পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ, তা পরিমাপের অন্যতম নির্দেশক মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও। কোনো কোম্পানির পিই রেশিও বেশি হলে সেটিতে বিনিয়োগে ঝুঁকিও বেশি। অন্যদিকে পিই রেশিও যত কম, বিনিয়োগ তত নিরাপদ। গত দেড় বছরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর খাতভিত্তিক পিই রেশিও পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ সময়ে মৌলভিত্তির ও তুলনামূলক বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর পিই রেশিও বেড়েছে কম। বিপরীতে স্বল্প মূলধনি কোম্পানিগুলোর পিই রেশিও বেড়েছে বেশি। বিদ্যমান বাস্তবতায় অনেকে কারসাজির অভিযোগ তুলেছেন। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে যেসব কোম্পানির শেয়ারের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ৪০-এর বেশি, সেগুলোয় কারসাজি বা নিয়মবহির্ভূতভাবে মার্জিন ঋণ দেয়া হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে এবং বাজার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য উদ্যোগটির যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
সাধারণত ঝুঁকি বিবেচনায় সর্বপ্রথম যে নির্দেশকটি দেখা হয়, সেটি হচ্ছে প্রাইস আর্নিং (পিই) রেশিও বা মূল্য-আয় অনুপাত। বলা হয়, ভারত, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও ভিয়েতনামের তুলনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গড় পিই রেশিও কম। তবে এখানে আরো অনেক বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মোট ২১টি খাতের কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। ডিএসইর পিই রেশিও বলতে সব খাতের গড় পিই রেশিও বোঝায়। খাতভিত্তিক পিই রেশিও বিবেচনা করলে অনেক খাত ও কোম্পানির পিই রেশিও অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে ৭১টি কোম্পানির পিই রেশিও ৪০-এর ওপরে। কিছু অখ্যাত কোম্পানির পিই রেশিও ৫০০-এর ওপরে। উল্লেখ্য, আমাদের শেয়ারবাজারে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে গড় পিই রেশিও ছিল প্রায় ৩০ পয়েন্ট। সে সময় অনেক প্রতিষ্ঠানের পিই রেশিও ছিল অস্বাভাবিক। ফলে পরের দৃশ্য তো সবারই জানা। আবার অনেকে বলেন, আমাদের জিডিপির আকার যেভাবে বড় হচ্ছে, শেয়ারবাজার সেভাবে বড় হতে পারেনি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় শেয়ারবাজার অনেক ছোট, যা এখন জিডিপির ১৮-১৯ শতাংশ। এক বছর আগেও ছিল ১১-১২ শতাংশ। তাই শেয়ারবাজার এখনো বড় হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। তবে সেটি হতে হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়। কারসাজি বা অস্বাভাবিক কোনো প্রভাবে এটি বাড়তে থাকলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকবে।
তথ্য-পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, পিই রেশিও নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কিছু কোম্পানির পিই রেশিও অস্বাভাবিক রকমের বেশি। এক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত মার্জিন ঋণের কোনো ভূমিকা আছে কিনা, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিএসইসির নিয়ম অনুযায়ী, ৪০-এর ওপর পিই রেশিও থাকা কোম্পানিতে বিনিয়োগের জন্য মার্জিন ঋণ দেয়া যায় না। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ মার্জিন ঋণ দিলে তার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে যে বিনিয়োগকারীরা নিয়ম মানেনি, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বাগ্রে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
মার্জিন ঋণ প্রদান ও এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ উত্থাপিত হয়। কিছু ইস্যু বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক সমাধান করলেও এক্ষেত্রে শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়ে গেছে, যা টেকসই পুঁজিবাজারের সহায়ক নয়। ভারত, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশে মার্জিন ঋণ ব্যবস্থাপনায় কীভাবে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সে অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এখানেও আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা যেতে পারে।
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা, ডিবেঞ্চার, মিউচুয়াল ফান্ড, বন্ড ইত্যাদির সরবরাহ অনেক কম। আবার অনেক কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগ অনুপযোগী, ভালো শেয়ারের সংখ্যা বেশি নয়। উন্নত বিশ্বের মতো শেয়ারবাজারের আয়তন বাড়াতে হলে ভালো শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, অর্থাৎ বিনিয়োগযোগ্য পণ্য বাড়াতে এবং প্রশিক্ষিত এক বিনিয়োগ গোষ্ঠী তৈরি করতে হবে। এটা সবারই জানা, একেক দেশের ব্যবসায়িক অবস্থা, অর্থনৈতিক স্তর, অবকাঠামো, নিয়মনীতি একেক রকম। ফলে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নিয়ম তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান কমিশনের বিভিন্ন সাহসী পদক্ষেপ ও বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে যেমন পরিচালক, ইস্যু ম্যানেজার, নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকার হাউজকে জরিমানা করায় কমিশনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। আশা করা যায়, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে ভবিষ্যতেও কঠোর থাকবে বিএসইসি। এতে ইতিবাচক বার্তা পেয়েছেন সব শ্রেণীর বিনিয়োগকারী। এ আস্থা ধরে রাখতে বিএসইসির উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। প্রত্যাশা থাকবে ডিএসই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়মবহির্ভূত মার্জিন ঋণ ও পিই রেশিও বেশি থাকা কোম্পানির অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেবে এবং বিএসইসি প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে বাজার স্থিতিশীল ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে নিয়ম ভঙ্গকারীদের মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। এর মাধ্যমে বাজারে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছবে, যা বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য জরুরি।
এক্ষেত্রে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে, কমিশন যে প্রতিবেদন চেয়েছে, তাতে সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর দরবৃদ্ধির প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে কিনা। অভিযোগ রয়েছে, এখন বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজে বিপুলসংখ্যক অনুসারীকে যুক্ত করে কারসাজি চক্র শেয়ারদর বাড়ায়। তারা গ্রুপ হয়ে ভাগ হয়ে প্রথমে একদল শেয়ার কেনে দর বৃদ্ধি করে, অন্য গ্রুপ কিনে নেয়। পরে দ্বিতীয় গ্রুপ শেয়ার কিনে আর আগের গ্রুপ শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা নেয়। নিবিড় নজরদারি বা গোয়েন্দা তথ্য ছাড়া এসব কারসাজি ধরা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদে নিয়মবহির্ভূত মার্জিন ঋণসহ কারসাজি বন্ধে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি তদারকিও জোরদার করতে হবে। অভিযোগ আসা মাত্র ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন। এর আগেও নিয়মবহির্ভূতভাবে মার্জিন দিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলো নেগেটিভ ইকুইটির ফাঁদে পড়েছিল। এ পরিস্থিতি থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।
আমাদের সব উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের আর্থিক খাত। এখানে শৃঙ্খলা, সুশাসন এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন আশা করা যায় না। আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা না থাকলে সব উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়বে। এটি নিশ্চিত শেয়ারবাজারে এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো অবস্থা বিরাজ করছে। আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভর করে শেয়ারবাজার যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, তা ধরে রাখাই হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়, আইনের যথাযথ পরিপালন নিশ্চিতের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব। সর্বোপরি মার্জিন ঋণ প্রদান ও ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে বিএসইসিসহ সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বাড়াতে হবে।










