বাংলাদেশে
বিভিন্ন সময়ে
কৃষিশুমারি পরিচালিত
হয়েছে যেমন
১৯৮৩-৮৪,
১৯৯৬ ও
২০০৮ সালে
কৃষিশুমারি পরিচালিত
হয়। জাতীয়
পর্যায়ে পরিচালিত
এসব কৃষিশুমারি
থেকে প্রাপ্ত
উপাত্তের তুলনা
থেকে বাংলাদেশের
কৃষিসম্পদ পরিবর্তন
ও উৎপাদন
সংগঠনের পরিবর্তন
লক্ষ করা
যায়। এসব
পরিবর্তনে প্রতিফলিত
কাঠামোগত রূপান্তর
নিচে আলোচনা
করা হলো:
সম্পদের ভিত্তির পরিবর্তন
কৃষিসম্পদের
ভিত্তি ক্রমেই
সংকুচিত হচ্ছে।
গ্রামীণ খানাগুলোর
অধীনে ভোগদখলীকৃত।
জমির পরিমাণ
১৯৮৩-৮৪
সালের ৯.২
মিলিয়ন থেকে
কমে ১৯৯৬
সালে ৮.২
মিলিয়ন হেক্টর
হয়েছে। এটা
নির্দেশ করছে
যে গড়ে
প্রায় ৮২
হাজার হেক্টর
জমি কৃষির
বাইরে চলে
যাচ্ছে। অকৃষিজ
কাজে জমি
ব্যবহারের কারণে
যেমন মিউনিসিপ্যালিটি
ও শহর
কর্তৃক এলাকার
আয়তন বৃদ্ধি
(৬০৭ হাজার
হেক্টর), গ্রাম
এলাকায় গৃহ
আঙিনাধীন জমির
পরিমাণ বৃদ্ধি
(১৪২ হাজার
হেক্টর) এবং
গ্রামীণ রাস্তা
ও অন্যান্য
অবকাঠামোর উন্নয়ন
(২৫২ হাজার
হেক্টর)।
ফলে কৃষিজমি
বা খামারের
গড় আয়তন/আকার
১৯৬০ সালের
১.৭
হেক্টর থেকে
১৯৮৩-৮৪
সালে দশমিক
৯১ হেক্টর,
১৯৯৬ সালে
দশমিক ৬৮
হেক্টর এবং
২০০৮ সালে
দশমিক ০৪
হেক্টরে হ্রাস
পেয়েছে।
কৃষি খাতে
নিয়োজিত শ্রমশক্তি
কমে যাচ্ছে।
কৃষি খানার
সংখ্যা ১৯৮৩-৮৪
সালের ১০
মিলিয়ন থেকে
বেড়ে ১৯৯৬
সালে ১১.৮
মিলিয়ন এবং
আরো বেড়ে
২০০৮ সালে
১৪.৯
মিলিয়নে দাঁড়ায়।
১৯৯৬ সালে
বাংলাদেশের সব
গ্রামীণ খানার
৩৪ শতাংশ
ছিল অকৃষি
খানা, ১৯৮৩-৮৪
সালে যা
ছিল ২৭
শতাংশ এবং
তা আরো
বেড়ে ২০০৮
সালে ৪২
শতাংশ হয়।
অন্যের খামারে
কৃষি শ্রম
প্রদানকারী খানার
হার ১৯৮৩-৮৪
সালের (সব
গ্রামীণ খানার
শতাংশ হিসাবে)
২২.৬
থেকে কমে
১৯৯৬ সালে
১৬.৯
শতাংশ এবং
তা আরো
কমে ২০০৮
সালে ৯.৬
শতাংশে দাঁড়ায়।
এ শ্রেণীর
খানার লোকজন
গ্রাম থেকে
শহরে অভিগমন
ছাড়াও গ্রাম
এলাকায় কৃষিকাজ
ছেড়ে অকৃষিজ
কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত
হচ্ছে। ভূমিহীন
খানার পেশাগত
পরিবর্তন ঘটছে
গ্রামীণ এলাকার
ব্যবসা ও
পরিবহন খাতে
(গ্রামীণ রাস্তাঘাটের
সম্প্রসারণসহ) কর্মসংস্থানের
সুযোগ সৃষ্টি,
কৃষিজ দ্রব্যের
উদ্বৃত্তের বাজারজাত
বৃদ্ধি, কৃষি
প্রবৃদ্ধির সংযোগ
প্রভাব, শিক্ষার
হার বৃদ্ধি
ইত্যাদি কারণে।
এভাবে কৃষি
খাত অধিকতর
উৎপাদনমূলক অকৃষি
