সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বাংলাদেশের সমাজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ঐতিহাসিককাল থেকেই এদেশের সমাজব্যবস্থায় পরস্পর নির্ভরশীলতা, শক্তিশালী সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন, পারস্পারিক যোগাযোগ, একে অপরকে সহযোগিতা ও পারস্পারিক যুথবদ্ধতা ক্রিয়াশীল ছিল। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজ মিলেমিশে একাকার ছিল, আর এটাই আদর্শ সমাজ ব্যবস্থার নমুনা হওয়ার কথা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সমাজ জীবন থেকে এই শক্তিশালী চর্চাসমূহ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্বিচার ব্যবহার, ইন্টারনেট ও ভার্চুয়াল জগতের প্রতি নির্ভরশীলতা সামাজিক মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে দিয়েছিল। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে পড়েছিল দমনমূলক সম্পর্কের প্রতিরূপ। রাজনৈতিক বিভক্তি, দমনমূলক শাসন ব্যবস্থা, কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ অভ্যন্তরীণভাবে সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিয়েছিল। ভেঙে পড়েছিল সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান সমূহ। বাংলাদেশ করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে সৃষ্ট আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অচল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ জীবনে সামাজিক সম্পর্ক অনুশীলনের ইতিবাচক পরিবর্তনের শুরু হয়। স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক চরম ঝুঁকি সত্ত্বেও অনেক ব্যক্তি, সামাজিক দল, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাসে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় কাজ শুরু করেছে। দল, মত, আদর্শ, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মানুষ মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামষ্টিক উদ্যোগসমূহ শুধু করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মই না, বরং এগুলো সামাজিক সম্পর্ক পুনরুৎপাদন ও বিন্যাসে এক একটি নতুন দিগন্ত।
নিকট অতীতে তরুণদের সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক কথা সামনে এসেছে। এ সময়ের তরুণদেরকে অনেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আত্মকেন্দ্রিক ও জনবিমুখ হিসেবে বিবেচনা করতেন। বিশেষ কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ ব্যতীত তরুণদের সামাজিক উদ্যোগে তেমন অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যেত না। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাংলাদেশে যখন থেকে শুরু হয়, তখন থেকেই তরুণদের বিভিন্ন উদ্যোগ চোখে পড়ছে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের চেয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তরুণদের উদ্যোগ অনেক প্রশংসনীয় ছিল। সরকার ঘোষিত লকডাউন এর শুরু থেকেই সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রায় সবগুলো এলাকাতেই তরুণরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সামনে এগিয়ে এসেছে। কিছু কিছু অতিরঞ্জন বাদ দিলে দেশের প্রায় সব মহলে তরুণদের এই উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। এলাকার বন্ধু মহল, এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ব্যাচ, বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং এ ধরনের নানা পরিচয়ের ভিত্তিতে তরুণরা নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বা পঞ্চম শ্রেণীতে ঝরে পড়া, বড় চাকরিজীবী বা দিনমজুর, রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা প্রভৃতি বৈষম্যমূলক সামাজিক পরিচিতিকে আড়াল করে তরুণরা নিজ সামর্থের পাশাপাশি অন্যদের সহযোগিতা নিয়ে অভাবী, রোগগ্রস্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে।
সমাজ সবসময়ই একটি ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান। সমাজের ভূমিকা মানব সভ্যতার ইতিহাসে কখনোই নেতিবাচক ছিল না, ভবিষ্যতেও নেতিবাচক হবে না। রাষ্ট্র, রাজনীতি, পুঁজিবাদ সমাজের উপর চেপে বসে কখনো কখনো সমাজের স্বাভাবিক গতিকে স্থবির করে দেয়। কিন্তু সমাজ যখনই একটু অবসর পায়, তখনই তার ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে শুরু করে। এজন্য আমাদের সকলের উচিত সমাজকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয়া। আমরা গত এক বা দুই দশকে প্রচুর সংঘাত দেখেছি, মানুষে মানুষে প্রচুর অসহযোগিতা দেখেছি, আদর্শিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজের মানুষের মধ্যকার বিভাজনের সর্বোচ্চ মাত্রা আমরা দেখেছি, আমরা শিক্ষা, চাকরি, অর্থ ও বিভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে অনেক ধরনের বৈষম্যের অনুশীলন দেখেছি। কিন্তু করোনাভাইরাস আমাদের সকলকে যখন একটি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল, তখন সবকিছু ভুলে মানুষে-মানুষে সম্পর্ক ও যোগাযোগের আদর্শ নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি। সমাজের উঁচু শ্রেণির একটি অংশ ও সারাদেশে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগে প্রায় সকল মানুষের এই সামগ্রিক মানবিক চর্চা ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
