গত বছর ১৯৩টি
দেশের এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে যুক্ত
করে বিশ্বব্যাপী একটি আলোচনা সভা আয়োজন করেছিল
জাতিসংঘ। ওই সভায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ
ও সংকটের
কথা উঠে এসেছে। এসব সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়
নিয়ম-নীতিভিত্তিক বহুপাক্ষিকতাবাদ জোরালো করার মাধ্যমে চলতি বছর সংস্থাটির
সাধারণ পরিষদকে
অবশ্যই কার্যকর
পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৈশ্বিক সংস্থাটি ওই আলোচনা সভা থেকে বিশ্বের নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবার প্রত্যাশা ও আশা বিস্ময়করভাবে একই রকম পেয়েছে। মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন ও শিক্ষায় অধিকতর ভালো অভিগম্যতা চায়। মহামারীতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের সঙ্গে আরো বৈশ্বিক সংহতি আশা করে তারা। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ হলো, জলবায়ু পরিবর্তন ও বেড়ে চলা প্রাণবৈচিত্র্য ক্ষতির দ্বৈত সংকট। প্রায় ৯০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীই আজকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বৈশ্বিক সহযোগিতার ব্যাপারে সম্মত। তাদের বেশির ভাগই মনে করে, মহামারী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো বেশি জরুরি করে তুলেছে। বিশেষ উৎসাহজনক বিষয় হলো, স্পষ্টতই তরুণ জনগোষ্ঠী বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চায়।
গত বছরের
আলোচনা সভা ছিল কাজ করার আহ্বান
জানানোর একটি উদ্যোগ। সম্প্রতি
জাতিসংঘের মহাসচিব
এন্তোনিও গুতেরেস
‘আওয়ার কমন এজেন্ডা’ প্রকাশ
করেছেন, যা এক বছর আগে জাতিসংঘের
সদস্যরাষ্ট্রের প্রধান
ও সরকার
কর্তৃক গৃহীত
ইউএন৭৫ পলিটিক্যাল
ডিক্লারেশনেরই বর্ধিত
অভিপ্রকাশ বৈকি।
আমরা কীভাবে
আজকের ও আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারি, সে বিষয়ে
নতুন এজেন্ডা
একটা সাহসী
পরিকল্পনা বিন্যাস
করেছে।
বিশ্ব ব্যবস্থার
ভাঙনের বর্তমান
হুমকিকে অবশ্যই
ঢেলে সাজানোর
একটি বিরাট
সুযোগ হিসেবে
এটিকে আমরা দেখতে চাই। যেজন্য জাতিসংঘের
উচ্চাকাঙ্ক্ষী এজেন্ডাকে
বাস্তবে রূপ দিতে আমরা সংস্থাটির মহাসচিবের
প্রচেষ্টার ব্যাপারে
জোরালোভাবে সমর্থন
দেয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছি।
কভিড-১৯ মহামারী—বৈশ্বিক পর্যায়ে যার বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি—আমাদের এই বার্তা দেয় যে আমরা একটা আন্তঃসংযুক্ত ও আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে বাস করি। তদুপরি গত কয়েক মাসে আমরা বিপুলসংখ্যক মানুষকে হিট ওয়েভ, প্রলয়ঙ্করী বন্যা এবং সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডে (ওয়াইল্ডফায়ার) ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখেছি। এসব ঘটনা পরিবর্তনশীল জলবায়ু সৃষ্ট অপ্রতিরোধ্য হুমকির বিষয়টি আবারো আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
জাতিসংঘ হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার হূিপণ্ড। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির’ উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা (পড়ুন জাতিসংঘ) গঠনে ৭৬ বছর আগে পুরো বিশ্ব একত্র হওয়ার বিষয়টি নিজেই একটি অনন্যসাধারণ উদ্যোগ। এমনকি তার চেয়েও বিস্ময়কর হলো, নানা চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ সংস্থা এখনো টিকে আছে। প্রতিযোগিতা নয়, পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এটি বিশ্বকে একটি অধিকতর ভালো, শান্তিপূর্ণ ও টেকসই ভবিষ্যতের পথ দেখিয়েছে।
অবশ্য বিশ্বের
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো
প্রাথমিকভাবে নির্মাণ
হয়েছিল আন্তঃরাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য; বিভিন্ন দেশের
সীমানার বাইরে
ছড়িয়ে পড়া আর্থিক সংকট, মহামারী, সন্ত্রাসবাদ, সাগরের প্রতিবেশগত নাজুকতা
কিংবা জলবায়ু
পরিবর্তনের মতো সংকট নিরসনের
জন্য নয়। এখন সময় বদলেছে। অতএব, সময়ের সঙ্গে
সংগতি রেখে আমাদের অবশ্যই
বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে, বর্তমানে মুখোমুখি
বৈশ্বিক ও আন্তঃপ্রাজন্মিক চ্যালেঞ্জ
মোকাবেলার জন্য সেগুলোকে সজ্জিত
করে তুলতে
হবে।
