বাংলাদেশের বাণিজ্যের আকার ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর ৯০ শতাংশই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে সম্পন্ন হলেও স্থলবন্দর ও আকাশপথে বাণিজ্যের পরিমাণও কম নয়। করোনার সময়ে দ্রুত পণ্য আমদানি-রফতানি করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আকাশপথের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে উঠেছে। বিমানবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ-সুবিধা এমনিতেই কম। তার ওপর আবার নানা অব্যবস্থাপনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি বাড়ছিল। ব্যবসায়ীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ পরিদর্শনে যান এবং রফতানি পণ্য স্ক্যানিং মেশিন অকেজো হওয়াসহ অব্যবস্থাপনার বিভিন্ন চিত্র দেখে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির দায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। এতে বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দ্রুতই ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।

ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো ভিলেজের মোট চারটি স্ক্যানিং মেশিনের সবগুলোই বিকল। এর মধ্যে দুটো মেশিন ছয় মাস আগে স্থাপন করা হলেও তা চালু করা হয়নি। পণ্য স্ক্যানিংয়েই বেশি সময় চলে যাচ্ছে। অন্তর্নিহিত এ ধরনের নানা প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত আকাশপথে পণ্য পরিবহন বাড়ছে না। আছে স্থান সংকটও। এতে প্রায়ই পণ্যজট সৃষ্টি হচ্ছে। রয়েছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে দুর্বলতা। ফলে সময়মতো উড়োজাহাজে কার্গো লোডিং সম্ভব হয় না। তাছাড়া  নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সন্তোষজনক নয়। কার্গো ভিলেজের অব্যবস্থাপনার কারণে স্থানাভাবে প্রায়ই খোলা আকাশের নিচে পণ্য রাখা হচ্ছে। সেখানে নজরদারি ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এদিকে পরিবহন খরচও অন্যান্য দেশের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও লক্ষণীয়। মাঝে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশ থেকে কার্গো পরিবহন বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ছিল যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ। টার্মিনাল হ্যান্ডলিং, সিকিউরিটি স্ক্যানিং, অন্যান্য খরচসহ আমাদের আকাশপথে কেজিপ্রতি পণ্য পরিবহনে খরচ দাঁড়ায় ১৮-২০ সেন্টের মতো, অথচ কলকাতায় তা ৮-১০ সেন্ট। সব মিলিয়ে দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ভোগান্তি বাড়ছে, যা বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রতিকূল।

বাণিজ্য কার্যক্রম বেগবান করতে এশিয়ার অনেক দেশই বিমানবন্দরে সক্ষম ও আধুনিক কার্গো ভিলেজ নির্মাণকে গুরুত্ব দিয়েছে। বছর দুই আগে জাকার্তার সুকর্ণ-হট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১ লাখ ৪৮ হাজার বর্গমিটার কার্গো ভিলেজ নির্মাণের প্রস্তুতি নেয়া হয়। উদ্দেশ্য, ইন্দোনেশিয়াকে বিমান পরিবহনের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করা; পাশাপাশি বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানো। এজন্য তারা স্ক্যানিং মেশিনসহ পণ্য মজুদ, নিরাপত্তা থেকে শুরু করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের প্রতি জোর দিয়েছে। দুবাই বিমানবন্দর যেমন কার্গো ভিলেজ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে রয়েছে। দুবাইয়ের ডিপার্টমেন্ট অব সিভিল এভিয়েশন প্রায় এক যুগ আগেই সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। যেখানে মেগা কার্গো টার্মিনাল, স্কাই কার্গো ওয়্যারহাউজ, অধিক ধারণক্ষমতাসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে অত্যাধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধা রাখা হয়েছে। এ কারণে অনেক দেশ থেকে কার্গো বিমান এখানে এনে পরীক্ষা করা হয়। এশিয়ার ব্যস্ততম বিমানবন্দর, যেমন হংকং, চীন, সিঙ্গাপুরে কার্গো ভিলেজের উন্নত ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি নিশ্চিত করা হয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা। তাছাড়া সার্বিক খরচও সেখানে সহনীয়। তাই বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা সহজেই সেগুলো বেছে নিচ্ছেন। 

আমাদের অর্থনীতি একটা রূপান্তরশীল প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশ। তাই এর কার্গো ব্যবস্থাপনাও উন্নয়নশীল দেশের উপযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। দেশীয় শিল্পের প্রয়োজনে অনেক উপকরণ বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। আবশ্যিক ভোগ্যপণ্যের আমদানিও করতে হচ্ছে। আবার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দ্রুত পণ্য পাঠাতে ব্যবসায়ীরা আকাশপথ বেছে নিচ্ছেন। সেখানে প্রতি পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরির অর্থ বাণিজ্যকে বড় হতে না দেয়া, যা সরকারের নীতির পরিপন্থী। এক্ষেত্রে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং কাজে আরো স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তদারকি বাড়াতে হবে। মাঝেমধ্যেই উপদেষ্টা-মন্ত্রী-সচিবদের ঝটিকা সফরের মাধ্যমে কিছুটা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটানো এবং অব্যবস্থাপনা দূর করা। বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকেই সক্রিয় হতে হবে। সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিমানবন্দরগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। একে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সজ্জিত করতে হবে। দেরিতে হলেও বিমান কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে পৃথক সেল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, যা ইতিবাচক। এর সুফল দৃশ্যমান হতে হবে। শুধু প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি সজ্জিত করলেই হবে না, এর পেছনের মানুষ, যারা একে পরিচালনা করবেন, তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু রফতানিকারক নয়, বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো ঢাকা বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ হারাচ্ছে বলে খবর মিলেছে। যেমন সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস, এমিরেটস এয়ারলাইনসসহ আরো কয়েকটি বিদেশী এয়ারলাইনস ঢাকায় নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করলেও তারা তা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ থেকে শুধু যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তারা ক্রমেই নিবেদিত কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা থেকে সরে আসছে। এর কারণ সার্বিক অব্যবস্থাপনা, সক্ষমতা ও অন্য লজিস্টিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। একইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাজার ধরার সুযোগ থাকলেও দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোও এটি কাজে লাগাতে পারছে না। করোনা সংক্রমণের ভয়ে যাত্রী পরিবহনে অনেক বিমানবন্দরই কম মনোযোগ দিচ্ছে। দৃষ্টি দিচ্ছে কার্গো পরিবহনে। আমরা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত কার্গো ট্রাফিক হাব হিসেবে গড়ে  তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী এয়ার কার্গো ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। বর্তমান পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে তাহলে দেশের রফতানি ও আমদানি বৃদ্ধিসংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে। তাছাড়া তৈরি পোশাক খাতে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো করোনাকালীন বিভিন্ন পরিস্থিতি সামলাতে ব্যতিব্যস্ত। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চীনে বস্ত্রকল ও করোনার কারণে ভিয়েতনামের কারখানা বন্ধ রয়েছে। ফলে আমাদের কাছে বাড়তি ক্রয়াদেশ আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দরে কার্গো ভিলেজের স্ক্যানিং মেশিনগুলো দ্রুত চালু না করা হলে চলমান ক্রয়াদেশের পণ্য পাঠানো সম্ভব হবে না। এতে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি যেমন নষ্ট হবে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রফতানি। তাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধিপূর্বক বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা দূর করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা বর্তমান সময়ে আধুনিক কার্গো ভিলেজ ব্যবসা-বাণিজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একে অবহেলার সুযোগ নেই।