে আশানুরূপ বিলি-বণ্টন হতো। বাস্তবে গরিবরা আরো গরিব না হলেও বাড়ছে না তাদের প্রকৃত আয়। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে টেনে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলার যে আস্থা ধনিক শ্রেণীর ওপর ছিল, বাস্তবে সেটা প্রতিফলিত হয়নি।

গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে ধনীদের সম্পদ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বিশ্বের শীর্ষ আটজন ধনকুবেরের সম্পদের পরিমাণ বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্পদের সমান। এ আটজন ধনকুবেরের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার, যা সম্পদের মাপকাঠিতে নিচে থাকা অর্ধেক মানুষের সঞ্চিত সম্পদের সমান। বাংলাদেশের অবস্থা এতটা চরম না হলেও ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়েছে অনেক গুণ। ধনী-গরিবের আয়ের বৈষম্য নির্ধারণে এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সূচক বা পরিমাপ নেই। সাধারণভাবে ‘জিনি-সহগ’ ব্যবহার হলেও এর রয়েছে অনেক দুর্বলতা। জিনি-সহগের মান ০-১-এর মধ্যে বিরাজমান (‘শূন্য’ ইঙ্গিত করে যে আয়ের কোনো রকম বৈষম্য নেই; আর জিনি-সহগের মান ‘এক’ ইঙ্গিত করে যে জাতীয় সম্পদ একজনের হাতেই কুক্ষিগত)। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের জিনি-সহগের মান ছিল দশমিক ২৭, যা ২০২০ সালে দশমিক ৩২-এ স্থির হয়। আগেই বলেছি, জিনি-সহগ খুব নির্ভরযোগ্য পরিমাপ নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে গত দশকে শীর্ষ সিকিভাগ ধনীর সম্পদ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েছে।

সামগ্রিকভাবে দেশের দরিদ্র জনসংখ্যার পরিমাণ কমলেও অর্জিত হয়নি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। ২০০০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক (৪৯ শতাংশ) দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। দারিদ্র্যের হার শহরের চেয়ে (৩৫ শতাংশ) গ্রামে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ছিল (৫২ শতাংশ)। গত তিন দশকে দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে (২৪ শতাংশ) নেমে এসেছে। তবে দেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রতি ১০ জনে একজন চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করে। আর মাঝারি থেকে চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে মোট জনসংখ্যার ৩১ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষের বাস। অপুষ্টির বিস্তার গত দুই দশকে ১৯ শতাংশ কমলেও অপুষ্টিতে ভোগে এমন মানুষের সংখ্যা এখনো প্রায় ২ কোটি।

দেশের এই বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের ধারায় শামিল করতে না পারলে সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই চুইয়ে পড়া নীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে একটা সামগ্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মডেলের দিকে নজর দিতে হবে। ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক বিপর্যয়ের পর দল-মত নির্বিশেষে একটা ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে আদর্শগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং সত্যিকারের বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তিমূলকতা অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি নতুন মডেল প্রয়োজন যা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করে অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করবে। এ ধারা সূচিত হলে প্রাকৃতিকভাবেই ধনী-গরিবের বৈষম্য হ্রাস পাবে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে উজ্জীবিত করতে পারে এমন নীতির পরিসর ব্যাপক। তবে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নজর দিতে হবে মানব পিরামিডের নিচের দিকে, যেখানে বাস করে মোট জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ। তাদের দারিদ্র্যসীমা থেকে টেনে তুলতে জোর দিতে হবে মৌলিক প্রয়োজনের দিকে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার অভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত। মূলত তারা ‘দারিদ্র্য এবং শিক্ষার দুষ্ট চক্রে’ আবর্তিত। যেমন প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাবে উচ্চ আয়সম্পন্ন কাজের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে অপারগ। তাই ব্যয়ের তুলনায় তাদের আয় যৎসামান্য। আর্থিক অসচ্ছলতা তাদের আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। ‘দারিদ্র্য ও শিক্ষার দুষ্ট চক্র’ ভাঙতে হবে রাষ্ট্রকে। সরকার দরিদ্রদের শিক্ষার জন্য বেশি ব্যয় করার মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগকে প্রসারিত করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে ঠিক তার উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় হ্রাসের প্রধান কারণ হলো শিক্ষার বেসরকারীকরণ। এখানেই রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্ব। শিক্ষার বেসরকারীকরণের সাথে সাথে তদারকির মাধ্যমে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। করোনার আগেও শিক্ষার মান নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। করোনাকালে সে প্রশ্ন আরো তীব্রতর হয়েছে যৌক্তিক কারণে। শুধু শিক্ষার প্রাপ্যতা নয়, শিক্ষার গুণগত মান শ্রমশক্তির মেধাবী পুলকে উন্নত এবং প্রসারিত করার জন্য অপরিহার্য।

