গত তিন দশকে আমাদের রাজধানীর গড় উষ্ণতা তিন গুণ বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, উচ্চ তাপমাত্রার শহরগুলোর প্রথম দিকে রয়েছে ঢাকা। তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ঢাকাবাসীর কর্মক্ষমতা কমছে। তারা স্বাভাবিক কর্মক্ষমতার চেয়ে কম কাজ করতে পারছেন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এ সমস্যা ভবিষ্যতে আরো প্রকট হবে। ২০৪১ সালে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এটা অনেকাংশে নির্ভর করবে মানুষের কর্মক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতার ওপর। কাজেই শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র ঢাকার তাপমাত্রা সহনীয় রাখতে নগর কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
বহিস্থ ও অভ্যন্তরীণ নানা ফ্যাক্টরে ঢাকার তাপমাত্রা বাড়ছে। বলা হচ্ছে, গত ৩২ বছরে এ নগরীর মোট তাপমাত্রা যে পরিমাণে বেড়েছে, তাতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ভূমিকা মাত্র ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশই মূলত দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঘটেছে। শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন—সবই এখনো রাজধানীকেন্দ্রিক। নানা প্রয়োজনে আসছে মানুষ। কর্মসূত্রে এখানে থাকছে। আবাসন, উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে প্রতিদিন কমছে জলাভূমি, কমছে সবুজের বেষ্টনী। বাড়ছে কংক্রিটের ইমারত, স্থাপনা, অবকাঠামো। একটি আদর্শ নগরে মোট আয়তনের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকায় সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ৬-৮ শতাংশে নেমেছে। তদুপরি অফিস-আদালত, গাড়িতে, বাসায় সবখানে বাড়ছে এয়ারকন্ডিশনারসহ তাপ ছড়ানো যন্ত্রের ব্যবহার। ফলে বেড়ে চলছে রাজধানীর সার্বিক উষ্ণতা। এরই মধ্যে অন্য এক গবেষণায় ঢাকার ২৫টি এলাকাকে চরম উষ্ণ এলাকা বা ‘হিট আইল্যান্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাড্ডা, গুলশান, কামরাঙ্গীর চর, মিরপুর, গাবতলী, গোড়ান, বাসাবো, শহীদ নগর, বাবুবাজার, পোস্তগোলা, জুরাইন, হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কুর্মিটোলা, উত্তরা, কামারপাড়া, মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদিয়া হাউজিং, আদাবর, ফার্মগেট, তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া ও মহাখালী। আরো কিছু এলাকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সব মিলিয়ে ঢাকা আজ উচ্চ তাপমাত্রার এক নতুন সংকটের মুখোমুখি।
উষ্ণায়ন বৃদ্ধি নিছক ঢাকা বা বাংলাদেশের উদ্বেগ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ সমস্যা মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক শহরের নগর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করছে। কানাডার টরন্টোয় তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত নাজুকতা কমাতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরোধমূলক ও প্রতিক্রিয়ামূলক উভয় ধরনের পদক্ষেপই রয়েছে। প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে নগর কর্তৃপক্ষ শহরে স্বাস্থ্যসম্মত সবুজ পরিসর বাড়িয়েছে। যেসব এলাকায় সবুজের ঘাটতি আছে সেখানে গাছপালা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যমান জলাভূমি সুরক্ষিত করেছে। সুনির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিতপূর্বক নতুন করে আরো জলাশয় তৈরি করেছে। নগর উদ্যানের সংখ্যা বাড়িয়েছে। ত্বরান্বিত করেছে গ্রিন রুফ ও গ্রিন ওয়ালের ব্যবহার। পরিবেশকে মাথায় রেখে নগর পরিকল্পনা ও ভবনের নকশায় এনেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। আর প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ হিসেবে একটি সুসমন্বিত হিট রেসপন্স প্ল্যানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। নিয়মিতভাবে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। হটস্পট চিহ্নিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নাজুক জনগোষ্ঠীকে দ্রুত সেবা দিতে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ঢেলে সাজিয়েছে। সর্বোপরি জ্বালানির ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে সেখানে বিভিন্ন ধরনের পিক-সেভিং ম্যাকানিজম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাসহ অন্য কিছু উদ্ভাবনমূলক কৌশল নেয়া হয়েছে। স্পেনের বার্সেলোনা, ব্রাজিলের সাও পাওলো, গ্রিসের এথেন্স, নেদারল্যান্ডসের লিসে, টোকিও, লন্ডনসহ বিশ্বের আরো কিছু শহরেও টরন্টোর মতো উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে অভিযোজনে নানা ধরনের প্রতিরোধমূলক ও প্রতিক্রিয়াধর্মী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ওইসব শহরের গৃহীত উদ্যোগ, নগর পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
অসহনীয় গরমে ঢাকায় মানুষ নানাভাবে ভুগছে। অসুস্থ হচ্ছে ও জীবনীশক্তি কমে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই কমছে কাজের স্পৃহা। একজন মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিক শরীর বা মন নিয়ে যে পরিমাণ কাজ করতে পারে, অসুস্থ শরীর বা মন নিয়ে তার পক্ষে সেই পরিমাণ কাজ করা সম্ভব নয়। এটি হলো একটি দিক। আরেকটি দিক হলো, উষ্ণায়নে মানুষ স্থায়ীভাবেই কর্মক্ষমতা হারাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও এর ইঙ্গিত মেলে। কাজেই বিষয়টিকে হেলায় নেয়ার সুযোগ নেই। এটা একটা উদীয়মান সংকট। এটি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও প্রতিক্রিয়ামূলক উভয় ধরনের পদক্ষেপই নিতে হবে।
কিছুদিন আগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নতুন করে ড্যাপ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশোধিত ড্যাপে সবুজ বেষ্টনী গড়ার অঙ্গীকার ফুটে উঠেছে। সেখানে নতুন করে জলাশয়, নগর উদ্যান, সবুজ পরিসর ও পার্ক নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক। তবে আমাদের দেশে পরিকল্পনার সঙ্গে মাঠের ফারাক বিস্তর। পরিকল্পনায় অনেক ভালো ভালো কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয় না। সংশোধিত ড্যাপের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় আশা করব। পরিকল্পনায় যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ইট-পাথরের আচ্ছাদন নয়; ঢাকায় সবুজের বিপুল সমাবেশ ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তাপমাত্রার হটস্পটগুলো কী, কেন সেখানে তাপমাত্রা বেশি থাকছে, তার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। হিট ওয়াচ মনিটরিং বাড়াতে হবে। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় তাপমাত্রাজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা ও সেবা সুবিধাও বাড়াতে হবে, যাতে এ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা করা সহজ হয়।
পরিবেশগত সূচকে অনেক দিন ধরে তলানিতে আমাদের রাজধানী ঢাকা। দখল-দূষণে ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। বায়ুর মান খুবই খারাপ। শহরের বাতাসে শ্বাস নেয়া যেন বিষ গ্রহণের শামিল। তার মধ্যে উচ্চ তাপমাত্রা নতুন সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় নগর পরিকল্পনা ও ভবনের নকশায় আনতে হবে পরিবর্তন। গ্রহণ করতে হবে পরিবেশবান্ধব ও সবুজ অ্যাপ্রোচগুলো। রোধ করতে হবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। নগর পরিকল্পনাবিদ, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করে ঢাকার বাসযোগ্যতার উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা নেয়া এবং তার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।










