সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে মৃত্যুহার বৈশ্বিক গড়ের চেয়েও লক্ষণীয়ভাবে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক মৃত্যুহার উচ্চ আয়ের দেশগুলোর দ্বিগুণ এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ নৈপুণ্য দেখানো অর্থনীতিগুলোর চেয়ে পাঁচ গুণের অধিক। আঞ্চলিক গড় বিবেচনায়ও দেশে সড়কে মৃত্যুহার বেশি। চলমান মহামারীতে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারে সড়ক দুর্ঘটনা কমার খবর মিলছে। অথচ উল্টো চিত্র বাংলাদেশে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এটা নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় উপকমিটি। এজন্য তারা পুলিশের পরিবর্তে নিজস্ব জনবল দিয়ে সড়ক-মহাসড়কের নিরাপত্তা দেয়ার সুপারিশ করেছে। এটি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কাম্য।
গত দুই দশকে সড়কভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে বাড়ানো হয়েছে নতুন নতুন সড়ক-মহাসড়ক। তথ্য বলছে, দেশে এখন সওজের আওতাধীন মোট সড়কের দৈর্ঘ্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৪১৯ কিলোমিটারে। অবকাঠামোর দিক থেকে অগ্রগতি ঘটলেও সড়কের নিরাপত্তায় দৃশ্যমান উন্নতি নেই। এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই। কিন্তু কিছু অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণে সড়কের নিরাপত্তায় আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না। প্রতিদিন দেশের কোথাও কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা। ড্রাইভিং লাইন্সেসের জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দিলেও সেটি অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। অদক্ষ ও ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক গাড়ি নিয়ে নামছেন সড়কে। বেপরোয়া গতিতে চালাচ্ছেন গাড়ি। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও অনেক সময় উঠে আসছে সড়কে। উচ্চগতির যানবাহনের সঙ্গে চলছে ধীরগতির যানবাহন। সড়ক নির্মাণেও রয়ে গেছে নকশা ও প্রকৌশলগত ত্রুটি। অনেক জায়গায় অপরিকল্পিত গতিরোধক বিদ্যমান। সর্বোপরি সড়ক ব্যবস্থায় আছে নজরদারির ঘাটতি। বিধৃত কারণগুলোর সঙ্গে এটিও সড়কের নিরাপত্তা উন্নতি না হওয়ার পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। মহাসড়কগুলোয় হাইওয়ে পুলিশ টহল দিলেও জেলা ও আঞ্চলিক সড়কে কার্যত কোনো নজরদারি ব্যবস্থা নেই বলা চলে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন মাঝে মধ্যে কিছু তত্পরতা নিলেও তা বেশ অনিয়মিত। ফলে চালক যেমন বেপরোয়া আচরণ করেন, তেমনি নানা জায়গায় অন্যায্য মাশুল আদায়ের হিড়িক। চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে চালক থেকে যাত্রী সবাই ভীতসন্ত্রস্ত। সব মিলিয়ে দেশে সড়কের নিরাপত্তা তলানিতে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সড়ক বিভাগের নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থা উন্নয়নের বিকল্প নেই।
প্রায়ই প্রতিটি দেশের জন্য সড়কের নিরাপত্তা একটি উদ্বেগের ইস্যু। একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলে কীভাবে এক্ষেত্রে উন্নতি ঘটানো যায়, তা নিয়ে সবাই তত্পর। বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উদ্যোগে এ নিয়ে হচ্ছে নানা গবেষণা। কিছু দেশ এজন্য আলাদা বিভাগ ও জনবলের ব্যবস্থা করেছে। ব্রাজিলে সড়কের নিরাপত্তা ও যানবাহন ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে ন্যাশনাল ট্রাফিক ডিপার্টমেন্ট। ওই বিভাগের নিজস্ব জনবল দিয়েই সড়কে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করছে। কেবল বড় কোনো দুর্ঘটনা ও অপরাধের মতো বিষয় হলেই পুলিশকে সম্পৃক্ত করা হয় সেখানে। দক্ষিণ কোরিয়ায় কোরিয়া রোড অথরিটি নামে একটি সংস্থা রয়েছে। সেখানে ওই সংস্থার অধীন লোকবলই সড়ক ব্যবস্থা তদারক করছে। সহযোগীর ভূমিকায় আছে পুলিশ। ফ্রান্সে আছে রোড সেফটি ডিরেক্টরেট (ডিএসআর)। প্রতিষ্ঠানটির মূল এখতিয়ার সড়কে নিরাপত্তাবিধান। নিজস্ব জনবলের পাশাপাশি পুলিশ দিয়েই তারা সড়ক-মহাসড়ক তদারক করছে। সুইডেনেও একই অবস্থা। সেখানে সুইডিশ ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যানবাহনের লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে সড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে প্রতিষ্ঠানটি। উল্লিখিত দেশগুলোর নীতি ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি।
দেশে সড়ক-মহাসড়ক দেখভালের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) বিদ্যমান। কিন্তু সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণেই বর্তমানে সংস্থাটি সীমাবদ্ধ। সড়কের নিরাপত্তার জন্য তাদের কোনো জনবল নেই। পুলিশ বাহিনী দিয়ে চালাতে হচ্ছে কাজটি। আমাদের দেশে জনসংখ্যানুপাতে পুলিশের সংখ্যা অপ্রতুল। সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে এ বাহিনী। এর মধ্যে সড়ক-মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বাড়তি দায়িত্ব চেপেছে তাদের ওপর। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজটি যথাযথভাবে হচ্ছে না। নিজস্ব জনবল থাকলে সওজ কাজটি আরো কার্যকারিতার সঙ্গে করতে পারত; সহযোগী হিসেবে রাখা যেত পুলিশকে। কাজেই সংসদীয় উপকমিটি নিজস্ব জনবল দিয়ে যে সড়ক-মহাসড়কের নিরাপত্তা দিতে বলেছে, সেটি বেশ সুবিবেচনাপ্রসূত। এটি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া চাই।
নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আরেকটি দিক হলো ট্রাফিক ব্যবস্থা। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোয় আজকাল আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানির মতো পশ্চিমা উন্নত দেশের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, জাপান ও চীনের মতো পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশগুলোও প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এমনকি ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তারা প্রযুক্তির সন্নিবেশে নানা অভিনবমূলক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সনাতনী কায়দায় চলছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, যা অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মোটেই সংগতিপূর্ণ নয়। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমলে নিয়ে এক্ষেত্রেও দ্রুত অগ্রগতি দরকার।
অবকাঠামোগত কলেবর বাড়লেও সড়কে নেই কোনো শৃঙ্খলা। সবখানেই অব্যবস্থাপনার ছাপ। নিরাপত্তায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতির অভাবে ঘটছে দুর্ঘটনা। ঝরছে তাজা প্রাণ। নৈপুণ্য কমছে সড়কের। তাই শুধু সড়ক নির্মাণে ব্যয় করলে হবে না, সড়কের নিরাপত্তা উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকও এতে জোর দিয়েছে। এটা আমলে নিতে হবে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা আনতে সরকার মহাসড়ক আইন ২০২১ প্রণয়ন করছে। কিছুদিন আগে আইনটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত পাস করে এর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। মোটাদাগে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর নজরদারি, আইনের প্রয়োগ, জনসচেতনতা এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশে সড়কে নিরাপত্তায় উন্নতি ঘটবে, এটিই প্রত্যাশা।










