ব্রাজিলের সাভানা উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত ব্রাসিলিয়া নগরী। ১৯৫৬ ও ১৯৬০-এর সময়কালে পরিকল্পনাবিদ লুসিও কস্তা এবং স্থপতি অস্কার নিমেয়ার যৌথ প্রচেষ্টার উষ্ণমণ্ডলীয় এ সমতল তৃণভূমিকে রিও ডি জেনিরোর স্থলে রাজধানী হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। ডানামেলা পাখির আকৃতিতে বিন্যস্ত এ শহরের পাহাড়ের চূড়ায় দুই হাত সম্প্রসারিত ক্রিস্ট দ্য রিডিমার ভাস্কর্যের মিশেলে ব্রাসিলিয়া হয়ে ওঠে ক্রমে শক্তির প্রতীক। বিশ শতকের ভাস্কর্য শিল্পের বিশুদ্ধতা, উত্কর্ষ আর অকৃত্রিমতার প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে যিশুর এ মূর্তি। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো এ শহরকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। তবে সুনন্দ এ শহর এখন নগর পরিকল্পনার ত্রুটি দ্বারা জর্জরিত।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, গাড়িচালকদের সুবিধার বিষয়গুলো প্রাধান্য দিয়ে নকশা করা হচ্ছে শহরের রাস্তাঘাট। নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মনুমেন্টাল অ্যাকসিস বা এক্সজো মনুমেন্টাল মানে কংক্রিটের আঁকাবাঁকা সড়কের প্রতিচ্ছবি। যদিও আগেকার সবুজ মাঠ আর স্মৃতিস্তম্ভগুলো ছিল বেশ নয়নাভিরাম। তাছাড়া প্রাকৃতিক নৈসর্গের মধ্যে দুই পাশে প্রসারিত ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে সবাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কিন্তু মনুমেন্টাল অ্যাকসিসে ঠিক এ ধরনের পরিসরের অভাব রয়েছে। আপনি এখানে এসে নান্দনিক একটি সেলফি তুলতে পারবেন, কিন্তু সকালের প্রাতঃভ্রমণ কিংবা সন্ধ্যাকালীন হাত-পা ছেড়ে হাঁটতে পারবেন না।
বিশ্বজুড়ে সিটি করপোরেশন ও নগর কর্তৃপক্ষ যখন তাদের সড়কগুলো পথচারী ও বাইসাইকেল আরোহীদের জন্য নিরাপদ করতে বেশি সচেষ্ট, সেখানে ব্রাসিলিয়ার গাড়িগুলোর ইঞ্জিনের আওয়াজ আর টায়ারের কানফাটা শব্দ শুনে মনে হয় বিশ শতাব্দীর নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে ঠিক কতজন আজকের ব্রাসিলিয়ার এ পরিণতির কথা চিন্তা করেছিলেন! বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের এখন তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী নগর বিন্যাসের জন্য রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে।
ব্রাসিলিয়াকে ঘিরে আমরা যেমন জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখি, তা শুধুই শহরটির পরিকল্পনামাফিক বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। ভবনগুলো একটি অন্যটি থেকে বেশ দূরত্বে অবস্থিত হলেও এলোমেলোভাবে ছড়ানো-ছিটানো। একমাত্র সান্ত্বনা অস্কার নিমেয়ারের মাস্টারপিসের বক্ররেখাগুলো, যা ব্রাসিলিয়ার স্থাপত্য ও নির্মাণ ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই। এ-সম্পর্কিত একটি লেখায় নিমেয়ার বলেছিলেন, ‘পাহাড়ে, সমুদ্রের ঢেউয়ে আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষের অবয়ব খুঁজে ফিরি।’ ব্রাসিলিয়া নগরীটি ঘিরে সমসাময়িক যে নকশা বা ভাস্কর্যগুলো নির্মিত হচ্ছে, সেখানে শহরটির প্রচলিত স্থাপত্য ঐতিহ্যের অনুপস্থিতি ক্রমে একে সামাজিকভাবে কপর্দকশূন্য করে তুলছে। প্রথমত, এখানে গণপরিসরের অভাব প্রকট। এখন যা আছে তা অনেকটাই আহার শেষে পড়ে থাকা বাসি রুটির মতো। অতীতে আড্ডা-আলাপচারিতায় সরগরম হয়ে থাকা সড়কগুলো এখন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থেকে বঞ্চিত। মানবিক শহর নয়, এটি এখন স্রেফ নগর অবকাঠামোর ব্যঙ্গাত্মক উপস্থিতি দিয়ে পরিপূর্ণ।
ব্রাসিলিয়ার আরেকটি ত্রুটি হচ্ছে অসম নগর ব্যবস্থাপনা, যা নগর পরিকল্পনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে। আমি যখন প্রথমবারের মতো এখানে আসি, তখন অস্কার নিমেয়ারের নকশা করা গির্জা দেখে মুগ্ধ হয়ে এর প্রশংসা করেছিলাম। আসলেই ইট-পাথরের মিশ্রণে শ্বেত-শুভ্র ফুলের মতো ফুটে আছে তার এ স্থাপত্যশৈলী। তখন আমাদের প্রতিনিধি দলের একজন প্রকৌশলী খানিকটা কৌতুক করে বলে উঠলেন, ‘আপনি কি জানেন, এ শহরের সমস্যাটা কী? সেটা হচ্ছে, কফিশপগুলো চিনির বাজার থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।’
