ড. রায়হানা ফেরদৌস বর্তমানে স্কটল্যান্ডের গ্ল্যাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন ইংল্যান্ডের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ইংল্যান্ডের শেফার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে হিউম্যান জিওগ্রাফিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণা কাজের আগ্রহের বিষয় প্রধানত জ্বালানিবিষয়ক নতুন ও সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। প্রায় এক দশক ধরে তিনি এশিয়া ও আফ্রিকার বেশকিছু উন্নয়নশীল দেশসহ বাংলাদেশের জ্বালানিসম্পৃক্ত বিষয়, যেমন বায়োগ্যাস, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, ভূতাপীয় শক্তিসহ বিভিন্ন উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি তিনটি গবেষণা কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত; যেখানে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মালাউয়ি ও ইথিওপিয়ায় সবুজ জ্বালানি নিয়ে কাজ করছেন। 

সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় জ্বালানিবিষয়ক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রুহিনা ফেরদৌস

প্রায় এক দশক ধরে আপনি জ্বালানি নিয়ে কাজ করছেন? আপনার কাজ সম্পর্কে জানতে চাই?

আমি মূলত একজন হিউম্যান জিওগ্রাফার। জ্বালানি, টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তি, স্বল্প কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানির পরিবৃত্তি (লো কার্বন এনার্জি ট্রান্সজিশন), নৈতিক অংশীদারিত্ব, বর্জ্য অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ই আমার গবেষণা কাজে প্রাধান্য পায়। যদিও আমার গবেষণার প্রশিক্ষণ শুরু হয় নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে, পরবর্তী সময়ে জিওগ্রাফিতে পড়তে গিয়ে আমি আন্তঃশাস্ত্রীয় গবেষক হিসেবে কাজ করা শুরু করি। আমি যখন বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ছিলাম তখন সমাজবিজ্ঞান নিয়ে কাজ কিংবা গবেষণার এতটা সুযোগ ছিল না। স্নাতক শেষ করার পরপরই ইউকের রিসার্চ কাউন্সিলের ফান্ডিংয়ের একটি প্রজেক্টে আমার প্রথম কাজ করার সুযোগ হয়। প্রজেক্টটি ছিল বর্জ্য অর্থনীতি ও বস্তুর রূপান্তরের (ম্যাটেরিয়াল ট্রান্সমিশন) ওপর। বস্তুকেন্দ্রিক কিংবা সাসটেইনেবিলিটি—এ ধরনের কাজ সে সময় বাংলাদেশে খুব একটা হতো না, বলতে গেলে বেশ অপরিচিতই ছিল। কাজটি করতে গিয়ে খুব ভিন্ন বিষয়ের ওপর গবেষণার সুযোগ পাই, যেটা আমাকে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন বিষয়ের ওপর কাজ করার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। এরপর ইউকেতে পড়তে এসে নতুন নতুন এবং সাম্প্রতিক আলোচিত বিষয় নিয়ে পড়ার এবং জানার সুযোগ হয়। এভাবেই বলা যায় উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি আমার আগ্রহের শুরু। টেকসই জ্বালানি, প্রযুক্তি, সার্কুলার অর্থনীতির প্রতি আমার আগ্রহ থেকে হিউম্যান জিওগ্রাফিতে স্বল্প কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানির ওপর পিএইচডি করার সিদ্ধান্ত নিই এবং গবেষণার বিষয় হিসেবে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের পরিবৃত্তিকে (সোলার ট্রান্সজিশন) বেছে নিই। গবেষণায় আমি দেখার চেষ্টা করি একই দেশের স্থানভেদে (শহর ও গ্রামে) সৌরবিদ্যুতের রূপান্তর কেমন এবং এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। বর্তমানে আমি শক্তি ও জ্বালানি রূপান্তর এবং এর রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে এশিয়া ও আফ্রিকায় গবেষণা করছি। 

এনার্জি সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনা থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়গুলোয় আমরা প্রকৌশলী বা ইঞ্জিনিয়ারদের দেখতে পাই। সেক্ষেত্রে একজন সমাজবিজ্ঞানী হয়ে আপনি এ বিষয়ে কাজ করছেন।

