১৯৬৪
সালে ইমেরিটাস
অধ্যাপক ড.
আব্দুল জব্বারের
নেতৃত্বে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি
শিক্ষার সূচনা
হয়। সে
হিসাবে ২০২১
সালে ফার্মেসি
শিক্ষার ৫৭
বছর পূর্ণ
হলো। কিন্তু
স্বাস্থ্যসেবা খাতে
একটি স্বতন্ত্র
পেশা হিসেবে
ফার্মেসি সামাজিক
ও রাষ্ট্রীয়
স্বীকৃতি পেল
না এবং
ফার্মাসিস্টরাও পেশাজীবী
হিসেবে স্বীকৃতি
পাননি। সারা
বিশ্বে ফার্মেসি
একটি অত্যন্ত
সম্মানিত পেশা
এবং ফার্মাসিস্টরা
সম্মানিত পেশাজীবী
হিসেবে পরিগণিত
হন। স্বাস্থ্যসেবা
খাতে ডাক্তার-ফার্মাসিস্ট-নার্স-হেলথ
টেকনোলজিস্ট—এ
চার পেশার
পেশাজীবীরা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
পালন করেন
এবং এ
চার শ্রেণীর
পেশাজীবীর সমন্বয়েই
একটি পূর্ণাঙ্গ
স্বাস্থ্যসেবা খাত
গড়ে ওঠে।
কিন্তু বাংলাদেশ
এর ব্যতিক্রম
এবং বাংলাদেশে
ফার্মেসি একটি
অবহেলিত পেশা
হিসেবে পরিগণিত
হচ্ছে। বাংলাদেশের
স্বাস্থ্যসেবা খাতে
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের
কোনো অস্তিত্ব
ও স্বীকৃতি
নেই।
ওষুধ শিল্প
খাতে অর্থাৎ
ওষুধ তৈরি,
মান নিয়ন্ত্রণ,
মানের নিশ্চয়তা
বিধান ও
বিপণনে বাংলাদেশের
ফার্মাসিস্টরা অত্যন্ত
দক্ষতার ও
সক্ষমতার পরিচয়
দিয়েছেন। দেশের
চাহিদা মিটিয়ে
বাংলাদেশের ওষুধ
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ
বিশ্বের প্রায়
১৬০টি দেশে
রফতানি হচ্ছে।
এমনকি এই
করোনা মহামারীকালেও
যখন অন্যান্য
শিল্প খাতের
উৎপাদন ও
প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী,
তখন বাংলাদেশের
ওষুধ শিল্প
খাতের উৎপাদন
ও প্রবৃদ্ধি
ঊর্ধ্বমুখী ছিল
এবং আছে।
আর এটা
সম্ভব হয়েছে
আমাদের দক্ষ
ও অভিজ্ঞ
ফার্মাসিস্টদের জান
বাজি রাখা
দিবারাত্রি অক্লান্ত
পরিশ্রমের ফলে।
বর্তমানে সরকারি
ও বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় মিলে
মোট ৪১টি
বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি
বিষয়টি পড়ানো
হয় এবং
সেখান থেকে
প্রায় চার
হাজার গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্ট প্রতি
বছর পাস
করে বের
হন। এ
মুহূর্তে গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্টের সংখ্যা
প্রায় ১
হাজার ৯০০
এবং এদের
বেশির ভাগই,
বিশেষ করে
নবীন ফার্মাসিস্টরা
বেকার। বাংলাদেশে
কয়েক বছর
আগেও ফার্মাসিস্টদের
একমাত্র কর্মক্ষেত্র
ছিল ওষুধ
শিল্প খাত।
কিন্তু সময়ের
ব্যবধানে শুধু
ওষুধ শিল্প
খাতে এত
বিপুলসংখ্যক ফার্মাসিস্টের
কর্মসংস্থান করা
একেবারেই অসম্ভব।
তাই গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্টদের মূল
কর্মক্ষেত্র হাসপাতাল
ফার্মেসি সার্ভিস,
ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি
সার্ভিস ও
রিটেইল ফার্মেসি
সার্ভিসের দ্বার
উন্মুক্ত করার
সময় এসেছে।
বলা চলে,
এটাই উপযুক্ত
সময়।
কয়েক বছর
ধরে স্বাস্থ্যসেবা
খাতে গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্টদের নিয়োগের
ব্যাপার নিয়ে
বহু কথাবার্তা-চিঠিপত্র
চালাচালি হয়েছে,
হচ্ছে। কিন্তু
কোনো সুফল
আমরা দেখছি
না। গত
বছর স্বাস্থ্যসেবা
খাতে গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্ট নিয়োগদানের
জন্য দুটি
প্রজ্ঞাপনও জারি
করা হয়,
যাতে স্বতন্ত্র
ফার্মেসি সেবা
পরিদপ্তর/অধিদপ্ত
গঠন, কার্যপরিধি
নির্ধারণ ও
ফার্মাসিস্টদের নিয়োগের
জন্য নির্দেশনা
ছিল। কিন্তু
সেটা প্রজ্ঞাপন
জারি পর্যন্তই
সীমাবদ্ধ আছে।
আজ পর্যন্ত
এটা কার্যকর
করার কোনো
উদ্যোগ দেখা
যাচ্ছে না।
অন্যদিকে পত্রপত্রিকা
খুললেই আমরা
দেখতে পাই
হাসপাতালগুলোয় হাজার
হাজার ডাক্তার,
নার্স ও
হেলথ টেকনোলজিস্ট
নিয়োগ করার
খবর। কিন্তু
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের
নিয়োগের কোনো
খবর কোথাও
নেই।
আবার দেশে
নিবন্ধিত ও
অনিবন্ধিত ওষুধের
দোকানের সংখ্যা
দুই লাখের
বেশি। জীবন
রক্ষাকারী ওষুধের
বিক্রয় ও
বিতরণ চলছে
অবাধে, কোনো
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের
তত্ত্বাবধান ছাড়াই।
নেই কোনো
কার্যকর নিয়ন্ত্রণ।
মানহীন, ভেজাল
ওষুধ গ্রহণের
মাধ্যমে যেমন
বাড়ছে মানুষের
দুর্ভোগ, তেমনি
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
জনস্বাস্থ্য। আমরা
জানি, বাংলাদেশ
মধ্যম আয়ের
দেশের সম্মান
অর্জন করেছে।
উন্নয়নের অনেক
সূচকই এখন
ঊর্ধ্বমুখী, তাহলে
স্বাস্থ্যসেবা পিছিয়ে
থাকবে কেন?
আর স্বাস্থ্যসেবায়
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট
থাকবেন না-ইবা
কেন?
২০১৯ সালের
ডিসেম্বরে গণচীনের
উহান প্রদেশে
নভেল করোনাভাইরাস
ও করোনাভাইরাসজনিত
রোগ কভিড-১৯
ছড়িয়ে পড়ে।
কার্যকর ওষুধ
ও টিকার
অভাবে সারা
বিশ্ব বিমূঢ়
হয়ে পড়ে।
২০২০ সালের
৮ মার্চ
বাংলাদেশে প্রথম
নভেল করোনাভাইরাস
শনাক্ত হয়।
এই বৈশ্বিক
মহামারী (কভিড-১৯)
ছড়িয়ে পড়লে
দেখা যায়,
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা
খাতের চিত্র
অত্যন্ত নাজুক।
গত ৩০
জুলাই দৈনিক
বণিক
বার্তায়
‘চিড়
ধরা স্বাস্থ্যনীতির
কারণে কভিডে
নাজেহাল বাংলাদেশ’
শিরোনামে ব্যানার
হেডিংয়ে একটি
সংবাদ প্রকাশিত
হয়। সেখানে
দেখানো হয়,
দেশে উপজেলা
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,
সেকেন্ডারি ও
টারশিয়ারি পর্যায়ের
সরকারি হাসপাতালের
সংখ্যা ৬৫৪।
এসব হাসপাতালে
মোট শয্যা
সংখ্যা ৫৩
হাজার ৪৪৮টি।