খাতে সম্পদ
(জমি ও
শ্রমশক্তি) নিয়োজিত
করছে এবং
এর মাধ্যমে
সার্বিক অর্থনীতির
প্রবৃদ্ধিতে অবদান
রাখছে। কৃষির
রূপান্তর থেকে
আরো দেখা
যায়, কৃষিতে
জমি ও
শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতার
প্রবৃদ্ধি কৃষি
উৎপাদনের সার্বিক
প্রবৃদ্ধির চেয়ে
দ্রুততর হয়েছে।
গত তিন
দশকেরও অধিককাল
ধরে কৃষি
খাতে পুঁজির
বৃদ্ধিতে একটি
ঊর্ধ্বগামী ধারা
পরিলক্ষিত হচ্ছে।
কৃষি বিনিয়োগের
দ্রুত প্রবৃদ্ধির
সাথে সংশ্লিষ্ট
প্রধান ব্যক্তিরা
হলো ক্ষুদ্রাকার
সেচ যন্ত্রপাতিতে
(যেমন টিউবওয়েল
ও শক্তিচালিত
পাম্প) বিনিয়োগকারী।
সেচ যন্ত্রপাতির
মালিক এমন
গ্রামীণ খানার
সংখ্যা ১৯৮৩-৮৪
সালের ২
লাখ ৭৪
হাজার থেকে
বেড়ে ১৯৯৬
সালে ৯
লাখ ৩৩
হাজার হয়েছে
এবং খানার
মালিকানায় থাকা
যন্ত্রপাতির সংখ্যা
একই সময়ে
৩.১২
লাখ থেকে
বেড়ে ১১
লাখ হয়েছে,
বছরে ১১
শতাংশ হারে
ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি।
যান্ত্রিক পদ্ধতিতে
চাষের অধীন
আবাদি জমির
পরিমাণ ১৯৮৩-৮৪
সালের ২০
শতাংশ থেকে
বেড়ে ১৯৯৬
সালে ৪৮
শতাংশে এবং
তা আরো
বেড়ে ২০০৮
সালে ৬৩
শতাংশে উন্নীত
হয়। অন্যান্য
কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও
যান্ত্রিকীকরণ দ্রুত
বেড়েছে। ১৯৮৩-৮৪
সালে যেখানে
মাত্র ২৭
হাজার খানা
পাওয়ার টিলার/ট্রাক্টরের
মালিক ছিল,
১৯৯৬ সালে
তা বেড়ে
১ লাখ
৪১ হাজার
এবং আরো
বেড়ে ২০০৮
সালে ১
লাখ ৬২
হাজার ৮১৮-তে
দাঁড়ায়। কৃষিতে
হ্রাসমান শ্রমসম্পদের
স্থলে পুঁজির
ব্যবহার (যান্ত্রিক
পদ্ধতিতে চাষের
ফলে) একদিকে
যেমন শ্রমের
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে
অবদান রেখেছে,
তেমনি অন্যদিকে
উচ্চতর কৃষি
মজুরি প্রদানে
কৃষকদের সক্ষমতা
বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষির
রূপান্তর: উৎপাদন সংগঠনে পরিবর্তন
সীমিত
ভূমিসম্পদের তুলনায়
জনসংখ্যার প্রচণ্ড
চাপের কারণে
কৃষিতে ক্ষুদ্র
ও প্রান্তিক
চাষীর/কৃষকের
আধিক্য পরিলক্ষিত
হয়। ১৯৮৩-৮৪
সালে ১০
হেক্টর (২৪.৭
একর) জমির
মালিক এমন
পরিবারের সংখ্যা
ছিল মাত্র
২৮ হাজার,
১৯৯৬ সালে
তা কমে
দাঁড়ায় ১৯
হাজার এবং
তা আরো
কমে ২০০৮
সালে হয়
১৩ হাজার
৭২১। অন্যদিকে
১৯৮৩-৮৪
সালে প্রায়
৫.৪
মিলিয়ন পরিবার
(মোট গ্রামীণ
পরিবারের ৪৬
