পাটের দামের অতীত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে মানভেদে মণপ্রতি পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। গত বছরও পাটের ভালো দাম মিলেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বাড়তি দামের সুফল কৃষকও ঘরে তুলছেন। সন্দেহ নেই, পাটের বাজারের বিদ্যমান অবস্থা ধরে রাখতে পারলে আগামীতে পাট আবাদ আরো বাড়বে। সেক্ষেত্রে কৃষকের এ আনন্দের দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে কার্যকর পরিকল্পনাও থাকতে হবে। পাটের শিল্পচাহিদা বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে।
এক বছরের বেশি সময় হলো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ। এর মধ্যে করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত বিশ্বের অর্থনীতি। এমন পরিস্থিতিতে দেশে পাটের দাম নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন কৃষকরা। তবে দুশ্চিন্তার কিছু ঘটেনি; বরং পাটের দামে কৃষকদের জন্য সুখবর মিলছে। করোনার এ সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি পাট দিয়ে এখন বহুমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশেও আগের চেয়ে অনেক বেশি পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে। একসময় দেশে যেখানে পাটের সর্বনিম্ন মূল্য বেঁধে দেয়ার জন্য কৃষকের পক্ষ থেকে দাবি উঠত, সেখানে এখন শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দেয়া এবং কাঁচা পাট রফতানি বন্ধের দাবি আসছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে পাটের বাজারের অবস্থা। পাট খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অনেকে খুশি হতেই পারেন। কারণ রফতানি থেকে আয় বাড়ছে, কৃষকও ভালো দাম পাচ্ছেন। তবে এ খুশি যেন মাত্র কয়েক দিনের না হয়। কারণ পাটজাত পণ্যের রফতানিকারকরা ভবিষ্যতে পণ্য তৈরির জন্য পর্যাপ্ত পাট সুলভ মূল্যে পাবেন কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। কাঁচা পাট রফতানি থেকে আয় বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সেদিকে ঝুঁকছেন। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন বেশি, কৃষকও দাম পাচ্ছেন। কিন্তু পাট শিল্প উদ্যোক্তারা শঙ্কায় পড়েছেন। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এত দামে পাট কিনে তাদের জন্য বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে শিল্পের কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। পাটের দাম কমানোর উদ্যোগ না নিয়ে বরং বিকল্প কী প্রক্রিয়ায় শিল্পকে সহায়তা জোগানো যায়, তার উপায় খুঁজে বের করা যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে পাটকল পরিচালিত হওয়ার ফলে একধরনের অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে সরকারি পাটকলগুলো তুলনামূলক ব্যয়বহুল উপায় পাটপণ্য উৎপাদন হওয়ার পরও সরকারি ভর্তুকির কারণে কম মূল্যে সেসব পণ্য রফতানি সুবিধা নিয়েছে। এতে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের পাট শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও পাটের ওপর নির্ভরশীল কারখানাগুলোর লাভ-ক্ষতির ক্ষেত্রে বিগত সব দশকেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাটের ওপর নির্ভরশীল সবচেয়ে বড় দেশ বাংলাদেশ ও ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাটের বাজার ভারত। এক্ষেত্রে ভারত একটি সংরক্ষণমূলক অভ্যন্তরীণ বাজার নিশ্চিত করেছে যাতে বৈশ্বিক যেকোনো পরিস্থিতিতেও পাটের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং পাটের ওপর নির্ভরশীল অভ্যন্তরীণ পাট কারখানাগুলো একটি নির্দিষ্ট মাত্রার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে। ভারতে এ ধারণা ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হলেও বাংলাদেশে শুরু হয় ২০১৩ সালের পর। অর্থাৎ পাটপণ্য মোড়ক আইন করার পর। তাছাড়া পাটপণ্যের বাজারটি কখনই মসৃণ ছিল না। একে সবসময় স্বল্পমূল্যের প্লাস্টিকের মোড়কজাতীয় পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়েছে। উত্তরোত্তর সিনথেটিক, প্লাস্টিকের মোড়ক প্রাপ্তির সুবিধার কারণে পাটপণ্য প্রতিযোগিতায় ক্রমেই দুর্বলতর হয়েছে। যে জায়গাটিতে পাটপণ্যের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত ছিল, তা হলো প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে বৈশ্বিক পর্যায়ের তৈরি হওয়া চাহিদা যেমন গ্রিন গ্রোথ, গ্রিন ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।
বেসরকারি খাতের মাধ্যমেই পাটের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে পণ্য মোড়ক আইনের আলোকে সরকারি সব প্রতিষ্ঠানে পাটের ব্যাগের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মোড়ক আইনের অধীনে অন্যান্য পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগের ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা দেখা। পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলকভাবে পরিপালিত হলে দেশের অভ্যন্তরেই পাটের বড় বাজার নিশ্চিত করা যাবে। ভারতের পাট খাতকে উৎসাহিত করার পেছনে সবসময় সরকারের সমর্থন ছিল, পাশাপাশি তারা নীতিগত সমর্থনও পেয়েছে। তাদের বেসরকারি পাটকলগুলোর অবস্থা অনেক ভালো। সেখানে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, ফলে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। পাশাপাশি ওরা উন্নত আঁশ ব্যবহার করে। তাছাড়া দেশের অভ্যন্তণে সরকার প্লাস্টিক মার্কেট নিশ্চিত করছে। ভারতের পাট কমিশন অনেক শক্তিশালী। তদের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি। ফলে ইউনিট প্রতি খরচও কম। ফলে অনেক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে দেশে ও বাইরের বাজারে তারা পণ্য দিতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন পাটের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। জাতীয় চাহিদা পূরণের জন্য পাট ও পাটবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ে প্রযুক্তির সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত পদ্ধতি ও কলাকৌশল অবলম্বনে পাটবীজ উৎপাদনে এবং মানসম্মত পাট উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানে জোর দিতে হবে। অর্ধশতাব্দী ধরে এ দেশে পাটের ফলন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। এর পেছনে দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের এবং পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের অবদান অনস্বীকার্য। পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচিত হয়েছে। তাতে রোগ ও পোকা প্রতিরোধক আরো উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এ দেশে কৃষি পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন আমাদের এমন পাটের জাত উদ্ভাবন করতে হবে, যা খরা, লবণাক্ততা ও শীতসহিষ্ণু। গবেষণায় ও কৃষকের মাঠে প্রাপ্ত উৎপাদনে বড় ধরনের ফারাক বিদ্যমান। এটি কমাতে হবে। এজন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ কর্মীদের মধ্যে জোরালো সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রফতানি করা কাঁচা পাটের বেশির ভাগ যায় ভারতে। এ আমদানির ওপর ভারত কোনো শুল্ক আরোপ করেনি। তবে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য আমদানিতে অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করেছে ভারত। অর্থাৎ ভারত বাংলাদেশ থেকে পাটজাত পণ্য কিনতে চায় না, কিনতে চায় কাঁচা পাট। এ কাঁচা পাট থেকে পাটজাত পণ্য তৈরি করে তারা সেগুলো রফতানি করবে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যদি পাটকলগুলোকে পর্যাপ্ত কাঁচা পাট না জোগানো যায়, তাহলে অনেক পাটকল সমস্যায় পড়বে। সেক্ষেত্রে আগামী মৌসুমে পাটের চাহিদা কমে যেতে পারে। এতে কৃষকদেরও বিপদে পড়ার শঙ্কা থাকবে। অর্থাৎ সঠিক পরিকল্পনা না করলে এখন বেশি দাম পেয়ে খুশি হওয়া কৃষকের সুখ হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। শুধু পাট বিক্রি করলে যে লাভ পাওয়া যায়, তার চেয়ে পাট দিয়ে পণ্য তৈরি করে বিক্রি করলে কয়েক গুণ বেশি লাভ হয়। এছাড়া কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও সুবিধাটা অনেক বেশি। বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে দেশের পাট খাত নিয়ে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করা উচিত।










