বনাচ্ছাদন ও বনের বাইরে বৃক্ষাচ্ছাদন বৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি বনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীলতা হ্রাসসহ বনজ সম্পদ উজাড় রোধে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, কমিউনিটি-ভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি বন সংরক্ষণ গ্রামে কমিউনিটি উন্নয়ন তহবিল হিসেবে অর্থ দেয়া হবে। উদ্যোগটি ইতিবাচক; তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়নের ওপর। এক্ষেত্রে বন অধিদপ্তরের সক্ষমতা ও দক্ষতা উভয়ই বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বন অধিকার আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বন ও বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম হলেও তা সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থার ঘাটতি দৃশ্যমান; বরং বনের জমিতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বনের আশপাশের জমিতে সরকারি ও বেসরকারি শিল্প-কারখানা এবং স্থাপনা তৈরি, বনকেন্দ্রিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও বনের জমি জবরদখলের মাধ্যমে বন ধ্বংসের বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে। এতে বনজ সম্পদ ও বনভূমির অবক্ষয় বেড়েছে এবং বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে, যা জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বন অধিদপ্তরের ভূমিকা সত্যিকার অর্থেই আশাপ্রদ নয়। রাষ্ট্রীয় বনভূমির সুরক্ষা ও বনের জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে বন অধিদপ্তরের ওপর অর্পিত যে ক্ষমতা ও সক্ষমতা রয়েছে, দুটোরই তারা কার্যকর ও ন্যায়সংগত ব্যবহার করতে পারছে না। বন অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ডে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণও অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে সুবিধাভোগী হিসেবে বননির্ভর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে প্রভাবশালীদের সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা; ‘কমিউনিটি ফরেস্ট ওয়ার্কার’ হিসেবে প্রকৃত সুবিধাভোগী বিশেষ করে ঐতিহ্যগতভাবে বনের জমিতে বসবাস ও কৃষি আবাদকারী ব্যক্তিদের সুযোগ না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকা নিশ্চিতসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ‘রক্ষিত এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৭’ প্রণয়নসহ বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও বনের মধ্যে অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা, বনের জমিতে শিল্পায়ন ও নগরায়ণ, অনুমতিবিহীন বৃক্ষ কর্তন, সংরক্ষিত বনভূমি কৃষিজমিতে রূপান্তরের ফলে বনভূমি ও বনজ সম্পদ ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। বন আইনের বিধিমালার অনুপস্থিতি এবং ৯০ বছরের অধিক পুরনো আইনে বন, বনভূমি ও বনজ সম্পদ সংরক্ষণে আইন প্রয়োগে যেমন বিবিধ চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি আইনগুলোর কার্যকর প্রয়োগে বন অধিদপ্তরের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে।
চীনের সিচুয়ান প্রদেশের ইয়াআন শহরের ‘ফা চান’ নামে একটি গ্রাম রয়েছে। চীনা ভাষায় ফা চান মানে উন্নয়ন। এ গ্রামে কৃষকদের দুটো গ্রুপ আছে। এগুলোর নাম যথাক্রমে স্বর্ণ পাহাড় ও রুপা পাহাড়। পাহাড়ে গাছ কাটা ছিল গ্রামের বাসিন্দাদের মূল কাজ। নতুন গাছ বড় হওয়ার আগেই বাকি সব গাছ কাটা হয়ে যেত। অতিরিক্ত গাছ কাটার কারণে এখানের জমিতে পানি হ্রাস পায়। ফলে বৃষ্টি হলে পাহাড় ধসে পড়ত। এমন অবস্থায় ১৯৯৮ সাল থেকে সিচুয়ান প্রদেশে চালু করা হয় প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ প্রকল্প। এর কারণে যারা আগে গাছ কাটতেন, তারা এখন গাছের রক্ষকে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশেও একই প্রক্রিয়ায় বনভূমি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে। বন ও বনজ সম্পদ সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরো গতিশীল এবং যুগোপযোগী করতে সহব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ গুরুত্বপূর্ণ। সহব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদের সুষম ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন বন ও বনের সম্পদ সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে বিকল্প আয়ের সুযোগ সৃষ্টির ফলে স্থানীয় দরিদ্র জনগণ স্বাবলম্বী হতে পারবে।
