আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাহাজ ভাঙা শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অনেক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। সর্বসাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, নিবন্ধিত ইয়ার্ডের সংখ্যা ১৫০-এর বেশি হলেও বর্তমানে সক্রিয় আছে ৬০-৬৫টি। এসব ইয়ার্ড দেশের ইস্পাতের সিংহভাগ চাহিদার জোগানদাতা। তবে দুঃখজনকভাবে ইয়ার্ডগুলো চলছে সনাতনী পদ্ধতিতে। উপেক্ষিত থাকছে পরিবেশগত ঝুঁকি। ফলে শিল্পটির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ দূষণের মাত্রাও ঊর্ধ্বমুখী। পরিবেশবাদীরা এ নিয়ে নানা সময়ে সোচ্চার হলেও পরিবেশ দূষণ কমানো যায়নি। এর মধ্যে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তথ্য মিলছে, জাহাজ শিল্প এলাকা ও এর পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিতে নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব ক্ষতিকর ধাতু জমিতে উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে। তাতে বাড়ছে ক্যান্সারসহ নানা দীর্ঘস্থায়ী রোগব্যাধি। এটা উদ্বেগজনক বৈকি। অনিয়ন্ত্রিত জাহাজ ভাঙা শিল্প পরিবেশের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। কাজেই পরিবেশসম্মতভাবে ইয়ার্ডগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে পরিবেশ ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা কাম্য।

পরিবেশ সুরক্ষার জায়গা থেকেও শিল্পটির সমান্তরাল উন্নতি বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। অথচ গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে ইয়ার্ডগুলো। এক্ষেত্রে বহিঃস্থ ও অভ্যন্তরীণ দুটো ফ্যাক্টর রয়েছে। আমাদের ইয়ার্ডগুলোয় যেসব জাহাজ আসছে, সেগুলো পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন। সেসব দেশে কঠোর আইনের কারণে জাহাজগুলো সেখানে ভাঙতে পারে না। সেজন্য সেগুলো পাঠিয়ে দেয় আমাদের দেশে। অনেকটা সময় ইয়ার্ডে উন্মুক্তভাবে পড়ে থাকছে স্ক্র্যাপ জাহাজগুলো। সেখানে থাকা বর্জ্যগুলো সহজেই মিশছে সংলগ্ন এলাকার মাটি-পানিতে। এটা বহিঃস্থ ফ্যাক্টর। আর অভ্যন্তরীণ ফ্যাক্টর হলো, ইয়ার্ডে আনার পর কর্তৃপক্ষ জাহাজগুলো দায়সারাভাবে রেখে দেয়। পরিবেশসম্মত উপায়ে সেগুলোয় থাকা গ্যাস-তেলের উপাদানমিশ্রিত বর্জ্য পরিষ্কার হয় না। আবার জাহাজগুলো কাটার পর উন্মুক্তভাবে সেগুলো স্তূপাকারে ফেলে রাখা হয়। ফলে সেখানকার বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু গিয়ে মিশছে সংলগ্ন কৃষিজমিতে এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য প্রাণঘাতী হচ্ছে। বলা চলে, বিদেশী কোম্পানিগুলোর অদায়িত্বশীলতা এবং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা পরিবেশ দূষণের জন্য মূলত দায়ী।

শুধু কৃষিজমি বা পরিবেশের ক্ষতি নয়, জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যুও একটা নিয়মিত ঘটনা। জাহাজ কাটার আগে বর্জ্য, বিষাক্ত গ্যাস ও বিস্ফোরকমুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। এ কারণে প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করছেন। ভাঙা থেকে প্রক্রিয়াকরণ সবখানে ন্যূনতম নিরাপত্তা ছাড়াই কাজ করছেন তারা। ফলে জাহাজ ভাঙা শিল্পে নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে দুর্ঘটনা, মৃত্যু হচ্ছে শ্রমিকের। এ শিল্পে এটিও একটা বড় শঙ্কার জায়গা বৈকি।

অনেক দেশেই জাহাজ ভাঙা শিল্প বিদ্যমান। এসবের মধ্যে আমাদের প্রধান প্রতিযোগী হলো ভারত, তুরস্ক ও চীন। দেশগুলো আলোচ্য শিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং ইয়ার্ডগুলোকে ঢেলে সাজাতে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৯ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশনের আলোকে উল্লিখিত তিনটি দেশ এরই মধ্যে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করেছে। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। ফলে স্ক্র্যাপ জাহাজ রফতানিকারক দেশগুলো ধীরে ধীরে সেসব দেশের দিকে ঝুঁকছে। পরিবেশ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে উন্নতি করতে না পারলে আমরা এ খাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাব। সুতরাং দেশগুলোর নীতি ও গৃহীত উদ্যোগ আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও পরিবেশ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের তরফে নীতিমালা করা হয়েছে। অথচ শিল্প মালিকরা তা মেনে চলেন না। শুধু আইন বা নীতিমালা তৈরি নয়, সেটা মানতে বাধ্য করাও সরকারের দায়িত্ব। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করে। অনিয়ম-অসংগতি পেলে তাত্ক্ষণিক কিছু আর্থিক জরিমানামূলক ব্যবস্থা নেয়। এরপর তত্পরতা থেমে যায়। কিন্তু দায়ী ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেয় না। ফলে কর্মপরিবেশ থেকে শুরু করে পরিবেশ ইস্যুতে উন্নতি হচ্ছে না; বরং কিছু ক্ষেত্রে আরো অবনমন ঘটছে। সরকার বেশ আগেই হংকং কনভেনশনের আলোকে সব শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডকে গ্রিন শিপ ইয়ার্ডে রূপান্তরের নির্দেশনা দিয়েছে। এজন্য ২০১৮ সালে আইনও প্রণয়ন করা হয়। দুঃখজনকভাবে এখন পর্যন্ত কেবল একটি গ্রুপের শিপইয়ার্ডই নিজেদের গ্রিন শিপ ইয়ার্ডে রূপান্তর করেছে। আরো কয়েকটি শিপ ইয়ার্ডও রূপান্তর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগই চলছে সনাতনী কায়দায়। ফলে কমছে না পরিবেশ দূষণ। এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা কাম্য। প্রথমত, নিশ্চিত করতে হবে বর্জ্য পরিশোধন ছাড়া ইউরোপীয় জাহাজগুলো তারা গ্রহণ করবে না। ‘পলিটিউসার্স পে  প্রিন্সিপল’ নীতি অনুসারে বিদেশী শিপিং কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আবার ইয়ার্ডে জাহাজ আনার পর সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ভাঙা, প্রক্রিয়াকরণ সবখানে আধুনিক ও পরিবেশসম্মত অ্যাপ্রোচগুলো গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি সব ইয়ার্ডকে ধীরে ধীরে গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তর ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে যেমন উদ্যোগী হতে হবে, তেমনি পরিবেশ অধিদপ্তর ও শিল্প মন্ত্রণালয়েরও নজরদারি বাড়ানো চাই। 

ইস্পাত শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ হিসেবে জাহাজ ভাঙা শিল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় অনেক দেশ এ শিল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে তাইওয়ান, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া প্রভৃতি দেশ। আমাদের শিল্প খাতে বৈচিত্র্যের ঘাটতির বাস্তবতা থেকে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে এখনই সরে আসা কঠিন বৈকি। কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও পরিবেশসম্মতভাবে এ শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হতে হবে আমাদের প্রাধিকার। সরকার, শিল্পোদ্যোক্তা সবাই এ ব্যাপারে আরো সক্রিয় হবে বলে প্রত্যাশা।