শতাংশ) ছিল
কার্যত ভূমিহীন
(০.২
হেক্টর বা
০.৪৯
একরের চেয়ে
কম জমির
মালিক), ১৯৯৬
সালে এ
সংখ্যা বেড়ে
১০ মিলিয়নে
(মোট গ্রামীণ
পরিবারের ৫৬
শতাংশ) এবং
২০০৮ সালে
আরো বেড়ে
দাঁড়িয়েছে ১৬
মিলিয়নে (মোট
গ্রামীণ পরিবারের
৬৩ শতাংশ)।
ডেমোগ্রাফিক বা
জনতাত্ত্বিক চাপের
কারণে মাঝারি
ও বৃহৎ
খামারগুলোর বিভাজন
ঘটছে। যার
কারণে ক্ষুদ্র
ও প্রান্তিক
খামারের সংখ্যা
বেড়েছে। ১৯৯৬
সালে মোট
খামারের ৮১
শতাংশ ছিল
ক্ষুদ্র ও
প্রান্তিক হোল্ডিংস,
যারা মোট
জমির ৪১
শতাংশ ব্যবহার
করত। এ
অংশ বেড়ে
২০০৮ সালে
যথাক্রমে ৮৪
ও ৫০
শতাংশে দাঁড়ায়।
এসব সংখ্যা
থেকে এটা
প্রতীয়মান হয়
যে টার্গেটিং
অ্যাপ্রোচ অনুসরণ
করে কৃষিসহায়তা
কর্মসূচি প্রণয়ন
করা হলে
তা অর্থপূর্ণ
ও কার্যকর
হবে না,
যেহেতু বেশির
ভাগ খানার
জমির পরিমাণ
২ হেক্টরের
চেয়ে কম।
জমির মালিকানা/ভোগদখলিস্বত্বের
ক্ষেত্রে ব্যাপক
পরিবর্তন সাধিত
হয়েছে। বর্গাদারদের
মধ্যে বেশির
ভাগই হলো
মালিক-বর্গাদার,
যাদের নিজস্ব
চাষের জমি
রয়েছে এবং
খামার সম্পদের
যেমন পারিবারিক
শ্রম ও
হালের বলদের
সুষ্ঠু ব্যবহারের
জন্য আরো
জমি বর্গা
নেয়। স্বত্বাধিকারী
কৃষকদের চেয়ে
বর্গাদার কৃষকদের
খামারের গড়
আকার বেশি,
যা ১৯৬০
সালের কৃষিশুমারিসহ
সব কৃষিশুমারিতে
উল্লেখ করা
হয়েছে। বর্গা
চাষের অধীন
জমির অনুপাত
১৯৮৩-৮৪
সালের ১৭
শতাংশ (মোট
ব্যবহূত জমির
পরিমাণ) থেকে
বেড়ে ১৯৯৬
সালে ২২
শতাংশে এবং
আরো বেড়ে
২০০৮ সালে
২৭ শতাংশে
উন্নীত হয়।
এ পরিবর্তনের
কারণ হলো
গ্রামীণ জনসংখ্যার
দ্রুত গ্রাম
থেকে শহরে
অধিগমনের কারণে
অনুপস্থিত মালিকানাধীন
জমির পরিমাণ
বৃদ্ধি পাওয়া
এবং সহায়-সম্পদহীন
দরিদ্র খানা
কর্তৃক গ্রামীণ
অকৃষি পেশা
গ্রহণের কারণে
প্রান্তিক জমির
পরিত্যক্ত হওয়া।
বাংলাদেশে পুনর্বণ্টনমূলক
ভূমি সংস্কার
বহুল বিতর্কিত
বিষয়। জমির
মালিকানার সর্বোচ্চ
সীমা তিন
হেক্টর আরোপ
করা হলে
১০ মিলিয়ন
ভূমিহীন পরিবারের
মধ্যে পুনর্বণ্টনের
জন্য প্রাপ্ত
জমির পরিমাণ
হবে প্রায়
দশমিক ৯
মিলিয়ন হেক্টর
(মোট জমির
১১ শতাংশ),
যা গ্রামীণ
ভূমিহীন পরিবারগুলোর
জীবনযাত্রায় কোনো
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
সাধন করবে
না।
বর্গা চাষ
ব্যবস্থার কাঠামোতেও
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
সাধিত হয়েছে।
ভাগ চাষের
বর্গাপ্রথা যা
কৃষিতে বিনিয়োগকে
নিরুৎসাহিত করে,
তার স্থলে
নির্দিষ্ট খাজনা
ও মধ্যমেয়াদি
ইজারাভিত্তিক বর্গা
চাষের প্রবণতা
বেড়েছে। ১৯৬০
সালে যেখানে
বর্গা চাষকৃত
জমির ৯১
শতাংশ ভাগ
চাষের অধীনে
ছিল, তা
ক্রমান্বয়ে কমে
১৯৮৩-৮৪
সালে ৭৪
শতাংশে, ১৯৯৬
সালে ৬২
শতাংশে এবং
আরো কমে
২০০৮ সালে
৩৯ শতাংশে
নেমে আসে।
বাজার, সামাজিক
ও জনতাত্ত্বিক
শক্তির প্রয়োগের
ফলে নতুন
প্রযুক্তি ব্যবহার
নিশ্চিত করতে
বাংলাদেশের কৃষিপ্রতিষ্ঠানগুলোর
পরিবর্তন ঘটছে।
বিগত পাঁচ
দশকে দেশজ
উৎপাদনে কৃষির
অবদান ক্রমান্বয়ে
কমেছে। তা
সত্ত্বেও দেশের
অর্থনীতি এখনো
প্রধানত কৃষিভিত্তিক।
কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা
বিধান ও
দারিদ্র্য নিরসনে
কৃষি খাতের
গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব
রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে
পরিচালিত কৃষিশুমারি
থেকে প্রাপ্ত
উপাত্তের তুলনামূলক
পর্যালোচনায় বাংলাদেশে
কৃষি খাতের
রূপান্তর, বিশেষ
করে কৃষিসম্পদ
ভিত্তির ও
উৎপাদন সংগঠনের
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
লক্ষ করা
যায়। কৃষিসম্পদের
ভিত্তি ক্রমান্বয়ে
সংকুচিত হচ্ছে।
কমে যাচ্ছে
কৃষি খাতে
নিয়োজিত শ্রমশক্তি।
অন্যদিকে কৃষি
খাতে পুঁজির
পরিমাণ বাড়ছে,
বিশেষ করে
কৃষিকার্যে যান্ত্রিকীকরণের
মাধ্যমে। কৃষিতে
হ্রাসমান শ্রমশক্তির
স্থলে বর্ধিত
হারে পুঁজির
ব্যবহার একদিকে
যেমন শ্রমের
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে
অবদান রাখছে,
তেমনি অন্যদিকে
উচ্চতর কৃষি
মজুরি প্রদানে
কৃষকদের সক্ষমতা
বাড়িয়েছে।
উৎপাদন সংগঠনের
পরিবর্তনের মাধ্যমেও
বাংলাদেশে কৃষির
রূপান্তর ঘটেছে।
উদাহরণস্বরূপ বলা
যায়, সীমিত
ভূমির তুলনায়
জনসংখ্যার আধিক্যের
কারণে কৃষিতে
ক্ষুদ্র ও
প্রান্তিক চাষীর
সংখ্যা বাড়ছে।
উপরন্তু জনতাত্ত্বিক
চাপের কারণে
মাঝারি ও
বৃহৎ খানার
বিভাজন ঘটছে।
এ কারণেও
ক্ষুদ্র ও
প্রান্তিক খামারের
সংখ্যা বাড়ছে।
একই সঙ্গে
জমির মালিকানা
ও ভোগদখলিস্বত্বের
ক্ষেত্রে ব্যাপক
পরিবর্তন সাধিত
হয়েছে।
ড. কাজী সাহাবউদ্দিন: সাবেক
মহাপরিচালক
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)