২০১৯ সালে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার সহধর্মিণী এস্তার দুফলো দারিদ্র্য দূর করা যায় এমন কিছু টেকসই প্রস্তাবনা নীতিনির্ধারকদের জন্য তুলে ধরেছেন। এ দম্পতি দেখান যে অপুষ্টিজনিত কারণে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না। সেসব জনসংখ্যার আয়ের এবং সময়ের একটা বড় অংশ চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয়। এখানেই রাষ্ট্রের কাজ করতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য। পাবলিক স্বাস্থ্যসেবা চালু আছে বটে, কিন্তু তাতে সর্বসাধারণের প্রবেশ এবং সেবার মান নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। আফ্রিকা মহাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে সেখানে এইচআইভির সংক্রমণে কর্মক্ষম জনশক্তির বিনাশকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশেও যথাযথ স্বাস্থ্য সেবার কমতি কর্মক্ষম মানুষের রোগ-শোককে দীর্ঘায়িত করে কাজের ক্ষমতা হ্রাসের মাধ্যমে দারিদ্র্যকে প্রসারিত করে।

মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। আর এ বর্ধিত জনসম্পদের সঠিক ব্যাবহারে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাজারে বিরাজমান সমস্ত প্রতিকূলতা অপসারণ করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাজারে প্রবেশাধিকার আরো সহজ এবং ঝামেলামুক্ত করা, বড় ও ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা প্রতিযোগিতার মানদণ্ড সমান করা। আমাদের অর্থনীতিতে এ নিয়ামকগুলোর উপস্থিতি খুবই কম। গুটি কয়েক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে পূর্ণ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা থাকলে হঠাৎই পেঁয়াজের সংকট বা রোজার মাসে পণ্যের দাম বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার মতো ঘটনা ঘটত না। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবসময় বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে সুবিধাজনক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। এতে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সমস্যা তৈরি হয়। যেমন ব্যাংকঋণ নিয়ে অনেক বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় ঋণখেলাপি হয়েছে। এতে ব্যাংকের তারল্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা অর্থনীতিতে ঋণের স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে কাঙ্ক্ষিত সুদে সঠিক সময়ে ঋণ লাভে ব্যর্থ হয়। উল্লেখ্য, করোনাকালে সরকারি প্রণোদনার সিংহভাগই বিলি-বণ্টন হয়েছে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ বাজারে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির অন্তরায়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এ প্রথা ভাঙতে হবে, যার জন্য দরকার নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যা আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে প্রতিযোগিতামূলক এবং ন্যায্য ব্যবসার পরিবেশকে উৎসাহিত করবে। বিশেষ করে আইনি কাঠামো এমনভাবে সাজাতে হবে যেন আইনের শাসন উৎপাদনশীলতাকে উৎসাহিত করে। উন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক মডেলের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা। যেহেতু সম্পদের কার্যকর বণ্টন এবং যথাযথ রক্ষা করা কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতাবলেই সম্ভব, রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ যেমন বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধনসহ প্রত্যেক অঙ্গের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক মডেলের পুরোটা গ্রহণ না করে অংশবিশেষ অনুসরণ করার জন্যই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায় না। শ্রমশক্তি হলো শ্রমিকের সম্পদ। এ সম্পদের সঠিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য শ্রমবাজারে বাধা দূর করা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষিত কর্মীদের জন্য চাকরি খোঁজার সুযোগ প্রদানের পাশাপাশি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ সুগম করতে হবে। এতে অর্থনীতির মূল ধারার কাজকর্মে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে। অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে নারীদের অংশগ্রহণে বাধা দূর করা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আগেই বলেছি, পণ্য ও সেবার বাজারের উপর্যুপরি বিশ্বায়নের ফলে প্রথাগত আমদানি বিকল্প নীতির সুফল অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত হবে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সুবিধা আছে এমন সব পণ্য ও সেবা চিহ্নিত করে তাদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা করা। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রফতানি আয়ের জন্যে অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান ধারার গুটি কয়েক ব্যতিক্রম ছাড়া তৈরি পোশাক কাখানার মূল্য সংযোজন খুব কম। কাঁচামাল তৈরির পাশাপাশি কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস প্রতিষ্ঠার সাহায্যে মূল্য সংযোজন বাড়ানো গেলে এ খাতের সম্ভাবনা সুদূরপ্রসারী। তবে তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে বাংলাদেশের রয়েছে যথেষ্ট সম্ভাবনা। নিঃসন্দেহে তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পই হবে আগামীর প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ট্যালেন্টপুল তথ্যপ্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। দরকার শুধু সঠিক পরিকল্পনার।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কোনো জাদুর কাঠির ব্যাপার নয়। এর জন্য চাই সঠিক নীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন। যারা রাষ্ট্রের কর্ণধার তারা যে এ সত্যটা জানে না এমনটা নয়। তবে অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে অর্থনীতির নীতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে থাকেন। এটাই হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য। গুটি কতক শ্রেণীর সাথে রাষ্ট্রের একটা অলিখিত চুক্তি হয়, যাতে নির্দিষ্ট একটা শ্রেণী রাষ্ট্রের অনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাবে, বিনিময়ে তারা ক্ষমতাসীনদের অকুণ্ঠ সমর্থ জোগাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে। এ সম্পর্কটাই হচ্ছে দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে কেউ কেউ লাভবান হলেও সম্পদ চুইয়ে নিচে পড়ে না। কারণ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ পাচার হয়ে যায় বিদেশে। দেশ বঞ্চিত হয় সম্পদ সৃষ্টির ইতিবাচক প্রভাব থেকে। এ চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়।

 

ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ফাইন্যান্স ও অর্থনীতি বিভাগ, নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান