গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। ঘটেছে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ। গড়ে ওঠে নতুন অনেক ব্যবসা উদ্যোগ। এসব উদ্যোগ-প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক গতিশীলতায় রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সমান্তরালে বেড়েছে বিভিন্ন পঞ্জি স্কিমের বিস্তারও। যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপে-টু ইউ থেকে শুরু করে সর্বশেষ আলোচিত ইভ্যালি বা ই-অরেঞ্জসহ নানা অবয়বে আবির্ভূত হয়েছে এসব প্রতারণামূলক স্কিম। এসব স্কিমে অর্থ লগ্নি করে পুঁজি হারিয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। নিঃস্ব হয়েছে অনেকে। দুঃখজনকভাবে এসব আর্থিক প্রতারণা প্রতিরোধে জোরালো রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্পরতা এখনো ঘটনার আকস্মিকতাতাড়িত; সার্বিক নজরদারিভিত্তিক নয়। আর্থিক প্রতারণা যেভাবে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, তাতে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ার সময় হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন শুরু করে কার্যক্রম পরিচালনা সব ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি।

দেশে পঞ্জি স্কিমের সবচেয়ে পরিচিত ধরন হলো বহু ধাপভিত্তিক বিপণন (এমএলএম)। এমএলএম ব্যবসার নামে প্রতারণার ফাঁদ দীর্ঘদিনের। অথচ যুবক ও ডেসটিনির কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার আগে এ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। প্রথমে যুবক ও পরে ডেসটিনির প্রতারণা জানাজানি হলে সমাজে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও কিছুটা নড়েচড়ে বসে। দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রকদের প্রাতিষ্ঠানিক  শৈথিল্যের ঘাটতিতে এ ধরনের অপকর্ম পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। কখনো ক্ষুদ্রঋণ, কখনো কো-অপারেটিভ সোসাইটি বা কো-অপারেটিভ ব্যাংক, আবার কখনো মাল্টিপারপাস সোসাইটি নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা অব্যাহত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান কখনো উচ্চ বেতনে চাকরি দেয়া, কখনো আকর্ষণীয় সুদ দেয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বিশেষ অঞ্চলকে টার্গেট করে সেখান থেকে মোটা অংকের অর্থ তুলে লাপাত্তা হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা অঞ্চল সাম্প্রতিককালে প্রতারণামূলক ব্যবসার রমরমা ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে খবর মিলছে। সাধারণ মানুষের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে বিপুল অর্থ। এর অবসান জরুরি।

আর্থিক প্রতারণা শুধু আমাদের দেশ নয়, এটা একটা বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। অনেক দেশেই এ ধরনের প্রতারণামূলক ব্যবসা বিরাজমান। ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত প্রভৃতি দেশেও এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটে। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হলো, তারা আইন প্রয়োগে কঠোর এবং সেখানে নজরদারি ব্যবস্থা খুব দৃঢ় ও সর্বব্যাপ্ত। আমরা এদিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে। কয়েকটি বড় কেলেঙ্কারির পর চীনের কেন্দ্রীয় সরকার এলএমলএমের মতো পঞ্জি স্কিম নিষিদ্ধ করেছে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুরক্ষায় কঠোর নীতিমালার ওপর জোর দিয়েছে। দেশটির ব্যাংকিং কমিশন, জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, অন্য কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার বিধিমালা প্রণয়ন করেছে এবং তার বাস্তবায়ন করেছে, যাতে লগ্নিকারী বা আমানতকারীর অর্থ পুনরুদ্ধার সহজতর হয়। ভারতও এ ধরনের বেশকিছু নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সারদা, রোজ ভ্যালি, স্টক গুরু, স্পিক এশিয়াসহ কিছু বড় কেলেঙ্কারির পর দেশটি লোকসভায় ব্যানিং অব আনরেগুলেটেড ডিপোজিট বিল পাস করেছে। এ ধরনের অপরাধের মামলার বিচার প্রক্রিয়া ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পঞ্জি স্কিমগুলো নজরদারির জন্য আরবিআই, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী আন্তঃমন্ত্রণালয় দল (আইএমজি) গঠন করেছে। গড়ে তোলা হয়েছে একটি অনলাইন ডাটাবেজ, যেখানে আমানত গ্রহীতার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে ডাটাবেজ কর্তৃপক্ষকে আমানত গ্রহীতার ব্যবসার সবিস্তার তথ্য জানানোর বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে প্রতারণা করলে সহজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ধরা সম্ভব। দেশগুলোর এসব নীতি ও পদক্ষেপ আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

