গত দুই দশকে সড়কভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি জাতীয় মহাসড়ক। নতুন কলেবরে বিন্যাস, নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো। তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৯৪৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক এবং ৪ হাজার ৮৮২ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক রয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অধিকাংশ মহাসড়কই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। যেটকু অবকাঠামো রয়েছে, সেখানেও নৈরাজ্য প্রবল। যানবাহন চলাচলে নেই কোনো শৃঙ্খলা। নিরাপত্তাও তলানিতে। প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মহাসড়কগুলো এখনো পরিচালিত হচ্ছে শতাব্দী প্রাচীন আইন দিয়ে। মহাসড়কের জন্য বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ই ১৯২৫ সালের ওই আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এ অবস্থায় সময়োপযোগী নতুন মহাসড়ক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি এ আইনের বিল প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত পাস করে আইনটির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।

নামে মহাসড়ক হলেও কার্যত এর প্রতিফলন নেই আমাদের জাতীয় মহাসড়কগুলোয়। সবখানে বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার ছাপ। যখন-তখন পথচারী ও পশু পারাপার হচ্ছে। দ্রুতগতির যানের সঙ্গে চলছে ধীরগতির যানবাহন। ফসল শুকানোসহ গৃহস্থালি নানা কাজে মহাসড়ক ব্যবহার করছে মানুষ। কোথাও কোথাও নিয়মিত হাটবাজার বসাচ্ছে মহাসড়কের ওপর। আবার কোথাও কোথাও বেদখল করা হচ্ছে মহাসড়ক। মহাসড়ক-সংলগ্ন জায়গায় গড়ে তোলা হচ্ছে অবৈধ স্থাপনা। এতে দুর্ঘটনা ও যানজট যেমন বাড়ছে, তেমনি মহাসড়কের আয়ুষ্কালও কমছে। এছাড়া মহাসড়কের মূল কর্তৃত্বে কারা থাকবে, রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে, কীভাবে পরিচালিত হবে, কার  কতটুকু আইনগত এখতিয়ার প্রভৃতি বিষয়ে সুস্পষ্টতার ঘাটতি আছে। নতুন আইন বিদ্যমান অস্পষ্টতা ও অসংগতিগুলো দূরীকরণে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা।

মহাসড়ক নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করার জন্য সব দেশেই আইন রয়েছে। থাইল্যান্ডে ১৯৯২ সালেই মহাসড়ক আইন করা হয়েছে। ওই আইনে সেখানে কীভাবে মহাসড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হবে, কীভাবে সড়কগুলো পরিচালিত হবে, কারা আইন প্রয়োগ করবে, টোল আদায়ের পদ্ধতি, স্থানভেদে গাড়ির গতিসীমা কত হবে, কী ধরনের যানবাহন চলতে পারবে, কোথায় কোথায় ইন্টারসেকশন হবে, কোন লেনে কোন ধরনের গাড়ি চলবে, কারা রক্ষণাবেক্ষণ করবে, আইন অমান্য করার শাস্তি কী প্রভৃতি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। দেশটির মহাসড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধানে আইনটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ায়ও সমরূপ আইন আছে। তাতে কার কী দায়িত্ব, কীভাবে মহাসড়ক চলবে সবকিছু নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। শ্রীলংকায়ও এ ধরনের আইন বিদ্যমান। ২০০৮ সালের এ আইনে মহাসড়কের নকশা ও নির্মাণ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও সবিস্তার বিধান সন্নিবেশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেগুলোর  কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং নতুন আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে ওইসব দেশের নীতি-পদক্ষেপ অনুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা দরকার, যাতে বড় ধরনের কোনো ঘাটতি থেকে না যায়।