জাতিসংঘর প্রতিষ্ঠানকালীন প্রজন্ম ও আজকের বিশ্বের বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। এ বাস্তবতা মাথায় রেখে গত বছর আমরা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের বিতর্ক আরো জোরালো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একই সঙ্গে সাধারণ পরিষদ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদকেও আবারো শক্তিশালী করার কাজ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর মাদ্রিদে স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতির সঙ্গে সংগতি রেখে বহুপাক্ষিকতা শক্তিশালীকরণে আমাদের সাধারণ লক্ষ্য এগিয়ে নিতে তিনটি ক্ষেত্রে কাজ করা উচিত।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য আমাদের নতুন করে অঙ্গীকার
ব্যক্ত করা প্রয়োজন। বহুপক্ষীয়
সংস্থাগুলোকে অবশ্যই
নানা উপায়ে
সজ্জিত করতে হবে। সেগুলোকে
আরো ক্ষমতায়ন
করতে হবে। নীতি ও পরিচালনাগত পর্যায়ে
জাতিসংঘ, আঞ্চলিক
সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে
অবশ্যই পারস্পরিক
সহযোগিতা বাড়াতে
হবে। এক্ষেত্রে
লক্ষণীয় উন্নতি
ঘটাতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠী,
ব্যক্তি খাত, একাডেমিয়া ও অন্যদের কাছে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে
আরো উন্মুক্ত
ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে হবে।
আমরা এরই মধ্যে এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছি। এবারের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের শেষের দিকে আমরা ‘পিসফুল, জাস্ট, ইনক্লুসিভ সোসাইটিজ ইনিশিয়েটিভ’-এর সহযোগিতায় ‘ডেলিভারিং দি ইউএন কমন এজেন্ডা: অ্যাকশন টু অ্যাচিভ ইকুয়ালিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন’ নামে একটি ভার্চুয়াল ইভেন্ট আয়োজন করেছি। উদ্দেশ্য, আমরা যেন সবার কথা শোনাটা নিশ্চিত করতে পারি।
দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য
ও অসমতা
মোকাবেলায় সক্ষমতা
বাড়াতে জাতিসংঘ
মহাসচিবের সাহসী
পদক্ষেপের এজেন্ডায়
আমাদের অবশ্যই
কাজ করতে হবে। অন্তর্ভুক্তিতা, সমান অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত
করতে হবে। জলবায়ু সংকট ও বেড়ে চলা প্রাণবৈচিত্র্য হারানোর সংকট নিরসনের
উপায় সন্ধান
করতে হবে। সর্বোপরি ভবিষ্যৎ
মহামারীর হুমকি
মোকাবেলায় আমাদের
আরো সজ্জিত
ও প্রস্তুত
করে তুলতে
হবে।
আমরা কভিড-১৯ সংকট
থেকে জেনেছি
রোগের প্রাদুর্ভাব, নতুন যুদ্ধ, পরিবেশগত
বিপর্যয় কিংবা
অন্য অদৃশ্য
ঘটনার মতো জটিল ঝুঁকি
অনুমান, প্রতিরোধ
ও সামলাতে
আমাদের সামষ্টিক
সামর্থ্য শক্তিশালী
করতে হবে, বাড়াতে হবে।
অতএব, আমরা
একটি নতুন
বৈশ্বিক ‘জরুরি
প্লাটফর্ম’-এর প্রস্তাবসহ বৈশ্বিক
পূর্বাভাস ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী সক্ষমতা কীভাবে
বাড়ানো যায়, সে সম্পর্কে
মহাসচিবের পরামর্শগুলোকে স্বাগত জানাই।
শেষত, ২০২৩ সালে সামিট অব দ্য ফিউচার নামের একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালীকরণে আমাদের প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে আমরা বদ্ধপরিকর। এখন বিভিন্ন দেশের সীমানা ও প্রজন্মের মধ্যে অনেক ইস্যু অনুরণিত হচ্ছে। এমন এক জটিল বিশ্বে একটি অধিকতর সক্রিয়, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের অবশ্যই বর্তমান সময়কে কাজে লাগাতে হবে। নতুন করে বিন্যাসিত এ ব্যবস্থাই বিশ্ববাসীকে মানসম্মত সেবা জোগাবে এবং বর্তমানে মুখোমুখি হওয়া বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় আমাদের আরো সক্ষম করে তুলবে।
এ প্রচেষ্টা
এগিয়ে নিতে আমাদের প্রত্যেকেরই সম্মুখ সারিতে থাকার
আগ্রহ দেখাতে
হবে। একটি অধিকতর শক্তিশালী
ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইউএনকে কেন্দ্রে রেখে আমাদের অবশ্যই
নীতিভিত্তিক বহুপাক্ষিকতাবাদকে জোরদার করতে হবে। আমাদের সময়ের
এটা একটা বড় রাজনৈতিক
কাজ বৈকি।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কার্লোস আলভারাদো কেসাদা: কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট
জেসিন্ডা আর্ডার্ন: নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী
স্টেফান লেভিন: সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী
সিরিল রামাফোসা: দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট
ম্যাকি সাল: সেনেগালের প্রেসিডেন্ট
পেড্রো সানচেজ: স্পেনের প্রধানমন্ত্রী
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