দেশে বেশ আগেই মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন করা হয়। এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। এছাড়া পিরামিডসদৃশ বিপণন কার্যক্রম চালানো, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ মোড়কজাত না করে পণ্য বিক্রি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য বা সেবা বিক্রি না করা, পণ্য বা সেবার অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, নিম্নমানের পণ্য বা সেবা বিক্রি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। অথচ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানই লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার অভিনব পন্থায় নিষিদ্ধ পিরামিডসদৃশ বিপণন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যার সর্বশেষ উদাহরণ ইভ্যালি বা ই-অরেঞ্জ। অর্থের পরিবর্তে পণ্যকে কেন্দ্রে রেখে সাজানো হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের স্কিম। আকর্ষণীয় অফারের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করেছে। কিন্তু যথাসময়ে পণ্য তো সরবরাহ করেইনি, আবার অর্থও ফেরত দেয়নি। তাদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বিপুলসংখ্যক গ্রাহক। সুতরাং পঞ্জি স্কিমের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতারণা বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর বিকল্প নেই।

পঞ্জি স্কিম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বেড়ে ওঠাটা গোপন কোনো বিষয় নয়। প্রকাশ্যেই তারা কার্যক্রম চালাচ্ছে। কোনো কোনোটি নিবন্ধন নিয়েছে সমবায় অধিদপ্তর থেকে, কোনো কোনোটি নিয়েছে যৌধ মূলধনি  কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর থেকে। আবার কোনো কোনোটির নিবন্ধন পর্যন্ত নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকিতে খুব একটা নজর নেই। যখনই বড় কোনো প্রতারণার ঘটনা ঘটে তখনই কেবল সংস্থাগুলোর তত্পরতা দেখা যায়। পূর্বাপর নজরদারির কোনো ব্যবস্থা নেই। সন্দেহ নেই, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি আগে থেকেই সার্বিক নজরদারি জোরদার করে তাহলে এ ধরনের প্রতারণা ঠেকানো অনেকটা সম্ভব। সুতরাং সংস্থাগুলোকে এদিকে বেশি নজর দিতে হবে। ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার সুবাদে দায়ীদের কাউকে কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। এক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি কাম্য।

শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, এখানে জনসচেতনতারও একটা দিক আছে। অনেকেই অজ্ঞতা, সচেতনতার অভাবে পঞ্জি স্কিমের সঙ্গে নিজেকে জড়ায়। অস্বাভাবিক মুনাফার আশায় সেখানে লগ্নি করে। কিন্তু নিজের ভুল বুঝতে পারে তখনই, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো লাপাত্তা হয় কিংবা যখন আর অর্থ ফেরত পায় না। এক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মানুষের আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। সংবাদমাধ্যমে নিয়মিতভাবে আর্থিক প্রতারণার নানা বিষয় সম্পর্কে সচেতনতামূলক বার্তা প্রকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।  

ডিজিটাইজেশনের কারণে দ্রুতই ই-কমার্সের বিস্তার ঘটছে। অনেকেই যুক্ত হচ্ছে এ খাতে। খাতটি এখনো অনিয়ন্ত্রিত। ফলে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। সামনে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা আরো বাড়বে। তাই এগুলো মোকাবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার এখন সময়ের দাবি। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে প্র্রয়োজনে ভারতের মতো উচ্চ পর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় দল গঠন ও একটা নিবেদিত ডাটাবেজ করা যেতে পারে।