প্রচলিত ধারণা রয়েছে নৃবিজ্ঞানী বা সমাজবিজ্ঞানীরা কাজ করবেন সমাজ, সমাজের মানুষ বা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় বা তাদের সামাজিক জীবন নিয়ে। জ্বালানি, প্রযুক্তির মতো বিষয় নিয়ে যে সমাজবিজ্ঞানীরা কাজ করতে পারেন, এ-বিষয়ক ধারণা আমাদের দেশে তেমন প্রচলিত নয়। এটা যে কেবল বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা তা কিন্তু নয়, বৈশ্বিক গত্বাঁধা চিন্তাভাবনা। জ্বালানি ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোয় একমাত্র প্রকৌশলী কিংবা অ্যাপ্লাইড ও ন্যাচারাল সায়েন্টিস্টরাই কাজ করবেন এবং তারাই এ বিষয়ের নীতিনির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন—এমনটি ভাবা হয়। আমাদের সমাজ ও চিন্তাভাবনায় কিছু বিষয়, যেমন প্রকৌশলবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন সমাজবিজ্ঞান। এখানে এক ধরনের শাস্ত্রীয় উচ্চম্মন্যতা (ডিসিপ্লিনারি শৌভিনিজম) কাজ করে। সেটা জ্বালানি ও প্রযুক্তির মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে অনেকটা প্রকট, আমরা ধরেই নিই সমাজবিজ্ঞান এক্ষেত্রে একটি প্রান্তিক বিষয়। তবে আমাদের একটা বিষয় কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা যতই নতুন নতুন উদ্ভাবন করি না কেন, এর ব্যবহারকারী কিন্তু সমাজের মানুষ। তাই আমাদের ভাবতে হবে যেকোনো নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি একটি নির্দিষ্ট সমাজ ও সংস্কৃতির মানুষ এবং তার  সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মানানসই কিনা। একইভাবে জ্বালানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ব্যবহার তাদের সাংস্কৃতিক ও প্রচলিত জীবনযাপনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কিনা, এ বিষয়গুলো জানাটা খুবই জরুরি। তা না হলে দেখা যাবে পরীক্ষাগারে শতভাগ সফল, উন্নত ও কার্যকর প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে গিয়ে আশানুরূপভাবে কাজ করবে না, অসফল প্রচেষ্টায় পরিণত হবে। এ কারণেই জ্বালানি ও প্রযুক্তির সামাজিক দিকগুলো বোঝার ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমা দেশগুলোয় সমাজবিজ্ঞানীরা জ্বালানির বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। খুব সম্প্রতি সমাজবিজ্ঞানীদের এক্ষেত্রে অবদানের মাত্রাটা বেশ জোরালো হয়েছে। আমি যদি শুধু যুক্তরাজ্যের কথা বলি, দুই থেকে তিন দশক ধরে সমাজবিজ্ঞানীরা জ্বালানি নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করছেন এবং বিশেষায়িত প্রখ্যাত সব জার্নালে তা প্রকাশ করছেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজ নিয়ে যারা কাজ করছেন, তারা এটা কীভাবে সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখা, জানা ও বোঝা যায় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সামাজিক দিক নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানীদের ভূমিকা নিয়ে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি করতে পেরেছেন। আগেই বলেছি, জ্বালানি শক্তির যে সামাজিক দিক রয়েছে, আমরা তা কোনোভাবেই বাদ দিতে পারি না। বাংলাদেশেও এ-বিষয়ক ধারণা এবং সচেতনতা খুব সীমিত। তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আছেন, তাদের এ বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হবে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে নীতি প্রণয়ন করতে হবে। 

বাংলাদেশে রিনিউয়েবেল এনার্জির সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কী ধরনের এনার্জির দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মনে করেন?

