জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে চলতি বছরের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৫৪ থেকে ১৫-তে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশে চলছে করোনা মহামারী। ফলে এখনো প্রতি হাজারে ২৮ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শিশুমৃত্যুর হার ১ দশমিক ৭। তিন বছর ধরে এক্ষেত্রে নেই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন, একই অবস্থানে রয়ে গেছে। এ অবস্থায় শিশুমৃত্যুর হার রোধে উন্নতি করতে হলে প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপ্তি আরো বাড়ানো জরুরি।
নিকট অতীতে স্বাস্থ্যের কিছু সূচকে উল্লেখযোগ্য অগগ্রতি দেখিয়েছে বাংলাদেশ। তার মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার রোধ অন্যতম। শিশুমৃত্যুর হার কমানোর এ সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বে সৃষ্টি করেছে এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যেভাবে শিশুমৃত্যুর হার কমার কথা, সেভাবে কমেনি; বরং সাম্প্রতিক সময়ে এক্ষেত্রে অগ্রগতি অনেকটাই স্থবির। জেলাভেদেও এক্ষেত্রে তারতম্য লক্ষণীয়। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে শিশুমৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে অন্য জেলাগুলোর চেয়ে বেশি। দেশে সার্বিকভাবে কাঙ্ক্ষিত হারে শিশুমৃত্যু না কমার পেছনে রয়েছে বেশকিছু কারণ। এর কিছু সামাজিক, কিছু চিকিৎসাজনিত। সরকার নানাভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও দেশে এখনো অনেক মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে। কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ করছে। তাদের মধ্যে পুষ্টি ও জীবনাচারের ঘাটতি প্রবল। ফলে অল্প বয়সী মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া শিশুকে বাঁচানো অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হচ্ছে। পরিণত বয়সে গর্ভধারণ করলেও অনেকের আবার প্রাতিষ্ঠানিক সেবা গ্রহণে অনাগ্রহ বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে আছে অসচেতনতাও। অনেক জায়গায় প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার দুষ্প্রাপ্যতাও রয়েছে। সার্বিকভাবে যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নতি ঘটলেও কিছু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়ে গেছে। ফলে ওইসব এলাকার প্রসূতি মায়েরা অনেক সময় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যেতে চান না। করোনা মহামারীও একটা ফ্যাক্টর। সংক্রমণের ভয়ে অনেকেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাননি। ব্যাহত হয়েছে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতিসেবা ও টিকাদান। সব মিলিয়ে লক্ষ্য অনুসারে উন্নতি হচ্ছে না শিশুমৃত্যুর হারে।
শিশুমৃত্যুর হার রোধ উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ। এজন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়ও (এসডিজি) এর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আলোচ্য লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি দেশের জন্য নবজাতকের মৃত্যু প্রতি হাজারে ১২ এবং অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫-এ নামিয়ে আনার টার্গেট বেঁধে দেয়া হয়েছে। এটা মাথায় রেখে অনেক দেশই এক্ষেত্রে উন্নতি করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দেশ ভালোও করছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, লাওস, নেপাল, পেরু, রুয়ান্ডা, ভিয়েতনাম প্রভৃতি। দেশগুলোর সাফল্যের মূলে রয়েছে প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্যের প্রাতিষ্ঠানিক সেবার পরিধি বাড়ানো, প্রশিক্ষিত ধাত্রী ও অন্য সম্পর্কিত জনবল বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের ব্যবস্থা, সর্বোপরি প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কমিউনিটিভিত্তিক অ্যাপ্রোচ গ্রহণ। উল্লিখিত দেশগুলোর কর্মকৌশল আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
বলা হচ্ছে, জন্ম-পরবর্তী শ্বাসকষ্ট, জন্মগত জটিলতা, সেপটিসেমিয়া, নিউমোনিয়া, এনকেফালাইটিস, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ও অপুষ্টিই দেশে শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ। এগুলো সবই প্রতিরোধযোগ্য। তার জন্য গর্ভধারণ থেকে শুরু করে প্রসব পর্যন্ত প্রসূতি মায়ের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ নিশ্চিত করা চাই। এটা পারিবারিকভাবেই করতে হবে। মায়ের অপুষ্টি দূরীকরণে পুষ্টি কার্যক্রমও জোরদার করতে হবে। খবর মিলছে, এখনো বেশির ভাগ প্রসব বাড়িতে অপ্রশিক্ষিত সেবাদানকারীর কাছে হচ্ছে। ফলে মা ও শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। এ সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। আবার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেয়া শিশুদের বেশির ভাগেরই জন্ম হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার বেশি করা হচ্ছে। মায়ের পাশাপাশি এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিশুও। কাজেই প্রসবের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানসম্পন্ন সেবার পরিধি বাড়াতে হবে।
বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। কিন্তু জনসংখ্যা অনুপাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বিশেষত মা ও শিশু ক্লিনিক এখনো অপ্রতুল। সরকারি এ ধরনের প্রতিষ্ঠান আরো বাড়াতে হবে। অনেক জায়গায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকের ঘাটতি রয়ে গেছে। এটা দূর করতে হবে। জরুরি মুহূর্তে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেন সহজে যেতে পারেন, সেজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা যেখানে দুর্বল রয়েছে সেখানে তার উন্নতি ঘটাতে হবে। নিয়মিত টিকাদানে যেন কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু চিকিৎসা নয়, মানুষের সচেতনতাও বাড়াতে হবে। খাদ্যাভ্যাসেও আনতে হবে ইতিবাচক পরিবর্তন। রোধ করতে হবে বাল্যবিবাহ।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রার দিক থেকে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। এখন কিছুটা শ্লথ হলেও অতীতে এক্ষেত্রে সাফল্যও দেখিয়েছে দেশ। এখনো তা সম্ভব। তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক, কাঠামোগত ও কর্মকৌশলগত এখনকার ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে শিশুমৃত্যুর হার রোধের কাজটি বেগবান করতে হবে। আগে যেমনটা বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কিছু প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা হয়েছিল, এখনো তাদের যুক্ত করতে হবে। মানসম্পন্ন শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অব্যাহত প্রচেষ্টায় শিশুমৃত্যুর হারে উন্নতি ঘটবে, এটিই প্রত্যাশা।










