মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট শিলার অনেক দিন আগে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছেন। যখন ওই বক্তব্য দেন তখন তিনি আইভি লিগভুক্ত বিখ্যাত প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে শিলার আরেকটি আইভি লিগ স্কুল ইয়েলের সম্মানিত ‘স্টার্লিং’ প্রফেসরের পদ অলংকৃত করে আছেন। এই দূরদৃষ্টিমান অর্থশাস্ত্রবিদের অমূল্য বাণী আজও ফলেনি, তাই অনেকের মতো আমিও তাকে ভুলতে বসেছিলাম। ইদানীং কভিড-১৯ এসে শিলারের কথা আমাকে ফের মনে করিয়ে দিল। আর তাই এ বিষয়ে আজ দুকলম লিখতে বসেছি। আমার মতে, শিলারের কথাকে এখন শুধু সামনে নিয়ে আসাই জরুরি নয়, বরং বিষয়টি দুনিয়াজুড়ে গভীরভাবে আলোচনা-পর্যালোচনারও দাবি রাখে।

এই পুরাতন ভবিষ্যদ্বাণী নতুন করে বলার আগে শিলারের বক্তব্যের ওজন ও গুরুত্ব বোঝানোর জন্য আরো দু-একটি প্রাসঙ্গিক কথা পাঠকদের জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। চলতি শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে (Y2K-উত্তরকালে) প্রথমে আমেরিকায় এবং পরে সারা পশ্চিমা বিশ্বে শেয়ারবাজারে যে বিশাল ধস নেমেছিল, শিলার তা সঠিকভাবেই দিব্যচোখে দেখতে পেয়েছিলেন। এছাড়া ২০০৭-০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ’ ক্রাইসিস ও তার পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত বিশ্বের পুঁজিবাজারে যে মারাত্মক সংকট দেখা দেবে এবং তার পরে আসবে অর্থনৈতিক মন্দা, অঘটন ঘটার আগে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে তাও তিনি জগদ্বাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এজন্য ২০১২-১৩-এর দিকে তার আলোচ্য ভবিষ্যদ্বাণীর গুরুত্ব আগেরগুলোর চেয়ে বেশি বৈ কম নয়। অর্থনীতির গুরু শিলারের শেষের ওই হুঁশিয়ারি আগেরগুলোর চেয়ে মানবজাতির জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক এবং মারাত্মক হতে পারে।

এখন আসি আসল কথায়। শিলার কী এমন কথা বললেন, যা সবার জন্য এত ভাবনার কারণ হয়ে গেল। প্রকৃতপক্ষে শিলার যা বলেছেন তা আগাম বোঝার জন্য কারোরই শিলার হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যেকোনো চোখ-কান খাড়া বুদ্ধিমান মানুষ একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে সহজেই বিষয়টার গুরুত্ব বুঝতে না পারার কোনো কারণ নেই। শিলার বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সর্বত্র যেভাবে মানুষের মধ্যে আয়বৈষম্যে এবং সম্পদ আহরণের পার্থক্যে বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে, তা একটা সংকটময় পরিণতির দিকে যেতে শুরু করেছে।’ অভিজ্ঞ এই পণ্ডিত তার বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যদি শিগগিরই এর রাশ টেনে ধরা না যায়, তাহলে পৃথিবীর ৭০০ কোটি লোক এমন এক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, যা থেকে রেহাই পাওয়া ধনী-গরিব কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না। আজকের এ নিবন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে শিলারের ভবিষ্যদ্বাণীর একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন করার চেষ্টা করব।

এ সমাজবিজ্ঞানীর বক্তব্য অনুযায়ী প্রথমে ধরা যাক আমেরিকার কথা। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশ। সাত মহাদেশের যাবতীয় সম্পদের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ এখানেই সৃষ্টি হয়। এ দেশের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে শত শত বছর ধরে। অর্থনীতিতে চড়াই-উতরাই থাকলেও ২১ লাখ কোটি ডলারের জিডিপি এখনো ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম। আমেরিকানদের গড় আয়ু ৮০ বছরের কাছাকাছি। এখানে শিক্ষিতের হার শতভাগ। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গমাইলে ১০০-এর সামান্য ওপরে। বর্তমান দুর্দিনেও এ দেশে বেকার সমস্যা মাত্র ৫ শতাংশের ধারেকাছে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ৬৩ হাজার ডলার। এ দেশের ৩৩ কোটি লোকের মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ মধ্যবিত্ত। মাত্র ১২ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এখানকার ৩১ শতাংশ মানুষ বড় ধনী। এরা বাংলাদেশী টাকায় হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। অবশিষ্ট ৫ শতাংশ লোকের হাতে যে পরিমাণ সম্পদের পাহাড় জমা আছে তা কল্পনারও অতীত। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ১০ জনের মধ্যে ফ্রান্সের বার্নার্ড আরনল্ট (৩ নং ধনী) এবং ভারতের মুকেশ আম্বানি (১০ নং ধনী) বাদে বাকি সবাই আমেরিকার নাগরিক।

মার্কিন সরকার প্রতি বছর গরিব ও বয়স্ক লোকদের সামাজিক সুরক্ষা বাবদ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি ডলার খরচ করে। তার পরও শিলার ভয় পাচ্ছেন, আয়বৈষম্যের জন্য আমেরিকায় অদূরভবিষ্যতে বিপজ্জনক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিস্তারিত না বললেও তার ভবিষ্যদ্বাণী থেকে বোঝা যায়, সময়মতো সামাল দিতে না পারলে এ অস্থিরতা আইন অমান্য আন্দোলন, উশৃঙ্খলতা, রায়টিং, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও খুনখারাবিতে গড়াতে পারে এবং এটা সহজেই অনুমেয়, যেকোনো দেশে একবার যদি এ অঘটন ঘটে, তাহলে বনের আগুনের মতো তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশ থেকে দেশান্তরে।

কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, করপোরেট আমেরিকা, ওয়াল স্ট্রিট এবং রাজনীতিবিদ—এ তিন শ্রেণীর লোকদের সহায়তায় ওপরের ৫ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ ৩৩ কোটির মধ্যে মাত্র ১ কোটি ৬৫ হাজার লোক এমনভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করছে, যার শেষ পরিণতি কেবল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গেই তুলনীয়। এক দশক আগে শিলারের বক্তব্যকে সত্যায়িত করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের বাজেট ডিরেক্টর ডেভিড স্টকম্যান। স্টকম্যান নিজে একজন রক্ষণশীল রিপাবলিকান হয়েও ২০১২ সালে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছিলেন, ‘জর্জ ডব্লিউ বুশের আট বছরে রিপাবলিকান পার্টি আমেরিকার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং দেশ এখনো সেই পথ থেকে একটুও সরে আসেনি।’ সিএনএনএর সঙ্গে একই সাক্ষাত্কারে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘১৯৮৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরের ৫ শতাংশ লোকের হাতে জমা ছিল মোট ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। মাত্র ৩৫ বছর পরে ২০২০ সালে দেখা যায়, তারা কমসে কম ৫০ ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক। বলতে গেলে এর পুরোটাই তারা বিভিন্নভাবে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে, রাজনীতিবিদদের যোগসাজশে তথাকথিত আইনি কাঠামোর মাঝেই ওয়াল স্ট্রিট থেকে লুট করে নিয়ে গেছে।’

কভিড-১৯ অতিমারীতে কেন্দ্রীয় সরকারের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনার পরও ছোট ও মাঝারি ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সংকট উত্তরণের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ টেসলা, অ্যামাজন, অ্যাপল ও মাইক্রোসফটের মতো বড় বড় কোম্পানি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ থেকে বট গাছে রূপান্তর হয়েছে।

ট্রিলিয়ন শব্দটা শুনতে যত ছোট, তার ওজন ও ব্যাপ্তি তার চেয়ে অনেক অনেক অনেক গুণ বেশি।

ট্রিলিয়ন ডলার কত টাকা, তার একটা আন্দাজ দেয়ার জন্য পাঠকদের উদ্দেশে একটা হিসাব তুলে ধরছি। মনে করুন, একজন মানুষ ঘুমনিদ্রা ছেড়ে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা দুই হাতে শুধু টাকা খরচ করছে। এখন আপনারা অনুমান করুন, সে যদি প্রতি মিনিটে ১০০ ডলার বা সাড়ে ৮ হাজার টাকা করে এভাবে খরচ করতে থাকে, তাহলে ১ ট্রিলিয়ন ডলার শেষ করতে তার কত দিন লাগবে। শুনে অবাক হবেন, মিনিটে ১০০ ডলার করে অনবরত খরচ করতে থাকলে ১৯ হাজার বছরেও এক ট্রিলিয়ন ডলার শেষ করা যাবে না।

আমেরিকার বিপরীতে বাংলাদেশে গরিবদের অবস্থা যে হারে এবং যে গতিতে উপরের দিকে উঠছে এবং অতি অল্পসংখ্যক ধনীর অবস্থা ফুলে-ফেঁপে ওঠে যেভাবে দেশের বাইরে গিয়ে উপছে পড়ছে, তাতে সবাই না হলেও বিবেকবান ও বুদ্ধিমান মানুষ অনেকেই শঙ্কিত। বর্তমানে বাংলাদেশে যত তাড়াতাড়ি কোটিপতি হওয়া যায়, তা বিশ্বের আর কোনো দেশে সম্ভবপর নয়। এখানে ধনীরা আমেরিকার চেয়েও অনেক নগ্নভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে। এ দেশে মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছরের মতো। শিক্ষিতের হার পুরুষদের মাঝে ৫০ শতাংশ এবং মেয়েদের মাঝে ৩১ শতাংশ। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গমাইলে ২ হাজার ২৬০। বেকার ও আধা বেকার মিলিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ লোক উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরে। এখানে মানুষের বার্ষিক গড় মাথাপিছু আয় ২ হাজার ডলারের একটু ওপরে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান মতে, সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ মধ্যবিত্ত, ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। কিন্তু গত দেড় বছরের অতিমারীতে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের কশাঘাতে পড়লে এ হার উঠেছে ৩৫ দশমিক ৯৯ শতাংশে।  

অতিমারীর উৎপাত কমলে মানুষ হয়তো আর নতুন করে দরিদ্র হবে না। কিন্তু ধনীরা যে আরো ধনী হবে না এবং অবাধ মুদ্রা পাচারের প্রবণতা যে আরো বাড়বে না, তেমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। অতিরক্ষণশীল হিসাবমতে, দেশ থেকে বছরে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার ৬২৫। করোনাকালেও মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেখা যায়, এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ২৭২-এ। দেশের অতি স্পর্শকাতর আর্থিক খাতে যদি এই তুঘলকি কাণ্ডকারখানা এভাবে জারি থাকে তাহলে অদূরভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিস্ফোরণ যে আমেরিকা থেকে অনেক গুণে ভয়াবহ হতে পারে, তা বুঝতে কাউকে কোনো ধরনের অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী হওয়ার দরকার পড়ে না।

সব শেষে আরেকটা কথা বলতে চাই। বর্তমানে যেমন রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে দেশে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের চেষ্টা চলছে, তেমনি আগামী দিনে করপোরেট আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যে একইভাবে রুখে দাঁড়াবে না এবং জাতীয় সম্পদে তাদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করবে না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

 

আবু এন. এম. ওয়াহিদ: অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি

এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ

wahid2569@gmail.com