শুধু বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিকভাবেই জ্বালানির মজুদ ফুরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ একক জ্বালানিনির্ভর একটি দেশ, গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল আমরা। গ্যাসের মজুদ কমে আসার বিষয়টি আমরা জানি এবং সমস্যাটি মোকাবেলার জন্য কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ঢাকার নতুন নির্মিত ভবনগুলোয় বেশ কিছুদিন গ্যাসের নতুন সংযোগ দেয়া বিরত রাখা হয়েছিল। জ্বালানি এমন একটি বিষয়, যা মানুষের দৈনন্দিন কাজের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি দেশের উন্নয়নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে এটি সম্পর্কিত। তাই আমাদের বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবতে হবে। বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানির যথেষ্ট সম্ভবনাও রয়েছে। এক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হতে হবে। যেমন বায়োগ্যাস, সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ শক্তি, বায়ু ও স্রোত বিদ্যুৎ। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ভূপ্রাকৃতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানের জন্য এগুলোর ব্যবহারের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে বছরের প্রায় ৩০০ দিনই ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা টানা সূর্যের আলো থাকে, যা সৌরশক্তি উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। জ্বালানির এ সম্ভাবনাগুলোকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি তা বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। সৌরশক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিন্তু বিশ্বের নেতৃত্বশীল অবস্থানে রয়েছে। এরই মধ্যে ইডকলের সোলার হোম সিস্টেম প্রজেক্টের মাধ্যমে ৪০ লাখ সৌর হোমসিস্টেম স্থাপিত হয়েছে, যা থেকে বাংলাদেশের ১৩ লাখেরও বেশি জনগণ সুবিধা ভোগ করছে। এছাড়া সীমিতভাবে বায়ু ও জলবিদ্যুৎ শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎও ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বায়ুশক্তির বেশির ভাগই উপকূলবর্তী (অনশোর উইন্ড এনার্জি)। এই বিদ্যমান বায়ুশক্তির পাশাপাশি সমুদ্রমুখী বায়ুশক্তিকেও (অফশোর উইন্ড এনার্জি) আমাদের কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের এখন ভাবতে হবে কীভাবে আমরা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার আরো বাড়াতে পারি। এক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা জরুরি, তা নিয়েও কিন্তু আমাদের আলাপ-আলোচনা ও বোঝাপড়ার দরকার আছে। যদিও এরই মধ্যে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিবান্ধব বেশকিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যেমন ২০৩০ সালের মধ্যে প্রয়োজনীয় মোট জ্বালানির ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আমাদের রয়েছে। নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সমন্বয়ের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ফল থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে হলে আমাদের গবেষণানির্ভর বিভিন্ন সেক্টরের মানুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। একমুখী গবেষণা না করে বিভিন্ন সেক্টর ও বহুমুখী ডিসিপ্লিনের সঙ্গে সমন্বিত পদ্ধতিতে কাজ করার মাধ্যমে আমরা এ সম্ভাবনাটাকে কাজে লাগাতে পারব বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। 

কী ধরনের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে? 

সমন্বয়ের অভাব বলতে হলে আমি বেশকিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে চাই। প্রথমত, সমন্বয়ের অভাব যে শুধু জ্বালানি খাতে তা নয়, অন্যান্য খাতেও তা দেখা যায়। দেখা গেছে রাষ্ট্রের এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু একটি সেক্টর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না, বিভিন্ন সেক্টর এর সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত থাকে। যেমন বর্তমানে আমি ইয়ুকের রিসার্চ কাউন্সিলের আনুদানে বাংলাদেশ ও ভারতে সাগরমুখী বায়ুশক্তির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছি। কাজটি করতে গিয়ে জানলাম বাংলাদেশে সাগরমুখী বায়ুশক্তির সঙ্গে কমপক্ষে ১৭টা সেক্টর জড়িত। কাজটি করতে গেলে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কারা এই সাগরমুখী বায়ুশক্তির মূল নীতিনির্ধারক—এ বিষয়গুলো বেশ অস্পষ্ট। দ্বিতীয়ত, আমাদের নীতিনির্ধারণ আর একাডেমিক গবেষণা এ দুই সেক্টরের যোগাযোগ ও সমন্বয় নেই বললেই চলে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল ও সম্ভাবনা নিয়ে গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, নীতি নির্ধারণ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক পরিকল্পনায় বা প্রকল্পে গবেষণানির্ভর নীতি গ্রহণ করা হয় না। আবার গবেষণানির্ভর নীতি গ্রহণ করা হলেও সেখানে স্থানীয় জনগণের কণ্ঠস্বর উঠে আসে না, পুরোপুরি উহ্য থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বেশির ভাগ প্রকল্পই ‘টপ ডাউন অ্যাপ্রোচ’-এ হয়ে থাকে। তাই আমাদের তৃণমূলের ধ্যান-ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে ‘বটম আপ অ্যাপ্রোচ’ ও সব সেক্টরকে অন্তর্ভুক্তিসহ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। 

বিভিন্ন দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থাপনা কী বা তারা কীভাবে পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব সামলাচ্ছে?