প্রতি ১০
হাজার জনসংখ্যার
বিপরীতে ১
দশমিক ৫৫
জন চিকিৎসক
রয়েছেন। তবে
প্রতি ১০
হাজার জনসংখ্যার
বিপরীতে ডাক্তার
আছেন ৬
দশমিক ৭৩
জন। অন্যদিকে
প্রতি ১০
হাজার জনসংখ্যার
বিপরীতে সরকারি
হাসপাতালে ৩
দশমিক ৩০টি
শয্যা আর
বেসরকারি হাসপাতালে
৫ দশমিক
৫৩টি শয্যা
আছে। দেখা
যাচ্ছে এসব
সরকারি ও
বেসরকারি হাসপাতালে
পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ
ও অভিজ্ঞ
ডাক্তার, নার্স
ও হেলথ
টেকনোলজিস্ট থাকলেও
নেই কোনো
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট।
আর বিশ্বের
সব উন্নত
ও উন্নয়নশীল
দেশে মানসম্মত
স্বাস্থ্যসেবা মানেই
সেখানে ডাক্তার
ও নার্সদের
পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্টরা স্বাস্থ্যসেবা
টিমের গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিনিধি হিসেবে
উপস্থিত থাকেন।
আর বাংলাদেশে
এটি বলতে
গেলে শূন্যের
কোটায়।
আবার বিদেশী
সাহায্য সংস্থা
ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স
ফর হেলথ
(এমএসএইচ), বাংলাদেশ
ফার্মেসি কাউন্সিল
ও ওষুধ
প্রশাসন অধিদপ্তরের
উদ্যোগে আফ্রিকার
দেশ তানজানিয়াকে
মডেল বিবেচনায়
নিয়ে রিটেইল
ফার্মেসি সেবা
হিসেবে মডেল
ফার্মেসি চালু
হলেও এটি
তেমন কার্যকরী
হয়নি। বলা
চলে, এটি
ব্যর্থ হতে
চলেছে। কারণ
শুধু ওষুধের
দোকানের মালিকের
পক্ষে মডেল
ফার্মেসিতে কর্মরত
একজন গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্টকে উপযুক্ত
বেতন-ভাতা-প্রমোশন
দিয়ে রাখা
একেবারেই অসম্ভব।
মডেল ফার্মেসি
সিস্টেমকে সরকারি
রাজস্ব খাতের
আওতায় না
আনলে কোনো
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের
পক্ষে সেখানে
সম্মানের সঙ্গে
কাজ করা
সম্ভব নয়।
এক্ষেত্রে আমাদের
অনেক দক্ষ
ও অভিজ্ঞ
সিনিয়র গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্ট রয়েছেন,
যারা বিশ্বের
বিভিন্ন দেশে
হাসপাতালে ও
রিটেইল ফার্মাসিস্ট
হিসেবে কাজ
করেছেন, তাদের
সমন্বয়ে একটি
কমিটি করে
রিটেইল ফার্মেসি
সেবা খাতকে
একটি পূর্ণাঙ্গ
রূপ দেয়ার
ব্যবস্থা করা
যেতে পারে।
আগেই বলেছি,
বর্তমানে অনেক
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট
বেকার। তাদের
দ্রুত কর্মসংস্থানের
জন্য ওষুধ
শিল্প খাতের
পাশাপাশি ফার্মেসি
সেবা পরিদপ্তর/অধিদপ্তর
গঠন করে
হাসপাতাল ফার্মেসি
সেবা খাত
ও রিটেইল
ফার্মেসি সেবা
খাত অতি
দ্রুত চালু
করা সময়ের
দাবি মাত্র।
নচেৎ জীবন-জীবিকার
তাগিদে গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্টরা অচিরেই
রাজপথে নামতে
বাধ্য হবেন।
আর জনশ্রুতি
আছে, ‘এ
দেশে রাজপথে
না নামলে
নাকি কোনো
দাবি আদায়
হয় না!!’
বাংলাদেশের ফার্মাসিস্টরা
বিভিন্ন সময়ে
সরকারের বিভিন্ন
পর্যায়ে তাদের
ন্যায্য দাবি-দাওয়াগুলো
তুলে ধরেছেন।
সরকারের পক্ষ
থেকেও দ্রুত
হসপিটাল ফার্মাসিস্ট
নিয়োগের আশ্বাস
দেয়া হয়েছে,
কিন্তু তা
কখনই বাস্তবায়ন
হয়নি। সংশ্লিষ্ট
মহলের সুবিবেচনার
জন্য সেই
দাবিগুলো এখানে
তুলে ধরা
হলো।
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ছয় দফা
দাবি
(১)
ফার্মেসি সেবা
অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা—দ্য
ফার্মেসি প্র্যাকটিস
অ্যাক্ট প্রণয়ন
করার মাধ্যমে
গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের
নিয়োগ, পদোন্নতি
ও অন্যান্য
বিষয় সমন্ব্বয়
করার জন্য
ফার্মেসি সেবা
অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা
করতে হবে।
(২) হসপিটাল
ফার্মেসি সার্ভিস
চালুকরণ—পদোন্নতির
সুবিধা রেখে
বাংলাদেশ সরকারি
কর্মকমিশন কর্তৃক
ফার্মেসিকে ‘ক্যাডার
বিষয়’ হিসেবে
ঘোষণা করতে
হবে। পদের
নাম হবে
‘হসপিটাল
ফার্মাসিস্ট’।
এদের বিভিন্ন
সরকারি-বেসরকারি
হাসপাতাল ও
ক্লিনিকে প্রথম
শ্রেণীর সরকারি
কর্মকর্তা হিসেবে
নিয়োগ দিতে
হবে। (৩)
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়
মডেল ফার্মেসি
চালুকরণ—সারা
দেশে সাধারণ
ওষুধের দোকানের
পরিবর্তে সরকারি
সহায়তায় মডেল
ফার্মেসি চালু
করতে হবে
এবং এসব
ফার্মেসিতে গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্ট নিয়োগদানের
জন্য প্রয়োজনীয়
আইনগত ব্যবস্থা
নিতে হবে।
(৪) বাংলাদেশ
সেনাবাহিনীতে ‘Pharmaceutical
Corps’
খোলা—বাংলাদেশ
সেনাবাহিনীতে বিশ্বের
অন্যান্য দেশের
মতো Medical corps-এর
অনুরূপ Pharmaceutical
Corps খুলতে
হবে। (৫)
বিভিন্ন সরকারি
প্রতিষ্ঠানে গ্র্যাজুয়েট
ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ
দেয়া—বিভিন্ন
সরকারি প্রতিষ্ঠান,
যেমন ওষুধ
প্রশাসন অধিদপ্তর,
ড্রাগ টেস্টিং
ল্যাবরেটরি, ফার্মেসি
কাউন্সিল, বিএসটিআই,
আইসিডিডিআর,বি,
বিসিএসআইআর, কেন্দ্রীয়
ওষুধ ভাণ্ডার,
ব্যাংক প্রভৃতি
প্রতিষ্ঠানে ফার্মাসিস্টদের
নিয়োগ দিতে
হবে। (৬)
ড্রাগ ও
থেরাপিউটিক কমিটিতে
ফার্মাসিস্টদের অন্তর্ভুক্ত
করা—‘ড্রাগ
ও থেরাপিউটিক
কমিটি’ গঠন
করে হাসপাতাল
ও ক্লিনিক
ব্যবস্থাপনা ও
পরিচালনায় ফার্মাসিস্টদের
অন্তর্ভুক্ত করতে
হবে।
ড. মো. শাহ
এমরান: অধ্যাপক ও
চেয়ারম্যান, ফার্মাসিউটিক্যাল
কেমিস্ট্রি বিভাগ
ফার্মেসি
অনুষদ, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়