তিনি হয়তো মজা করেই কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন লুসিও কস্তা ও অস্কার নিমেয়ার ডানামেলা পাখির আকৃতির নকশার সঙ্গে আধুনিক নগর পরিকল্পনা নীতির মৌলিক সীমাবদ্ধতার দিকে। একটি অযৌক্তিক বিভাজন কৌশল কীভাবে একটি শহরের সহজাত বিকাশের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে, ব্রাসিলিয়া যেন এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে নিস্তেজ, ক্লান্তিকর হোটেলের পরিবর্তে ব্রাসিলিয়ায় আপনার কয়েক ঘর প্রতিবেশী জুটে যাবে। অন্য কথায়, জটিলতামুক্ত নগর নির্মাণের বাইরে শহরটিকে একটি সূত্রে গাঁথার বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ। অর্ধশতাব্দী আগে গণিতবিদ ও স্থপতি ক্রিস্টোফার আলেকজান্ডার এ শহরের নগর পরিকল্পনার ত্রুটির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ব্রাসিলিয়া একটি বৃক্ষহীন শহর। একটি মহানগর কখনই হুবহু পূর্বনির্ধারিত শ্রেণীবিন্যাস বা পরিকল্পনামাফিক পরিচালিত করা সম্ভব নয়, তবে শহরের রাস্তাঘাট-আবাসন-বাণিজ্যিক স্থান ইত্যাদি একটির অন্যটির সঙ্গে সংযুক্ত উপাদনগুলো হওয়া উচিত একটি নেটওয়ার্কের মতো। যদিও জটিল নকশার পরিবর্তে ব্রাসিলিয়ার নগর পরিকল্পনাবিদরা এখনো স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টা ধরে রেখেছেন, যার প্রশংসা করতেই হয়।
সৌভাগ্যবশত, ব্রাসিলিয়া এখনো কোনো হারিয়ে যাওয়া নগরীতে পরিণত হয়নি। তাই তাকে নিয়ে আমরা সবাই আশাবাদী। আপনি যত বেশি এখানকার অধিবাসীদের জানতে শুরু করবেন তত বেশি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন যে কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মানিয়ে চলতে শিখে যাই। উদাহরণস্বরূপ পোসাডাস হোটেলটির কথাই ধরা যাক। পর্যটকদের ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য হোটেল অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিতে শহরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে তারা। ‘আরবান আকুপাংচার’ বা নগরায়ণের কংক্রিটের খোঁচা ব্রাসিলিয়ার আধুনিকতার বিপরীতে খানিকটা অস্বস্তি হিসেবে দৃশ্যমান।
তবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে টিকে থাকা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে এখানকার আদিবাসীর। যারা আজ থেকে পাঁচ শতাব্দী আগে ইউরোপীয়দের আগমন সত্ত্বেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিলুপ্তি প্রতিরোধ করেছে। নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের তাই শহরটির ঐতিহ্য ও প্রাসঙ্গিকতার বিষয়গুলোকে মূল্য দিয়ে নকশা ও নির্মাণের বিষয়গুলো ত্বরান্বিত করা উচিত, যা করার অনেক পন্থাও আছে। এর মধ্যে অনেকগুলো আবার খুব সোজাসাপ্টাও। উদাহরণস্বরূপ, ফুটপাত ও মোটরসাইকেল চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পথ প্রশস্ত করা। সামান্য এ উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা একটি শহরকে অনেক বেশি উপভোগ্য করে তুলতে পারি। মাঝারি মেয়াদে, ‘প্লানো পিলোটো’ বা ডানামেলা পাখির আকৃতিতে বিন্যস্ত মূল নকশাকে অক্ষুণ্ন রেখে ব্রাসিলিয়ার আশপাশে নতুন এলাকা তৈরি করা যেতে পারে কিংবা শহরটি এর আশপাশ দিয়ে প্রশস্ত করা যেতে পারে।
ব্রাসিলিয়ার নকশার সীমাবদ্ধতা অন্য অনেক শহরের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদরা যদি তাদের নকশাকৃত কাগজের প্রতি ইঞ্চি জায়গা ভরাট করার প্রলোভন প্রতিহত করেন, এর পরিবর্তে যতটা সম্ভব জায়গা ছেড়ে দিয়ে মানুষকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত শহর নির্মাণের সুযোগ করে দেন তাহলে কিন্তু দারুণ হয়। সাহিত্যিক উমবার্তো একো এ ধারণাকে অভিহিত করেছেন ‘ওপেন ওয়ার্ক’ বলে, যা আগে থেকে তৈরি নকশা অনুসরণ করে অগ্রসর হওয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। কম্পিউটার বিজ্ঞানের কাছ থেকে আমরা এ ধারণা ধার নিতে পারি এবং জোর দিয়ে বলতে পারি ‘ওপেন ওয়ার্ক’, অন্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার ফলে এ থেকে দারুণ কিছু তৈরি হতে পারে।
শেষবার ব্রাসিলিয়া থেকে ফিরে আসার সময় আমার হঠাৎ লে কর্বুসিয়ার একটি উক্তি মনে পড়ে যায়। কর্বুসিয়া বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সুইস-ফরাসি স্থপতি, তিনি আধুনিক নগর পরিকল্পনা নীতি বিকাশে সহায়তা করেছিলেন, যা ব্রাসিলিয়ার মতো নগরী নির্মাণে সহায়তা করে। জীবনের শেষ সাক্ষাত্কারে এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কি আপনার এমন কোনো প্রকল্পের কথা উল্লেখ করবেন, যা বহুমুখী সামাজিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে? কর্বুসিয়া ভীষণ চমত্কার একটি উত্তর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জীবন সব সময় নির্ভুল, তাই ভুলটা আমাদের, স্থপতিদের।’
কার্লো রাত্তি: ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সেন্সিবল সিটি ল্যাবের পরিচালক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস