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি সহজলভ্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছি আমরা। এখানে সবার দ্বারে দ্বারে টেকসই জ্বালানি পৌঁছানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সেজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবা হচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর সূত্র ধরেই সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ শক্তিসহ বিভিন্ন নতুন প্রযুক্তি আসছে। সবার জন্য জ্বালানি সরবরাহের জন্য এগুলো দারুণ উদ্যোগ। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি আশঙ্কাপূর্ণ বা উদ্বেগের তা হলো, এসব জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। এক্ষেত্রে আমি একটি উদাহরণ হিসেবে সৌরশক্তির কথা বলতে চাই। উনিশ শতকের শেষ থেকে বা বিশ শতকের শুরু থেকে পৃথিবীর অনেক দেশেই সৌরশক্তির ব্যবহার শুরু হয়। যে দেশগুলোয় সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়নি, বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সৌরশক্তির ব্যবহার করে তাদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। দাতানির্ভর প্রকল্প, ঋণ প্রকল্প কিংবা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বাজার তৈরি থেকে শুরু করে আনুপাতিক হারে এর ব্যবহার বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাপী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি এসব জ্বালানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বর্জ্যও তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রিনিউয়েবল এনার্জি সংস্থা এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে এ বিষয় নিয়ে তাদের যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির মতে, ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী ফটোভোলটাইক সৌর বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ৪৩ হাজার থেকে আড়াই লাখ টন, যা শুধু সৌরশক্তি ব্যবহারের কারণে তৈরি হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ বা হোমসিস্টেম মানে শুধু সৌর প্যানেল নয়, এখানে লিথিয়াম ব্যাটারিসহ ছোট ছোট অনেক ধরনের ইলেকট্রনিকস রয়েছে, যা থেকেও এক ধরনের বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। কারণ প্রতিটি ইলেকট্রনিকস সরঞ্জামের একটা মেয়াদ থাকে। সোলার প্যানেলের মেয়াদ ২৫ বছর। কিন্তু অনেক সময় গুণমান নিশ্চিত করা হয় না বলে সস্তা উপকরণ ব্যবহারের কারণে মাত্র ১০ বছরেই তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে ওঠে। ওই প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ বর্জ্যের পরিমাণ কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭৮ মিলিয়ন টন হবে। আমি এখানে শুধু সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট বর্জ্যের উদাহরণ দিচ্ছি। ওই প্রতিবেদনে অন্যান্য সবুজ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষতিকর দিকগুলোর বৈশ্বিক কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন প্রযুক্তির পুনর্নবায়নে জোর দিতে হবে, সেই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে বিভিন্ন এনার্জি অ্যান্ড প্রযুক্তির পুনর্ব্যবহারে। এটা যদি না করি তাহলে দেখা যাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসংশ্লিষ্ট বর্জ্যগুলো রিসাইকেলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠবে। 

এক্ষেত্রে আমি জার্মানির উদাহরণ দিতে পারি, কারণ দেশটি শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর। সমস্যা উপলব্ধি করে তারা বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের মতে, কেবল রিসাইকিলিং এককভাবে এ এনার্জি ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান করবে না। তাই রিসাইকেলিংয়ের পাশাপাশি সৌর ডিভাইসের মান আরো টেকসই করার ওপর জোর দিতে হবে। একইভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমাদের সৌর ডিভাইসগুলো কীভাবে টেকসই করা যায়, তার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত লিংকেজ শিল্প তৈরি করতে হবে, যাতে পণ্যের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা খানিকটা মেরামত করে আমরা তা পুনরায় ব্যবহার করতে পারি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে পুনর্নবায়ন ও পুনর্ব্যবহারের প্রতি জোর দিতে হবে। ২০৩০-এর মধ্যে সবার জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিতের লক্ষ্যমাত্রা আমাদের রয়েছে, যা খুবই চমৎকার বিষয়। তবে পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও ভাবতে হবে। আমরা যদি লিথিয়াম ব্যাটারিগুলো যথাযথভাবে রিসাইকেলিং না করে নদীতে ফেলে দিই, তখন পানিদূষণ বেড়ে যাবে; যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর। উন্নত দেশগুলো এখানে এক ধরনের সমন্বিত নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কীভাবে পণ্যগুলো নকশা করলে তা পুনর্ব্যবহার করা যায়, তারা সেসব বিষয়ের প্রতি জোর দিচ্ছে। 

এনার্জি সম্পর্কিত বিষয়ে নারীদের অংশগ্রহণ কম দেখা যায় কেন?