কয়েকজন মাত্র ডাক্তার রোগী দেখতে চান নাই। কিন্তু এর বিপরীতে আমরা হাজার হাজার ডাক্তারদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানব সেবা করে যেতে দেখছি। ডাক্তাররা ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে, বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়ে রোগীদের টেলি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু লোকজনের অমানবিক আচরণ বাদ দিলে, অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। অনেক বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াদের ভাড়া মওকুফ করে দিচ্ছেন কেউবা কমিয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষকরা বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সচেতনতামূলক ও জনসেবামূলক কাজে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। বিভিন্ন পেশার মানুষেরা ছোট ছোট উদ্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। করনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী কিংবা মৃত ব্যক্তির চিকিৎসা বা দাফনে কাউকে পাশে পান নাই, দু-একটি এধরনের সংবাদের বিপরীতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়েও অনেক সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ চলমান আছে। এমনকি নারায়ণগঞ্জে হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক নারীর সৎকারে স্থানীয় মুসলিম যুবকদের অংশগ্রহণের খবরও আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি।
প্রবাসীরা বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই আশীর্বাদ হিসেবে ভূমিকা রাখেন। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে তাদের অবদানের কথা আমরা সবাই জানি। বর্তমান এই দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি ভাই-বোনদেরও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি করে দিয়েছে। তারপরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ, ইন্টারনেট বা পরিচিত কারো সাথে কথোপকথনের সূত্র ধরে যখনি কোথাও সহযোগিতার আহ্বান শুনেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সামর্থের সর্বোচ্চটা নিয়ে দেশের ও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রবাসী শিক্ষার্থীরা যারা নিজেরাই এখন অর্থসংকটে আছেন, তারাও ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে নিজেরা অর্থ সংগ্রহ করে তা দেশের সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণকারীদের পাঠিয়েছেন। ডাক্তার-নার্সদের মত ব্যাংকাররাও সেবাকর্মী হিসেবেই পরিচিত। ব্যাংকারদের বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন ও সংগঠন যেমন অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার এই লক ডাউন এর মধ্যেও অনেক ব্যাংকাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত অফিসে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সংবাদকর্মীরা সব সময়েই পর্দার আড়ালে থাকেন। পর্দার আড়াল থেকেই তারা প্রায় সকল উদোগের ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছেন।
সর্বোপরি করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমাজকে আমরা স্বরূপে দেখতে পাচ্ছি। সমাজ ব্যক্তি মানুষকে দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে শেখায়। সমাজ যেকোনো দুর্যোগ ও সমস্যা মোকাবেলায় সামষ্টিক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে শিখায়। সমাজ নিজে মূর্ত বা দৃশ্যমান না। সমাজের সদস্যদের আচার-আচরণ, কার্যাবলী ও আন্ত-সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সমাজ আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়। সাম্প্রতিক মহামারীকে কেন্দ্র করে সমাজের সদস্যদের মধ্যে যে ইতিবাচক ধারা শুরু হলো, সরকার বা রাষ্ট্রের মত নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের বাধার মুখোমুখি না হলে এ ধারা দীর্ঘদিন জারি থাকবে।
লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
ইমেইল: ahabib@soc.green.edu.bd










