বাংলাদেশে রুমি চর্চা ও সাধনা ইত:বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় সাত শতক আগে শুরু হলেও এর প্রয়োগিক প্রৎকর্ষতা প্রতিষ্ঠা লাভ করে সুফি সাধক  সৈয়দ আহমদুল হকের (১৯১৮-২০১১) হাতে। বিশাল বাংলায় সুফিবাদের সগৌরব উপস্থিতি দীর্ঘকালের। কখনো প্রকাশ্য, কখনো প্রচ্ছন্ন, কখনো প্রগলভতায়, কখনো প্রতীকে প্রত্যয়ে মরমী ভাবধারা বাউল কবির কণ্ঠে, সাইজীর আখড়ায়, সাধু সন্নাসীর স্বগতোক্তি সংলাপে, ওয়াজ মাহফিলে বাগ্মী বক্তার সুরারোপিত উচ্চারণে আপাত শ্রুত বলে মনে হলেও সেই প্রাচীন উপনিষদকালেও তাদের ধ্যান ও দর্শনের মধ্যে সুফিতত্ত্বের যোগসূত্র সন্ধান মিলবে।

ভলগা থেকে গঙ্গায় যে স্রোতধারা শত সহস্র বছরে বহমান, তার মধ্যে যাতায়াত ঘটেছে এই দর্শন আচারী আবহের। পারস্যের কবি মওলানা জালালউদ্দিন রুমির (১২০৭- ১২৭৩) অমিয় বাণী বাংলার পথে প্রান্তরে চারণ কবির কণ্ঠে শুধু নয়, নিভৃতচারী সাধক, কর্মবীর আর মুখরিত মানুষের মুখে মুখেও ফিরেছে।

আমাদের জীবনমানে, ধ্যান ও জ্ঞানে, প্রত্যয় ও প্রত্যাশায়, চাওয়া পাওয়ার প্রান্তরে রুমির মরমী ধ্যান ধারণার অন্যতম সাধকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ছিলেন সৈয়দ আহমদুল হক। রুমি গবেষণায় নিজেকে নিবেদন নিষ্ঠায় তিনি এতটাই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন যে তার মধ্যে রুমির অনুকম্পন অনুভূত হয়। আর তাই তিনি লভেছিলেন ‘বাংলার রুমি’র অভিধা। 

 সৈয়দ আহমদুল হক ( জন্ম:২ সেপ্টেম্বর ১৯১৮-মৃত্যু:৫ সেপ্টেম্বর ২০১১) 

বাংলাদেশের রুমি চর্চার প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য যে ‘রুমি সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হয় তার সূত্রপাত ঘটান সৈয়দ আহমদুল হক। তিনি নিজে আজীবন সুফি সাধনায় আত্মনিয়োজিত ছিলেন। রুমি চর্চায় তাঁর নিজের আধ্যাত্মিকতা, অধ্যয়ণ-অধ্যবসায় আচার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি- তিনি বাংলা ভাষায় রুমির রচনাবলীকে সরল-সরস প্রাঞ্জল অনুবাদ ভাবানুবাদের মাধ্যমে জনপ্রিয় করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে ‘সৈয়দ আহমদুল হক রচনাবলী’প্রকাশিত হচ্ছে, সেখানে সংকলিত ও সুসম্পাদিত অবস্থায় রুমির অমর সাহিত্যে সম্ভারের সন্ধান মিলছে। অতি সম্প্রতি দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থা মাওলা ব্রাদ্রার্স থেকে ‘সৈয়দ আহমদুল হক রচনাবলী’ তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। এই খণ্ডে সৈয়দ আহমদুল হক কর্তৃক রুমির মসনভী শরীফের বিদ্যমান চারশ বিয়ল্লিশটি কাহিনী থেকে  একশ পনেরটি কাহিনী মূল ফারসি কবিতার গুরুত্বপূর্ণ শ্লোকসমুহ পুরোপুরিভাবে উদ্ধৃত করার পাশাপাশি বাংলা উচ্চারণের সন্নিবেশ ঘটিয়ে সাবলিল বাংলায় অনুবাদ পরিবেশিত হয়েছে। 

পরিবেশিত কাহিনীগুলোতে সৈয়দ আহমদুল হকের বর্ণনাভঙ্গীর অনুপম বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে, তার চাইতে বড় কথা এখানে তার সুফি চর্চার অন্তনির্হিত ভাব দর্শনের সন্ধান মেলে। সুফি সাধনা মূলত মুক্তবুদ্ধি সনাতন ধর্মচর্চা- ধর্মের সাথে কর্মের সংযোগ সমন্বয় সাধনের যে আদর্শ তা ধর্মীয় গোঁড়ামি রহিত ও মানবিক মূল্যবোধের আদর্শে উজ্জীবি - মানুষের মনুষত্বের উদ্বোধন আহ্বান- নিজেকে চেনার কোশেষ- এ সবই সুফি সাধনার অন্তর্নিহিত বাণী।