নতুন মহাসড়ক আইনটি বর্তমান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ আইনে বলা হয়েছে, মহাসড়কে কিংবা মহাসড়কের পাশে অনুমোদন ছাড়া কোনো অবকাঠামো তৈরি করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। একইভাবে মহাসড়কে বাজার, মার্কেট, অস্থায়ী দোকান, এমনকি ফুটপাতে বেচাকেনা করলেও এই শাস্তির আওতায় আনা হবে। যানবাহন এবং মানুষের চলাচলে ন্যূনতম বাধার সৃষ্টি করে, এমন সব অবকাঠামোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি অনুমতি ছাড়া রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না। অনুমতি পেলেও এজন্য মাশুল দিতে হবে। সেই সঙ্গে অনুমোদন ছাড়া সাইনবোর্ড, তোরণ বা বিলবোর্ড প্রদর্শন করলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। রাস্তার ওপর ফসল, খড় বা এ ধরনের অন্য কোনো উপকরণ শুকাতে দেয়া যাবে না। নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোনো স্থান দিয়ে গবাদিপশু প্রবেশ করানো, পারাপার, চরানো, হাঁটানো বা অবস্থান করানো যাবে না। ক্ষতিকর পদার্থ নির্গত হয় এমন যানবাহন চালানো যাবে না। এ ধরনের অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার থেকে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হবে। এছাড়া ধীরগতির যানবাহন নির্ধারিত লেন ছাড়া অন্য কোনো লেনে চলতে পারবে না। নির্ধারিত স্থান ছাড়া কোথাও ইউটার্ন নির্মাণ করা যাবে না। মহাসড়ক বা সড়কের স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি, অবৈধ দখল কিংবা প্রবেশমুক্ত রাখার জন্য কী করণীয় হবে, কারা কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করবে, কীভাবে সার্ভে করবে তা-ও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। সর্বোপরি, এখতিয়ারগত কর্তৃত্বও নতুনভাবে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ১৯২৫ সালের আইন অনুসারে সব ‘সরকারি রাস্তা’ গণপূর্ত বিভাগের অধীনে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। কয়েক দশক ধরেই সড়কগুলো সওজের অধীনে রয়েছে। এবার তা একেবারে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখন এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নই কাম্য।

আমরা দেখছি আইন বাস্তবায়নে সব সময়ই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যেমন আইনে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া পথচারীরা পার হতে পারবে না। অথচ অনেক জায়গায় তাদের পারাপারের জন্য নির্দিষ্ট জায়গাটি নির্দিষ্ট করে দেয়া নেই কিংবা তার জন্য সুব্যবস্থাও করা হয়নি। একইভাবে সড়কের পাশে হাটবাজার বসা বা অন্য অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু খবর মিলছে, কিছু মহাসড়কে খোদ সওজই হাটবাজার দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দিয়ে রেখেছে। প্রণীতব্য আইনটির বাস্তবায়ন করতে হলে এসব আনুষঙ্গিক অসংগতি বা বৈপরীত্যের অবসান ঘটাতে হবে। নইলে সেটি প্রয়োগ করা কঠিন হবে। দেশে অনেক ভালো ভালো আইন আছে কিন্তু বাস্তবায়নে দুর্বলতায় এর সুফল থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। নতুন মহাসড়ক আইনের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা চাই। নতুন আইনে বিভিন্ন অপরাধের জন্য আর্থিক জরিমানা ও শাস্তি বাড়ানো হয়েছে। আর্থিক জরিমানার মাধ্যমে মানুষকে অযাচিত হয়রানি না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দ্বারা এ ধরনের অপব্যবহারের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এটি যেন না হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কের সংখ্যা ও ব্যবহার বেড়েছে। আমরা উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে যাত্রা করতে যাচ্ছি। কিন্তু মহাসড়কে এখনো কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সেদিক থেকে একটি যুগোপযোগী আইনের উপযোগিতা ও দাবি অনেক দিনের। অনেক দেরিতে হলেও সরকার একটি নতুন আইন প্রণয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে দ্রুতই তা পাস করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমলে নিয়ে আইনটিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সার্বিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা দরকার। একই সঙ্গে সেটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও প্রয়োজন।