দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তরুণ জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের উচ্চশিক্ষার চাহিদা মেটাচ্ছে। বর্তমানে এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৮-এ। ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হওয়ার কথা একটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) গঠনের মাধ্যমে। অন্যদিকে সোসাইটিজ অ্যাক্টে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিওটি রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ (আরজেএসসি) নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু প্রায় অর্ধেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টই এখনো আরজেএসসির নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে বলে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ট্রাস্টি বোর্ডের বৈধতাই প্রশ্নবিধ হয়ে পড়ছে। তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। এক্ষেত্রে যেসব আইনি সীমাবদ্ধতা ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা রয়েছে, তার সমাধানও করা প্রয়োজন।
নব্বইয়ের দশকেই মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা। ওই সময় প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন দেয়া হতো ফাউন্ডেশনের অধীনে। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ট্রাস্ট গঠনের কথা বলা হয়। এরপর শীর্ষস্থানীয় কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ট্রাস্ট গঠন করে সেটির আরজেএসসির নিবন্ধন সম্পন্ন করে। তবে এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টই নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। নিবন্ধনের বাইরে থাকায় সেসব ট্রাস্টির কার্যক্রমের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বা বিরোধ সুষ্ঠুভাবে নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, পারস্পরিক দ্বন্দ্বের জেরে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মূল উদ্যোক্তা দাবি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে একই নামে আলাদা ক্যাম্পাসও খোলা হয়েছে। একই কারণে নানা অনিয়মেও জড়াচ্ছেন তারা। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে বিওটির কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার কথা উঠে এসেছে। এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কারো কারো বিরুদ্ধে অন্যায্য আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। কারো কারো বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির অর্থে গাড়ি বিলাসের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সব মিলিয়ে বিওটির নানা অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাবমূর্তি আজ প্রশ্নের সম্মুখীন।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, মালয়েশিয়াসহ প্রতিটি দেশেই সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেগুলোর মধ্যে হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ডের মতো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আইনি কাঠামোর অধীনে সুনির্দিষ্ট কার্যালয় থেকে নিবন্ধনের মাধ্যমে সেগুলো পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতে তিন পদ্ধতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যায়। এক. বিদ্যমান সোসাইটি অ্যাক্টের আওতায়, দুই. বিদ্যমান ট্রাস্টি আইনের আওতায়, তিন. কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন আইনের আওতায়। ভারতের মতো আরো কিছু দেশেও কোম্পানি বা সংস্থার আওতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালিত হচ্ছে। তবে অনুমোদনের প্রক্রিয়া যা-ই হোক না কেন কোনো দেশেই বিধিসম্মত নিবন্ধনের বাইরে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা এর পর্ষদের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশেই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ব্যতীত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সম্ভব নয়। আর ট্রাস্টি বোর্ড থাকলেই আরজেএসসির নিবন্ধন নিতে হবে।
বলা হচ্ছে, আরজেএসসির নিবন্ধন না থাকা বিওটির কোনো প্রস্তাব বা আবেদন আমলে না নেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের প্যানেল প্রস্তাবসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আবেদন যে পাঠাচ্ছে, তার সঙ্গে আরজেএসসির নিবন্ধনের সনদও চাইছে সংস্থাটি। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড সেটি জমা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের কোনো প্রস্তাবই আমলে নেয়া হচ্ছে না বলে খবর মিলছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরও কিছু অভিযোগ রয়েছে। বিওটির সদস্য সংখ্যা নিয়ে জটিলতা, নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ, ঘুষ প্রদানের মতো বিষয়ও আলোচনায় আসছে। বিষয়গুলোর সুরাহা করা প্রয়োজন।
ইউজিসির আশা, এ ধরনের নিবৃত্তিমূলক পদক্ষেপে কাজ হবে। অতীত অভিজ্ঞতা অবশ্য এক্ষেত্রে খুব একটা সুখকর নয়। এর আগেও অনুমোদনহীন কোর্স ও ক্যাম্পাস পরিচালনা, আসনের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, আর্থিক নিয়ম বন্ধে দফায় দফায় নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি। সেসব অনিয়ম বন্ধ হয়নি। তাই ট্রাস্টি বোর্ডের নিবন্ধন নিশ্চিতের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপই কাম্য। এখন পর্যন্ত অনেক বিওটি নিবন্ধনের বাইরে থাকার পেছনে নিবন্ধন প্রক্রিয়াও অনেকাংশে দায়ী। আরজেএসসির নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় পদে পদে দীর্ঘসূত্রতা বিদ্যমান। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অনেক দিন আগে আবেদন করেও এখনো নিবন্ধিত হতে পারেনি। আছে ঘুষের লেনদেনও। নিবন্ধনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বড় অংকের ঘুষ চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রক্রিয়াগত অন্তর্নিহিত ত্রুটি বা দুর্বলতার কারণেও কিছু বিওটি নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। কাজেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরো সহজ ও ঝামেলাহীন করতে হবে। এটিও ঠিক যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এখনো নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেনি। তাদের নিবন্ধনের জন্য ইউজিসি একটা সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে। এর মধ্যে বিওটির নিবন্ধন সম্পন্ন না করলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিল করা যেতে পারে।
বিওটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক কাঠামো থেকে শুরু করে সংবিধি, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা ও বাজেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তেরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় এ পর্ষদ। সেদিক থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুশাসন নিশ্চিত ও সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে এর ওপর। তাই এ পর্ষদ ও পদগুলোর কার্যক্রমও আইনগতভাবে গঠন, নিয়োগ ও পরিচালিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এর অন্যথা কোনোভাবে কাম্য নয়। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ট্রাস্টই নিবন্ধনের আওতায় আসবে, এটিই প্রত্যাশা।