এ কারণে, সুফি সাধকরা যুগে যুগে মুক্ত বুদ্ধি মানুষ, সার্বিক সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সম্প্রদায়গত ভেদ বুদ্ধি বিভাজন রহিত উদার উন্মুক্ত মনোভাব মনোভঙ্গির বিকাশকে প্রাধান্য দিয়েছে। সৈয়দ আহমদুল হকের জীবন সাধনা ও সাফল্য এসব বৈশিষ্ট্য ও বদান্যতায় বিভূষিত ছিল।

মওলানা জালালুদ্দিন রুমি ৬ রবিউল আউয়াল ৬০৪ হিজরী মোতাবেক ৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭ খৃষ্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানের উত্তর সীমানায় অবস্থিত বল্খ নগরে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও ধর্মত্ববিদ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বাহাউদ্দীন ওলদ ও মাতার নাম মোমিনা খাতুন। মাওলানা পিতার দিক হতে হজরত আবু বকরের (রা:) ও মাতার দিক হতে হজরত আলীর (রা:) বংশধর ছিলেন। বাহাউদ্দীন ওলদ অত্যন্ত জ্ঞানী লোক ছিলেন। তাঁকে সুলতানুল ওলামা বলা হতো। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ধর্মত্ববিদ, সুফি এবং অতিন্দ্রিয়বাদী, যার ছিল অদম্য সাহস, সাধুতা, অন্তরের মহত্ত এবং খোদার প্রতি দার্শনিক বা মৌল অভিগমনের পরিবর্তে সরাসরি অধ্যাত্মিকভাবে সমীপবর্তী হওয়ার বাসনা। পিতার এই বৈশিষ্ট্যতায় রুমি ভীষণভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

রুমি যে যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন অটোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে খ্রিস্টান আক্রমণকারীদের এবং বাইরে থেকে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত ছিল। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোড়ন রুমিকে তরুণ বয়স থেকে আতঙ্ক-বিশৃঙ্খলার দ্বারা দহন করছিল। ধর্মীয় বিরুদ্ধবাদীদের বিরোধিতা ও সম্ভাব্য মোঙ্গল আক্রমণের আশঙ্কায় আলাউদ্দীন ওলদ ১২১৯ খৃষ্টাব্দে বল্খ ত্যাগ করেন। পথে নিশাপুরে বালক জালালুদ্দীনের সঙ্গে মহাতাপস শেখ ফরিদুদ্দীন আত্তারের (১১৪৫-১২২০) দেখা হয় এবং তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, কালে বালক জালালুদ্দীন একজন মহাজ্ঞাণীতে পরিণত হবেন। আত্তার রুমি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন, ‘এই বালকটি খোদা প্রেমের  অন্তরে একটি দ্বার উদঘাটন করবে।’ রুমিও কখনো আত্তারকে ভুলতে পারেননি। আত্তার সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আত্তার ভালোবাসার সাতটা নগরই ভ্রমণ করেছেন আর আমি এখনো একটি গলির প্রান্তে পড়ে আছি।’ এ সময় বাহাউদ্দীন ওলদ সপরিবারে হজ্বব্রত পালন করেন এবং কিছুদিনের জন্য আলেপ্পো ও দামেস্কে অবস্থান করেন। এরূপ পরিভ্রমণকালে মওলানা জালালুদ্দীন কয়েকজন আরব পন্ডিতের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাঁদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন।

মওলানা রুমি সম্ভবত ১২৫৮ খৃষ্টাব্দের দিকে তাঁর মসনবী লেখা ধরেন। ১২৬২ খৃষ্টাব্দে তিনি মসনবীর দ্বিতীয় খণ্ড লেখা আরম্ভ করেন। তিনি লিখেন : মুদ্দতেইঁ মসনবী তাখীর শোদ/মুহলতে বায়েস্ত তা খুন শির শোদ। (অর্থ : মসনবীর এ খণ্ড লিখতে দেরি হয়ে গেল। কেননা রক্ত দুধে পরিণত হতে সাময়িক বিরামের প্রয়োজন আছে।)  মসনবীর ছয়টি খণ্ড রয়েছে। ছয় খণ্ডেই তিনি প্রেমের জয়গান গেয়েছেন। এ গুলোতে বয়েতের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার এবং ছোট বড় কাহিনীর সংখ্যা ৪২১’র ওপর। মসনবী লিখতে মওলানা সাহেবের প্রায় ১৫ বছর সময় লাগে। সারা বিশ্বে মুসলমানরা তিনটি গ্রন্থের পেছনে শরীফ শব্দটি যোগ করেন। শরীফ শব্দের অর্থ মহান। এ তিনটি গ্রন্থ হল (১) কোরআন শরীফ (২) হাদীস শরীফ ও (৩) মসনবী শরীফ। 

১২৭৩ খৃষ্টব্দের ১৭ ডিসেম্বর রুমি কনিয়াতে পরলোক গমন করেন। তাঁর জানাজার সময় মুসলমানদের সঙ্গে বহু খৃষ্টান, ইহুদী ও অগ্নি উপাসক উপস্থিত ছিলেন। তারা সকলেই তাঁকে বন্ধু মনে করতেন। সার্বজনীন প্রেমই ছিল মওলানার মূলনীতি। তিনি বলতেন, ‘তিয়াত্তর ফেরকার প্রত্যেকটিকেই আমি আমার সুহৃদ মনে করি।’

মওলানা রুমীর রচনাবলীর মধ্যে মসনবী শরীফই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। প্রফেসর ডক্টর আর. এ. নিকলসনের মতে ‘মওলানা জালালুদ্দিন রুমি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুফী কবি’। সুফীবাদ বিশেষজ্ঞ এ.জে আরবেরি ও একই মত পোষণ করেন। মাওলানার মসনবী শরীফকে একটি মহাসমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়, চার শতাধিক- ছোট বড় নীতি কাহিনী মারফত তিনি তাঁর ভাব প্রকাশ করেছেন। পৃথিবীতে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভাষা নেই যেটাতে পুরা মসনবী শরীফ বা তার অংশ বিশেষ অনুদিত হয়নি। এই মহাগ্রন্থ ইংরেজী সাহিত্য, ফরাসী সাহিত্য, জার্মান সাহিত্য, উর্দুসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যকে যুগ যুগ ধরে নানাভাবে প্রভাবান্বিত করে আসছে।

উর্দু সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ডক্টর ইকবাল স্বীকার করেছেন যে তিনি মওলানা জালালুদ্দীন রুমীর ভাবশিষ্য ছিলেন। বাংলার বৈষ্ণব কবিগণ, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং আধুনিক কবিদের অনেকেই তাঁর ভাবধারা অবলম্বন করে কবিতা লিখেছেন। বৈষ্ণব কবি চণ্ডী দাসের প্রসিদ্ধ চরণ ‘শুনহ মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’, ‘বিদ্যাপতির (১৩৫২-১৪৪৮) ’কত চতুরানন মরি মরি যাওত, নতুয়া আদি অবসানা, তোহে জনমি পুন: তোহে সমাওত সাগর লহরী সমানা।’ মওলানা রুমীর ওপর হার্ভার্ড (Harvard) বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্রফেসর জার্মান মহিলা এ্যানী শিমেল সাক্ষ্য দিচ্ছেন  :Shortly before 1500, even Hindu Brahmins in Bengal recited the Mathnavi (I am Wind, you are Fire, by Anne Maries Schimmel) অর্থ : পঞ্চদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত এমনকি বাংলাদেশের হিন্দু ব্রাহ্মণরাও উচ্চ কণ্ঠে মসনবী আবৃত্তি করতেন।

রবীন্দ্রনাথের ‘সোনারতরী, নামক কাব্য গ্রন্থের ‘দুই পাখী’, ‘আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে, আমার প্রদীপ না জ্বালালে দেয় না কিছু আলো’ নজরুল ইসলামের ‘মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই।’ আধুনিক কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’, ইত্যাদি হয়  মওলানার মসনবীর সোজাসুজি অনুবাদ অথবা তাঁর ভাব ধারার ঋণে ঋণী, ‘দিওয়ানে শমছ তবরেজী’ মৌলানার একখানি প্রসিদ্ধ গজল গন্থ। মসনবী শরীফ মহাসমুদ্র হলে তাঁর দিওয়ানে শমছ তবরেজী হবে ঐ মহাসমুদ্রের ঝড়। দিওয়ানে শমছ তবরেজীতে আড়াই হাজারের ওপর গজল রয়েছে। ও গুলোর মধ্যে বিধৃত হয়েছে মসনবী শরীফের মূলকথা ‘প্রেম’। বাংলার মরমী কবি লালন ফকির, হাসন রাজা, রমেশ শীল প্রভৃতি মওলানার মসনবী ও দিওয়ানে শমছ তবরেজীর ওপর নির্ভর করে অসংখ্য অমর গীত রচনা করে গেছেন। মওলানা দিওয়ানে শমছ তবরেজী মহাসমুদ্রের ঝড় হলেও ওটা হচ্ছে প্রেমের ঝড়-ওটাতে আছে প্রেমের উচ্ছ্বাস, ওটাতে ঝড়ের ধবংস লীলা সেই। রুমির ‘ফিহি মা-ফিহি’ ও একটি মূল্যবান গ্রন্থ। এটাতে একাত্তরটি নিবন্ধ রয়েছে। এগুলোর কিছু কিছুতে মসনবী শরীফে বর্ণিত কাহিনীও তুলে ধরা হয়েছে। 

[ সরকারের সাবেক সচিব, এন বি আরের সাবেক চেয়ারম্যান ]