বন সংরক্ষণে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কিছু উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে কমিউনিটি-ভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি বন সংরক্ষণ গ্রামে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা কমিউনিটি উন্নয়ন তহবিল হিসেবে প্রদান উল্লেখযোগ্য। প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে অনুমোদন করা চার খণ্ডের কমিউনিটি অপারেশনস ম্যানুয়াল বননির্ভর গ্রাম ও পরিবার নির্বাচন, সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনা সংগঠনের কমিটি ও সাব-কমিটি তৈরি, প্রশিক্ষণ প্রদান, জীবিকা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে সঠিক দিকনির্দেশনার কথাও শোনা যাচ্ছে। দেশে মূলত বনভূমির ওপর দেশের বিপুল জনসংখ্যার অভিঘাত তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত। বনের সম্পদকেন্দ্রিক প্রত্যক্ষ বলয়ের মধ্যে বসবাসকারী মানুষকে বন ব্যবস্থাপনায় (কো-ম্যানেজমেন্ট) বেশি করে জড়িত করাসহ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টি কার্যকর করা প্রয়োজন। দেশে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক বনভূমি পুনরুদ্ধার করা দরকার। সামাজিক ও কৃষি বনায়ন আরো গভীরভাবে সম্প্রসারণ করার মাধ্যমে দেশে কাঠের চাহিদা (জ্বালানিসহ) পূরণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আকর্ষণীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমাদের দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এগুলো বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং; কিন্তু অসম্ভব নয়। সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০০ যা এরই মধ্যে পরিবেশবাদীদের সমালোচনার মুখে রয়েছে, সেখানে বন বিভাগ কর্তৃক নির্দেশিত গাছের বাগান করার জন্যই কেবল উপকারভোগী নির্বাচনের কথা আছে। এমনকি ‘বনজ সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালে’ বননির্ভর বনজীবী জনগণের বন অধিকারের বিষয়গুলোকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের ক্ষেত্রে এমন জটিলতা যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকা চাই।
বনের আইনসম্মত মালিক বনের মানুষ। ভারতে ২০০৭-এর ৩১ ডিসেম্বরে বিজ্ঞাপিত ‘বনবাসী তফসিলি জনজাতি এবং অন্য বনবাসীদের বনাধিকার স্বীকার আইন, ২০০৬’ (সংক্ষেপে, বন অধিকার আইন) অনুযায়ী, দেশের সর্বত্র গ্রামের ব্যবহার্য জঙ্গল এখন গ্রামসভার সাধারণ সম্পত্তি বা কমিউনিটি ফরেস্ট রিসোর্স। গ্রামের সব প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসে যে গ্রামসভা তৈরি করবেন, তা এ জঙ্গল দেখাশোনা করবে, গ্রামসভার সদস্যদের ব্যক্তি/গোষ্ঠী অধিকারের সীমা নির্ধারণ করবে। গ্রামসভা এখন বন ধ্বংস বা গ্রামসভার সদস্যদের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নষ্ট করতে পারে এমন যেকোনো কাজ ঠেকাতেও পারে। জ্বালানি কাঠ, বাঁশসহ অন্যান্য এনটিএফপির (নন-টিম্বার ফরেস্ট প্রডিউস) ওপর সম্পূর্ণ মালিকানা গ্রামের মানুষের। সব ধরনের জঙ্গলে এনটিএফপি সংগ্রহ, পশুচারণ ও মাছ ধরার অধিকার স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদের আলোকে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ বায়োডাইভারসিটিজ অ্যান্ড কমিউনিটিজ নলেজ প্রটেকশন অ্যাক্ট নামে যে খসড়াটি তৈরি করে, তাতে কিছুটা হলেও প্রাকৃতিক বনের ওপর বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়েছে। রহস্যজনকভাবে আইনটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। দ্রুতই এটি চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। পেশাগত বননির্ভর জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ এখনো কোনো না কোনোভাবে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমির ওপর নির্ভরশীল। তাদের বননির্ভরশীলতা দেশের কোনো আইন বা নীতি এখন পর্যন্ত বিবেচনা করেনি। অথচ বননির্ভর বনজীবী জনগণের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের বন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ওয়েব পেজে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় মানুষকে বন সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কনজারভেশন বায়োলজিতে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মুখ্য ভূমিকার কথা বলা হয়। বন কিংবা বনের ধারে বাস করা জনগোষ্ঠীর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আহরিত ও সঞ্চালিত জ্ঞানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। বন সংরক্ষণের ব্যাপারে বাইরের কোনো মডেল তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে তার ফলাফল সুস্থায়ী না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে কর্মপরিকল্পনা করা প্রয়োজন। তবে তার জন্য দরকার নিবিড় গবেষণা ও পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন।










