করোনাকালে বহু মানুষ কাজ হারিয়ে নতুন করে দরিদ্রের খাতায় নাম লিখিয়েছে। সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সরকার একে স্বীকার করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়েছে। কিন্তু দুর্বল সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ ও ত্রুটিপূর্ণ বিতরণ ব্যবস্থার কারণে নাজুক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সে সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুরক্ষা ভাতা ও খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমের সুবিধাভোগীদের ৪৯-৬৬ শতাংশ দরিদ্র নয়। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও বাস্তবায়ন দক্ষতার অভাবে একই ব্যক্তি যেমন একাধিক সুবিধা পাচ্ছে, আবার অনেকে সুবিধা পাওয়ার উপযোগী হয়েও পাচ্ছে না। কেবল তালিকায় গোলমাল নয়, যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কাজ হচ্ছে, তাতে ভুয়া নম্বর ছাড়াও জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত (এনআইডি) ত্রুটি থাকছে এবং অন্যান্য ভুল তো আছেই। এক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল নিশ্চিতে উপকারভোগীদের সঠিক তালিকা প্রণয়নে সরকারের আরো সক্রিয়তা প্রয়োজন।

বর্তমান সরকারের সময় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বেড়েছে। ২০১০ সালের আগে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ২১ শতাংশ এসব কর্মসূচির আওতায় ছিল, এখন তা ৩২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এটা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। তবে এ খাতে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ এখনো কম। এ কারণে কারা এ সুবিধা ভোগ করবে সে তালিকা যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ত্রুটিমুক্ত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় একটি ‘পারফেক্ট ডাটাবেজ’ তৈরি করা গেলে এ সমস্যার সমাধান মিলতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে এসব তালিকা সংশোধন ও সমন্বয় করা যেতে পারে। নিঃসন্দেহে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপকারভোগী নির্বাচন। উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। তারা ভোট, ভোটারের চিন্তা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি মাথায় রেখে তালিকা তৈরি করেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তিরা তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়েন,  ফলে তারা কর্মসূচির সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। উপকারভোগী বাছাইয়ে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে, যাতে প্রকৃত গরিব-অতিগরিব ব্যক্তিরাই এ কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

ভারত সরকার নাগরিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট সরকারি সুবিধা ও ভর্তুকি বরাদ্দের প্রক্রিয়া অধিক যৌক্তিকীকরণ এবং এতে স্বচ্ছতা আনার জন্য আধার কার্ড প্রবর্তন করেছে। এখন এর সুবিধা ও ব্যবহার দায় পরিশোধ বা পেমেন্ট ব্যবস্থা, কর নিয়ন্ত্রক এবং আরো অনেক কিছু হিসেবে আবর্তিত হয়েছে। ফলে ভারতীয় সব নাগরিকের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলে পরিণত হয়েছে। ফলে সুবিধাভোগী নির্বাচন ও ভুল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির সমস্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা গেছে বলে খবর মিলছে। গবেষণায় উঠে এসেছে ডিজিটাল অবকাঠামো সৃষ্টিতে আধারের প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে আর্থিক ও সামাজিক বিনিময় ঘটছে। বাংলাদেশেও ভোটার আইডি কার্ডের একটি ডাটাবেজ রয়েছে। যদিও দেশের অনেক মানুষ বিশেষত দরিদ্ররা এর বাইরে রয়ে গেছে। তাদের এর আওতায় এনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ভোটার আইডি কার্ডে অর্থনৈতিক তথ্যের যথাযথ সন্নিবেশ ঘটাতে হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম উন্নয়নের জন্য সরকার একটি প্রকল্প নিয়েছে। পুরো বিষয়টিকে তারা একটি ডিজিটাল ফর্মে নিয়ে আসতে চাইছে। আর তা হলো এমআইএস। এমআইএস করলে হয়তো কিছুটা সুফল মিলবে। তবে এমআইএস সব সমস্যার সমাধান দেবে না। তার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। অপচয় রোধে সরকার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহায়তায় নগদ অর্থ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তাতেও ভুল তালিকাভুক্তির সমস্যা এড়ানো যায়নি। সরকার বিবিএসের মাধ্যমে জাতীয় খানা তথ্যভিত্তি (ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেজ) তৈরি করছে।  এটি একটি অর্থনৈতিক শুমারি। এতে প্রতিটি পরিবারের অর্থনৈতিক তথ্য থাকবে। এগুলোর মাধ্যমে একটি তথ্যভিত্তি তৈরি করা হবে। এটিকে বলা হচ্ছে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ সংক্ষেপে পিএমটি। কিন্তু পাইলট প্রকল্পেও এর ভালো ফল আসেনি। ফলে বিষয়গুলো নিয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। এখন মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে নাজুক জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করার জন্য পাইলট প্রকল্প চলছে। এটির তথ্য নিয়েও সংশয় রয়েছে। করোনার সময় দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীকে নগদ অর্থ দেয়ার মতো উদ্যোগেও তালিকাভুক্তির সমস্যা দেখা গেছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ত্রুটি দূরীকরণে উপজেলা, জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে গ্রিভেন্স কমিটি গঠন করা দরকার। যেখানে লোকজন নির্ভয়ে যেন বলতে পারে, আমার এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের মনিটরিং দরকার। এনজিওগুলোর নেয়া চর ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, আলট্রা পুওর গ্র্যাজুয়েশন প্রকল্পগুলো সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ তাদের প্রশাসনিক তদারকি ভালো ছিল। তারা পরিদর্শন, তদারকি এসবের জন্য অনেক খরচ করেছে। কর্মসূচি শুরু করার আগে তারা এ কাজগুলো করেছিল। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সুবিধাভোগী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, এনজিওগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব এবং আপিলের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নির্ধারিত মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে দেশব্যাপী অভিযোগ, বিবাদ সমাধানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে সফল করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি কর্মকর্তারা মনগড়া তালিকা তৈরি করতে পারবেন না। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য যেসব কর্মসূচি নেয়া হয়, তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক। আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের কর্মসূচিতে জালিয়াতি ও দুর্নীতি রোধ করা কঠিন হবে না। অধিকাংশ কর্মসূচি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়, সেখানে প্রশাসনিক দুর্বলতা ব্যাপক। ইউনিয়ন পরিষদ সুবিধাভোগী চিহ্নিত করার কাজ করে। কিন্তু এজন্য তাদের কোনো বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয় না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সুন্দরভাবে সাজানো গেলে এবং যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে তা দারিদ্র্য দূর করতে আরো কার্যকরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।