শুধু বাংলাদেশে নয়, বৈশ্বিকভাবেও এ সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। এক ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে, জ্বালানি নিয়ে তারাই কাজ করবে, যাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ রয়েছে এবং এ বিষয়ে কেবল পুরুষরাই পড়বে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে পুরুষদের বিষয় হিসেবে দেখতে থাকব ততক্ষণ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ উপেক্ষিত থাকবে। শুধু জ্বালানি ক্ষেত্রে নয়, এ ধরনের পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতার কারণে শুরু থেকেই বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশে একটা দক্ষ কর্মক্ষম ও বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ উপেক্ষিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্যমান। এ ধরনের জেন্ডার বায়াস মনমানসিকতার কারণে এনার্জি-বিষয়ক কাজেও সমাজের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যাচ্ছে। তাই স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জ্বালানি ও প্রযুক্তি পাঠে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের যে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা দরকার, তা তখন আসবে যখন শৈশব থেকে আমরা এর পরিচর্যা করব। শুধু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নয়, জ্বালানি ও প্রযুক্তি ব্যবহার ও চর্চায় লিঙ্গীয় সমতা বিধান করা যাবে। 

সাধারণত এনার্জি সম্পর্কিত বিষয়ে নারীদের অংশগ্রহণ কম দেখা যায়। বিশেষ করে আমি যদি  টকশো, বিশেষজ্ঞ বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কথা বলি।

শুধু বাংলাদেশে নয়, বৈশ্বিকভাবেও এ সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। এক ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে, জ্বালানি নিয়ে তারাই কাজ করবে, যাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কিত পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ রয়েছে এবং এ বিষয়ে কেবল পুরুষরাই পড়বে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে পুরুষদের বিষয় হিসেবে দেখতে থাকব ততক্ষণ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ উপেক্ষিত থাকবে। শুধু জ্বালানি ক্ষেত্রে নয়, এ ধরনের পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতার কারণে শুরু থেকেই বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশে একটা দক্ষ কর্মক্ষম ও বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ উপেক্ষিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্যমান। এ ধরনের জেন্ডার বায়াস মনমানসিকতার কারণে এনার্জি-বিষয়ক কাজেও সমাজের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যাচ্ছে। তাই স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জ্বালানি ও প্রযুক্তি পাঠে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের যে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা দরকার, তা তখন আসবে যখন শৈশব থেকে আমরা এর পরিচর্যা করব। আমরা যদি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের কাছে একটা লিঙ্গনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পারি তাহলেই শুধু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নয়, জ্বালানি ও প্রযুক্তি ব্যবহার ও চর্চায় লিঙ্গীয় সমতা বিধান করা যাবে। 

যদিও আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, এমনকি গত তিন চার বছরের বাজেটকে জেন্ডার রেসপনসিভ বাজেট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের জ্বালানি নীতিগুলো অনেকটাই জেন্ডার ব্লাইন্ড। অন্যদিকে সমাজে জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ একেবারেই জেন্ডার নিউট্রাল নয় বা লিঙ্গীয় অসমতা বিরাজমান। জ্বালানিবিষয়ক অনেক প্রকল্পই নারীর জ্বালানি ব্যবহারের  সুবিধা-অসুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন—এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে অনুদান পায়। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য আমাদের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে, তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়গুলোয় যারা রয়েছেন, তাদের অনেকেরই হয়তো জেন্ডার লেন্স দিয়ে দেখার প্রশিক্ষণ নেই। আমি বলছি না যে প্রকল্পগুলোয় নারীদের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমাদের তৃণমূল পর্যায় থেকেই জ্ঞান কাঠামো, ধ্যান-ধারণা এবং ব্যাবহারিক জীবনে নারী-পুরুষের বিভাজন এ ধারণা থেকে বের হয়ে এসে লিঙ্গীয় সমতার চর্চা করতে হবে। 

একজন এনার্জি সোস্যাল সায়েন্টিস্ট হিসেবে আপনি বর্তমানে কী ধরনের কাজ বা গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন?  

আমি বর্তমানে চারটি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত। প্রথমটি, বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন ও ভারতের গুজরাটে সুমদ্রমুখী বায়ুশক্তির ওপর এনার্জি ক্যাটালিস্ট প্রকল্পের অধীনে গবেষণা করছি, যেখানে সুমদ্রমুখী বায়ুশক্তির সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধতাগুলো অনুসন্ধান করছি। আমার কাজের একটি বড় অংশ হচ্ছে আমি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করি এবং স্থানীয় মানুষের কণ্ঠস্বরকে তুলে আনার চেষ্টা করি। দ্বিতীয়টি আফ্রিকার মালাউয়ি ও বাংলাদেশে টেকসই জ্বালানির ওপর। তৃতীয়টি, বাংলাদেশ ও নেপালে বায়োগ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আরো একটি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছি। এ গবেষণা চারটি দেশে করার কথা থাকলেও কভিড অতিমারীর কারণে কাজ চলছে দুটি দেশে। এছাড়া আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় অংশীদারিত্বের ধরন নিয়ে আফ্রিকার সাতটি দেশে আমার চতুর্থ গবেষণা কার্যক্রম চলমান।  

টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতে আমাদের করণীয় কী?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমি মনে করি, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। আমাদের গবেষণা করতে হবে আন্তঃশাস্ত্রীয় (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) জায়গা থেকে। বিভিন্ন বিভাগের মানুষ কাজ করবে, যেমন সমাজবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ভূতত্ত্ববিদ, যারা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। এদের সবার সমন্বিত অংশগ্রহণ থাকা জরুরি। বিশেষজ্ঞ নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি সমাজের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। কাউকে বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় উন্নয়ন বেশির ভাগ সময় অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটা হলো কিংবা জিডিপি কতটা বাড়ল। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু টেকসই উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। টেকসই উন্নয়নে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। এক. পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা যাবে না। দুই. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা যাবে না। তিন. সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা এত বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিই যে পরিবেশ, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিষয়গুলোকে অনেক বেশি এড়িয়ে যাই। অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে গিয়ে যদি আমরা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি করি, স্থানীয়দের সংস্কৃতিকে সম্মান না করি, তাহলে উন্নয়নটা টেকসই হবে না। যেমন ইথিওপিয়া ও কেনিয়ায় ভূতাপীয় শক্তি (জিওথার্মাল এনার্জি) প্রকল্পের ক্ষেত্রে হয়েছে। ভূতাপীয় শক্তিকে মনে করা হয় অনেক বেশি প্রকৃতিবান্ধব জ্বালানি। কারণ এর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ খুব সামান্য।

পৃথিবীর কিছু জায়গার মানুষ যেমন ভূতাপীয় শক্তিকে দেবতাদের আশীর্বাদ হিসেবে মনে করে। যেমন হাওয়াইয়ান আদিবাসীরা। তাদের ওখানে ভূতাপীয় শক্তি প্রকল্প হাতে নেয়া হলে স্থানীয়রা তাতে বাধা দেয়। অথচ ভূতাপীয় এ শক্তি ব্যবহার করে একদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব, যা সবার জন্য উপকারী। বিপরীতে স্থানীয় মানুষদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা জরুরি। উল্লিখিত প্রকল্পটি নিয়ে সাত বছর আইনি লড়াই চলার পর তা বন্ধ করে দেয়া হয়। বাংলাদেশে হাইড্রোকার্বন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, যা দারুণ উদ্যোগ। কিন্তু স্থানীয় মানুষ কী চাইছে, তাদের প্রত্যাশা, বিশ্বাস, মূল্যবোধের বিষয়গুলো আমাদের জানা দরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনো একটি প্রকল্প নিয়ে আমরা যদি লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে ফেলি, তবে তা কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার কথা আমরা বলছি, তবে এটি কিন্তু ব্যয়বহুল। শহরের বাসায় বসে আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, তাতে ইউনিটপ্রতি ব্যয় হয় ৪ থেকে ৮ টাকা। সৌরশক্তি নিয়ে সন্দ্বীপে কাজ করার সময় আমি দেখেছি সেখানকার লোকেরা ইউনিটপ্রতি খরচ করছে ৩২ টাকা করে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরকার দ্বিগুণ ভর্তুকি দিচ্ছে। তাই আমরা যখন বিকল্প জ্বালানির কথা বলি তখন আমাদের বাড়তি খরচ করার আগ্রহটাও দেখাতে হবে। দেশের গরিব মানুষ, যারা গ্রামে থাকছে, পিরামিডের নিচের দিকের এ লোকদের উপার্জন বেশি না, কিন্তু তারা জ্বালানির জন্য সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করছে। আমরা শহরে বসে তুলনামূলক ভালো বিদ্যুৎ সংযোগে থাকার পরও যখন বিদ্যুতের দাম বাড়া নিয়ে অভিযোগ করি তখন কিন্তু সবুজ জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের সম্ভাবনা নড়বড়ে হয়ে যায়। এ  বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে তখনই আমরা তা বুঝতে সক্ষম হব যখন সমন্বিত নীতি নিয়ে অগ্রসর হব, যেখানে বিভিন্ন সেক্টরের মানুষদের সমভাবে অংশগ্রহণ থাকবে।