আমাদের চিন্তাধারা, আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিক্রিয়া, ভালো থাকা-মন্দ থাকা সবকিছুই মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্ত। শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের যথেষ্ট যত্ন ও সচেতনতা থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের গুরুত্ব এবং সচেতনতা তুলনামুলক কম। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করলে একসময় শারীরিক স্বাস্থ্যেও এর প্রভাব পড়ে। সময়মতো সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়, কর্মদক্ষতা হারিয়ে যায়। আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলেও সর্বস্তরে এর পেশাদার সেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। আবার আমরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হলেও কখনো কখনো প্রবাসী বা প্রবাসফেরত অভিবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি পর্যাপ্ত যত্ন নিতে পারি না। নিয়মিত বা অনিয়মিত পথে দেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমানো অভিবাসীরা অদক্ষতা কিংবা অনিয়মের ফলে কাজ হারানো, কাজ না পাওয়া বা কাজে অসন্তুষ্টি, ভালো সুযোগ-সুবিধার অভাব, থাকা-খাওয়ার অব্যবস্থা, নির্যাতন, অসুস্থতা, আগ্রহ হারিয়ে ফেলাসহ নানা কারণে দেশে ফিরে আসেন। কেউ কেউ ওই দেশে বসবাসের বৈধতা অর্জন, ভিসার সময় বৃদ্ধির অপারগতার ফলেও জোরপূর্বক দেশে ফিরে আসেন। এই দেশে ফিরে আসা অধিকাংশ সময়ই তাদের নিজের কাছে এবং পরিবার-পরিজনের কাছে কাম্য হয় না। বিদেশে আয় উন্নতির স্বপ্ন নিয়ে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসাও তাদের কাছে কষ্টদায়ক অনুভূতি। ফলে অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলেন। এর মধ্যে যারা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন এবং নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। পরিবার-সমাজ তাদের মেনে নিতে চায় না। সমাজের কাছে তারা গ্রহণযোগ্যতা হারায়। তাদের মানসিক উন্নয়নে কাজ করার প্রয়োজন হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা হিসেবে প্রচলিত কাউন্সেলিং এবং সাইকোথেরাপি সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাবে আমাদের সমাজে নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত আছে। এই ভ্রান্ত ধারণা এবং কুসংস্কার দূর করার জন্য কাউন্সেলিং এবং সাইকোথেরাপি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

সোজা ভাষায় বলতে গেলে, কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি হচ্ছে একটি মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে একজন পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা মনোবিজ্ঞানী আমাদের আবেগ, অনুভূতি ও আচরণকে উপযুক্তভাবে ব্যবস্থাপনা করতে সাহায্য করেন। অর্থাৎ আমরা যখন কোনো সমস্যার সম্মুখীন হই তখন কীভাবে সে সমস্যার মোকাবেলা করতে পারি তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেন এবং সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমাদের সঙ্গে পেশাদারি নিয়ম মোতাবেক কাজ করেন। মানসিক উন্নয়নের লক্ষ্যেও কাউন্সেলিং সেবার বিকল্প নেই।

দৈনন্দিন জীবনে চলতে ফিরতে কিংবা অতীতের ঘটে যাওয়া এক বা একাধিক নেতিবাচক ঘটনার কারণে আমাদের মধ্যকার মানসিক শান্তি ও ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং এর ফলে নিজের মধ্যকার মানসিক শান্তি বিনষ্ট হয়। মানসিক শান্তি বিনষ্ট হলে আমরা ধীরে ধীরে বিষণ্নতা, হতাশা, উদ্বেগসহ নানান মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হই। শুধু তাই নয়, আমাদের মধ্যকার মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রভাব ফেলতে পারে আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর। এমন হলে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি সেবা নেয়ার প্রয়োজন হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কভিড-১৯ মহামারীতে আমরা দেশে-বিদেশে দেখতে পেয়েছি করোনাক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন শারীরিক দিক থেকে অনেকটাই সুস্থ কিন্তু মানসিকভাবে চরমভাবে বিষাদগ্রস্ত। একজন কাউন্সেলর বা মনোবিজ্ঞানী ঠিক এ সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেন। তিনি ধৈর্য সহকারে এবং সহানুভূতি সহকারে, মনোযোগ সহকারে কথা শোনেন, ভুলত্রুটির বিচার বিশ্লেষণ বা সমালোচনা না করে সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। তিনি কোনো উপদেশ বা পরামর্শ চাপিয়ে দেন না, কী করা উচিত, কী অনুচিত তা বলে দেবেন না। তিনি চেষ্টা করেন সমস্যা সমাধানে ব্যক্তির পাশে থাকা, পেশাদারি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তির সমস্যার জট খোলা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহায়তা করার। আর এ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করা। একজন কাউন্সেলর বা মনোবিজ্ঞানীর কাছে ব্যক্তি যা বলবেন, তার সবকিছুই থাকবে একেবারে গোপনীয়।

