জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাদ্য অন্যতম। তাই গত কয়েক দশকে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাষযোগ্য জমি সংরক্ষণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বনায়ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশ ব্যস্ত খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এমন এক প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হলো। করোনাভাইরাস মহামারী কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা ব্যাহত করেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টি করেছে। ফলে জীবিকা ও আয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্যও বেড়েছে। এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল থিম হলো—উন্নত উৎপাদন, উন্নত পুষ্টি, উন্নত পরিবেশ ও উন্নত জীবনযাত্রার জন্য আরো দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল ও টেকসই কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, যাতে কেউ পিছিয়ে না থাকে। আমাদের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাও এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন সবার জন্য পর্যাপ্ত সাশ্রয়ী, পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। 

বিশ্বায়নের চাপ, উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে অস্থিরতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সংকটকালে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের খাদ্য আমাদেরই উৎপাদন করতে হবে। দেশের মাটি, পানি, প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং নিজস্ব প্রচেষ্টার মাধ্যমেই তা করতে হবে। পরিবর্তিত জলবায়ুতে খাপ খাইয়ে আমাদের উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। একটি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য খাদ্যমূল্য নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। আবার সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর এ বিশুদ্ধ খাদ্যই যদি অখাদ্যে রূপান্তরিত হয়, তা গ্রহণের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এ খাদ্য যদি আমাদের জীবন-জীবিকার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা যে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির শিকার হব তা কিন্তু যুদ্ধ ও মহামারীর ভয়াবহতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কাজেই কালবিলম্ব না করে এমন পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

বাংলাদেশে সাংবিধানিক নিশ্চয়তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ মোতাবেক দেশের সব নাগরিককে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ১৯৯৮ সালে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিইএসসিআর) স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়নের অধিকার বাস্তবায়নে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার করেছে। চুক্তির ১১(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে, চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের ক্ষুধামুক্তির মৌলিক অধিকার স্বীকার করে স্বতন্ত্রভাবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লেখিত অনুচ্ছেদ ১৫ অনুসারে, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন, যাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অর্জন নিশ্চিত করা যায়—অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির সঙ্গে দেশের খাদ্য অধিকারের আদর্শগত মানদণ্ড চিহ্নিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানদণ্ডগুলো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্ধারণের প্রয়োজন, যাতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যনিরাপত্তার সার্বিক মান অর্জনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কী কী লক্ষ্য রয়েছে তা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। তবে মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে খাদ্য অনিরাপত্তা ও ঘাটতির কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ এর লক্ষ্য থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থান করছে। তাছাড়া খাদ্যনিরাপত্তার বর্তমান প্রস্তাব সমগ্র প্রক্রিয়াকে অবহেলা করে শুধু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের দিকে এককভাবে জোর দেয়। ফলে খাদ্যের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য ফলাফলগুলো কীভাবে বাস্তবায়নযোগ্য হবে তা অনেকটাই অনুল্লেখিত রয়ে যায়।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে এখন আর তেমন খাদ্য সংকট নেই। দেশের প্রায় সব ধরনের খাদ্যই উৎপাদন হচ্ছে। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু উৎপাদন পর্যায়ে উত্তম চর্চার অনুসরণের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। কেননা বাজারজাত প্রক্রিয়া ও বিক্রির সময়ও পণ্য নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে কৃষির উৎপাদনে সঠিক জ্ঞান, দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক কৃষি উপকরণের জোগান বাড়াতে হবে। কাজ করতে হবে বাজারজাত ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নতিতে। সব মিলিয়ে কাজ করতে হবে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষিবান্ধব নীতি ও পরিকল্পনা নিয়ে। সরকারের যুগোপযোগী নীতি ও পদক্ষেপে দেশ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ফল, সবজি উৎপাদন অনেক গুণ বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে উৎপাদিত মাছ এবং মাংস উৎপাদনে দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। এ সাফল্য ধরে রাখতে কৃষিকে লাভজনক খাতে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি।

পর্যাপ্ত খাদ্যের লভ্যতা নিশ্চিতকরণের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য হলেও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যথেষ্ট নয়। সবার জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দরিদ্র ও দুস্থ পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা ও সংগৃহীত খাদ্যের যথাযথ ব্যবহারে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। খাদ্যনীতির ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে সবসময় সব জনগণের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশে বিদ্যমান খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খাদ্যনীতি একটি বহুমাত্রিক বিষয়, যেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা খাদ্যনিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নিজ নিজ কর্মসূচি ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ লক্ষ্য হিসেবে একটি নির্ভরযোগ্য খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট থাকবে।

খাদ্যনিরাপত্তার সংজ্ঞানুযায়ী তখনই খাদ্যনিরাপত্তা বিরাজমান যখন সবার জন্য একটি কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম একটি উপাদান হলো জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যের লভ্যতা, যা প্রায়ই জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সমার্থক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। অন্য অপরিহার্য উপাদান হলো ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা। খাদ্যনিরাপত্তার তৃতীয় অপরিহার্য উপাদান হলো খাদ্যের জৈবিক ব্যবহার, যা অন্যান্য নিয়ামকের, যথা সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের উপস্থিতি এবং পরিবার বা সরকার কর্তৃক সমাজের দুস্থ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদানের সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের বিষয়টি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন নিয়ামকের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে যুগপত্ভাবে প্রতিটি নিয়ামকই যথেষ্ট গুরুত্ব পাওয়া আবশ্যক।

খাদ্যের অধিকার দুভাবে নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রথমত, খাদ্যপ্রাপ্তির বিষয়টিকে সহজতর করা। এবং দ্বিতীয়ত, জোগান দেয়া। রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে: এক. ব্যক্তির খাদ্য অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, দুই. প্রয়োজনীয় ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদের উৎসকে নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যের অধিকার যেহেতু একটি মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত, তাই এটি পূরণে রাষ্ট্রকে আর্থিক, বস্তুগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উপরন্তু, খাদ্যের ওপর ব্যক্তির অধিকার একটি বৈধ দাবি, যা পূরণে যথাযথ সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে উৎসাহিত করবে।