আইন অনুযায়ী দেশে সক্রিয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করতে হয়। আর লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে জমা দিতে হয়। এছাড়া রয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিল। এ প্রক্রিয়ায় তহবিলে জমা অর্থের পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকারও বেশি। শ্রমিকের কল্যাণে তহবিল গঠন করা হলেও কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা কোনো সুবিধাই পাননি। দুটো তহবিলের কোনোটিতেই বেকার বা কাজ হারানো সাধারণ শ্রমিকদের সহায়তার ব্যাপারে কোনো উল্লেখ নেই। ফলে মহামারীকালে তীব্র অর্থকষ্টে থাকাদের কোনো কাজে আসেনি এ তহবিল। দ্রুতই আইন পরিবর্তন বা নির্বাহী আদেশে বিষয়টির সুরাহা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেই সক্রিয় হতে হবে।

করোনার প্রাদুর্ভাবে শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের অর্থ কোনো কাজেই আসেনি আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের। বলা হচ্ছে তহবিলের অর্থ ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী অসুস্থতা ও দুর্ঘটনায় শ্রমিকের আবেদন এবং মৃত্যু হলে শ্রমিকের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে এ তহবিল থেকে সহায়তা দেয়া যায়। আর মৃত শ্রমিকের মেধাবী সন্তান থাকলে তার শিক্ষা খরচও এ তহবিল থেকে বহন করা যায়। তবে এখন যে পরিস্থিতি, তাতে শ্রমিককে সরাসরি সহায়তা করার কোনো বিধান নেই। এমনকি আইন অনুযায়ী এ তহবিল থেকে যে সাহায্য করা হয়, সেই অর্থও শ্রমিকের কাছে পৌঁছানো জটিল হয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের জন্য কিছু করতে হলে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে সহায়তা দেয়ার জন্য সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট আইনটিকে কীভাবে বিদ্যমান বাস্তবতায় শ্রমিকের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়, তার পথ খুঁজে বের করা অত্যাবশ্যক। আরো একটি বড় বিষয় হলো এ তহবিল গঠন করা হলেও এ বিষয়ে কোনো রকম প্রচার-প্রচারণা ও কার্যক্রম নেই। দেশের ৯০ শতাংশ শ্রমিক বা তাদের পরিবার এ তহবিল সম্পর্কে কিছুই জানে না। এমন অবস্থায় দেশের প্রত্যেক উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত এ তহবিলের কার্যক্রম বিস্তৃত এবং সহায়তার জন্য আবেদনের প্রক্রিয়া সহজ করা একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ফাউন্ডেশনের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তহবিলে জমা দেয়ার জন্য মুনাফার প্রতিশ্রুত অর্থ আদায়ে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে দেশের আনুষ্ঠানিক খাতের বেশির ভাগ শ্রমিকই যেখানে শ্রম আইনের সব সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে পান না বলে মনে করা হয়, সেখানে অনানুষ্ঠানিক শ্রম খাতগুলোর শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়টি কতটা উপেক্ষিত তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম গতিশীল করতে সরকারের মনোযোগ দেয়া খুবই প্রয়োজন।

করোনায় বিপর্যস্ত আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সহায়তার জন্য কল্যাণ তহবিল সদ্ব্যবহারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া এ মুহূর্তের অন্যতম প্রয়োজনীয় কাজ। তহবিল যদি দুর্যোগেই কাজে না লাগে, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা, সরকার তথা শ্রম মন্ত্রণালয় শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ব্যবহারে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। মহামারী কভিডের কারণে যুক্তরাজ্যের যেসব শ্রমিক কাজে যেতে পারছেন না, তাদের বেতনের ৮০ শতাংশ অর্থ দেশটির সরকার থেকে দেয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকারই জনগণের চাকরির সুরক্ষার লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা চাই, অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও শ্রমিকদের সরাসরি সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নিক। এক্ষেত্রে পড়ে থাকা শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের কীভাবে কার্যকর ব্যবহার করা যায়, তার পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের যে আইন ও বিধি আছে, তা অনুসরণ করে বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কভিডে চাকুরি হারানো বা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তহবিল থেকে সরাসরি শ্রমিকের হাতে অর্থ পৌঁছে দিতে গেলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সে কারণেই মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে পারেনি তহবিল দুটি। তাছাড়া করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শ্রমিককের সংখ্যা বিবেচনায় এ তহবিলের পরিমাণ খুবই কম। কভিডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে হলে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকার প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কাজটি করছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করছেন। তবে শ্রমিকদের সরাসরি সহায়তা দেয়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি, যা অন্য অনেক দেশে নেয়া হয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশে বেকারদের জন্য আলাদা ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে, যা বাংলাদেশে নেই। করোনায় শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের অর্থ ব্যবহার নিয়ে জানতে চেয়েছে সংসদীয় কমিটি। প্রত্যাশা থাকবে, তথ্য পাওয়ার পর তারা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার একটি উদ্যোগও নেবে। তহবিলের স্ফীতি কোনো সমাধান নয়, শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে এটি ব্যবহার করতে পারাই লক্ষ্য হওয়া দরকার।  

প্রথম সমস্যা আইনে। শ্রমিক কল্যাণের যে উদ্দেশ্য থেকে আইনটি করা হয়েছে, তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে ধারা সংশোধনে বেশি সময় দরকার হলে নির্বাহী আদেশে বিষয়টির সুরাহা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় সমস্যাটি নৈতিক ও প্রশাসনিক। শ্রমিক কল্যাণের জন্য নির্মিত স্বশাসিত বোর্ডের যদি বাস্তবিক স্বশাসনের ক্ষমতা থাকত, তাহলে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিত। বাস্তব এই যে এ বোর্ডগুলো রাজনৈতিক প্রভাবে চলে। জনাকয়েক বিরোধী মনোভাবাপন্ন বা নিরপেক্ষ সদস্যের পরামর্শ গ্রাহ্যই করা হয় না। শ্রমিকদের জন্য পুরো জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর কথা বলছেন অনেকে। মাঝে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার অধীনে এমন একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও তার ফল আশাপ্রদ নয়। এক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগটি নিতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আইনে নেই বলে কভিডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কিছু না করা কাম্য নয়। এটি দায় এড়ানোর একটি প্রক্রিয়া হিসেবেই বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক দুর্যোগ বা সংকটের কারণে শ্রমিকরা বেকার হলে সে সংকট থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে এ তহবিল ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা। এ তহবিল থেকে বেকারকালীন অথবা ছাঁটাইয়ের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তা প্রদানের পদক্ষেপ নিতে হবে।