কাউন্সেলর বা মনোবিজ্ঞানীর চেষ্টা থাকে সমস্যা সম্পর্কে বিশদ আলোচনা, থেরাপিউটিক কার্যক্রম এবং ফলপ্রসূ অনুশীলনের মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা এবং উপায়গুলো ব্যক্তির কাছ থেকেই তুলে এনে ব্যক্তির সামনে মেলে ধরা। দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জীবনের উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের এ বৈজ্ঞানিক উপায়ের নামই কাউন্সেলিং। কাউন্সেলিং আর সাইকোথেরাপি শব্দ দুটি নানা জায়গায় প্রায়ই সমার্থক হিসেবে প্রচলিত হলেও এগুলো মধ্যে বেশকিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কাউন্সেলিং আর সাইকোথেরাপি হচ্ছে দুটি স্বতন্ত্র চিকিৎসা পদ্ধতি, যা একজন ব্যক্তির মানসিক সমস্যার তীব্রতা এবং সমস্যার সময়কাল বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। মোটাদাগে বলতে গেলে কাউন্সেলিং তুলনামূলক স্বল্পমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতি। প্রয়োগকৃত নিয়মের ভিত্তিতে এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য সূক্ষ্ম এবং সুদূরপ্রসারী।

কাউন্সেলিং সাধারণত ব্যক্তির ব্যক্তিগত বা অভ্যন্তরীণ দ্বিধাদ্বন্দ্ব্ব, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, দাম্পত্য কলহ, ব্যক্তিগত এবং পেশাগত কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোয় মনোনিবেশ করে। অন্যদিকে মানসিক সমস্যার পরিধি বেড়ে অসুস্থতায় রূপ নিলে সাইকোথেরাপির প্রয়োজন হয়। কাউন্সেলিংয়ের আলোচ্য বিষয়গুলোর পাশাপাশি সাইকোথেরাপিতে একজন বিশেষজ্ঞ তার ক্লায়েন্ট বা ব্যক্তির জীবনের ঘটে যাওয়া অতীত ও বর্তমানের মানসিক যন্ত্রণা বা চাপের কারণগুলো অনুসন্ধান করে সে অনুযায়ী ব্যক্তির জন্য স্বাতন্ত্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

প্রত্যেকটি মানুষ যেমন আলাদা, তেমনি তাদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতিও কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপিতে আলাদা হয়ে থাকে। কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি সেশন লাগবে কিনা, সেশন কেমন হবে, কতটুকু সময় প্রয়োজন হবে, তা সেশনের শুরুতেই বিশেষজ্ঞ আর ব্যক্তি দুজন মিলে ঠিক করে নেন। কাউন্সেলিং শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একজন কাউন্সেলরের যাত্রা নয়। এ যাত্রা দুজনেরই। থেরাপি কত দ্রুত কাজ করবে, কত ভালো কাজ করবে তা কাউন্সেলরের দক্ষতার পাশাপাশি ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, থেরাপি গ্রহণের মানসিকতা, নিয়মিত অনুশীলনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি যেকোনো সময়ে যে কারো প্রয়োজন হতে পারে। বলা হয়, এ পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষই তার জীবনের এমন কিছু সময় পার করে যখন তার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আবার বিষয়টি এমনও নয় যে কেবল মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগলেই কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি সেবা গ্রহণ করতে হবে! জীবনের যেকোনো ধাপে যেকোনো প্রয়োজনে নিজের আত্মোন্নয়নের জন্য, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কিংবা প্রাত্যহিক জীবনে সুন্দরভাবে চলার জন্য এ সেবা গ্রহণের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার পাশাপাশি আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের ছাত্রছাত্রীদের বিকাশের জন্য কিংবা তাদের কর্মীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও মানসিক উন্নয়নের জন্য নানা রকম কাউন্সেলিং আর সাইকোথেরাপি সম্পর্কিত সেবার আয়োজন করে। আত্মোন্নয়নের জন্য কাজ করার জন্যও বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া যায়।

অনেক সময় দেখা যায়, আমরা অনুভব করছি যে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেয়া প্রয়োজন কিন্তু লোকলজ্জা বা শঙ্কার কারণে আমরা সেগুলো নিজেদের মাঝেই লুকিয়ে রাখি। ফলে মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নেতিবাচক চিন্তাগুলো আমাদের কুরে কুরে খেতে থাকে, যা আমাদের জন্য দিন শেষে অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের কঠিন সময়ে আমরা অনেকেই বন্ধু, পরিবার বা পরিচিতদের সাহায্য নিয়ে থাকি। অনেক সময় দেখা যায় ঘুরে দাঁড়াইও। কিন্তু বেশকিছু সমস্যা আছে, যা আসলে এভাবে পেশাদার সাহায্য ছাড়া সমাধান করা যায় না। আবার দেখা যায়, সবার সঙ্গে সব কথা স্বচ্ছন্দে বলতেও পারি না কিংবা দেখা যায়, যাকে ভরসা করে বলছি, সে আমাদের অনুভূতিগুলোকে পাত্তা না দিয়ে একগাদা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এগুলো কখনই আমাদের জন্য কল্যাণকর হয় না। ঠিক এ রকম পরিস্থিতিতেই একজন কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিলে বিষয়গুলো খুব সহজ হয়ে যায়। একজন মানুষ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এমনকি জটিল কোনো শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে যেমন চিকিৎসার প্রয়োজন, তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যায়ও বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন। এতে লজ্জিত বা দোষী হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা এ সমস্যাগুলো নিয়ে যত বসে থাকব ততই তা বাড়তে থাকবে এবং একসময় তা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় রূপ নিতে পারে। তাই আমাদের যখনই মনে হবে যে সাহায্য দরকার, তখনই বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।

একটা সময় ছিল যখন মানসিক সমস্যা মানেই পাগলামি বা মাথা খারাপ হয়ে গেছে বলে মনে করা হতো। এখন সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। আস্তে আস্তে সমাজের প্রতিটি স্তরেই মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ মানসিক সমস্যায় বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিচ্ছে। সমাজের অংশ হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা, সচেতনতার জন্য কথা বলা। যদি আমরা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিই, তবেই একমাত্র মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সব ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার আমাদের মধ্য থেকে বিদায় নেবে। আর বিষয়টিকে স্বাভাবিক করার একমাত্র উপায় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা; পরিবার, বন্ধু এবং অন্যদের সঙ্গে এটা নিয়ে কথা বলা। এছাড়া আমাদের ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ বিষয়ে শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্য কী, কেন মানসিক স্বাস্থ্য এত গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষা করার ভয়ঙ্কর পরিণতি কী, কাকে, কখন, কীভাবে সহায়তা করতে হবে এবং কখন পেশাদারদের সঙ্গে দেখা করতে হবে—এসব বিষয়ে ধারণা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশফেরত অভিবাসীদের মানসিক সমস্যা নিরসন এবং মনোসামাজিক উন্নয়নে তাই কাজ করছে ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির মনোসামাজিক কার্যক্রমের আওতায় ৮ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি বিদেশফেরত অভিবাসীকে প্রাথমিক এবং বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পেশাদার কাউন্সেলিং ও টেলি-কাউন্সেলিং সেবা পেয়েছেন ৪ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি। কাউন্সেলিং তাদের জীবনকে নতুন করে সাজাতে সাহস দিয়েছে, পাশে থেকেছে। অভিবাসীরা বলেন, জীবনে চাইলেই যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। প্রয়োজন শুধু প্রবল ইচ্ছাশক্তি এবং হার না মানা লড়াইয়ের।

 

সাইয়্যারাসুবাহ্: ডেপুটি ম্যানেজার (মনোসামাজিক সহায়তা কার্যক্রম)

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি