ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে আবির্ভূত। দূষিত বাতাসে প্রতি বছর প্রাণহানি ঘটছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের। কমছে গড় আয়ু। শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সর্বশেষ এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স বলছে, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার বাসিন্দাদের সাত বছরের কাছাকাছি আর সারা দেশের মানুষের আয়ু কমছে পাঁচ বছরের বেশি। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়ই বায়ুদূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত তিন গুণ বেশি। এ অবস্থায় দেশে বায়ুদূষণের ভয়াবহতা এবং মৃত্যুঝুঁকি প্রকটতা সহজেই নিরূপণযোগ্য। এদিকে কভিড-১৯ বাস্তবতা বিদ্যমান। শুষ্ক মৌসুম তথা শীতকাল চলে আসবে কয়েক মাসের মধ্যে। বায়ুদূষণের প্রকোপ বেশি বাড়ে এ মৌসুমেই। কভিড পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে কর্তৃপক্ষের শিথিলতা অব্যাহত থাকলে বায়ুর মান আরো উদ্বেগজনক মাত্রায় উন্নীত হবে। কাজেই এ সময়ে বাড়তি সক্রিয়তার পাশাপাশি বায়ুর মান উন্নয়নে বছরব্যাপী দূষণ প্রতিরোধী কার্যক্রমগুলোয় জোরারোপ করতে হবে। এ কাজে নজরদারি বাড়াতে হবে পরিবেশ অধিদপ্তরের। পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ।
১৬ বছরের মধ্যে গত জুলাইয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্বের অন্যতম নির্মল বায়ুর শহরে পরিণত হয়েছিল ঢাকা। ঈদে বিপুলসংখ্যক মানুষের ঢাকা ছাড়া, করোনা সংক্রমণ সামলাতে লকডাউনে নির্মাণকাজ বন্ধ ও গাড়ি চলাচল সীমিত থাকার কারণে বায়ুর মানের উন্নতি হয়। সংক্রমণ কমার কারণে প্রায় স্বাভাবিক হয়েছে যান চলাচল। এতে দূষণের মাত্রা বাড়বে বৈকি। তাছাড়া দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার তেমন কোনো উন্নতি নেই; বরং ক্রমাগত ভঙ্গুর হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো যাচ্ছে না। বায়ুদূষণের বড় কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি। চলছে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ। সারা দেশে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলমান। ঢাকার আশপাশসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের শিল্প-কারখানা ও ইটভাটা; যা বায়ুদূষণের জন্য বিপুলাংশেই দায়ী। রান্নার কাজে এখনো সনাতন পদ্ধতিই সই। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর, যানবাহনগুলোয় সবুজ জ্বালানির ব্যবহার আর অপরিকল্পিত শিল্প ও নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অনেকাংশে দূষণ কমানো সম্ভব।
চীনের বেইজিংসহ হুবেই প্রদেশের বিভিন্ন শহর আর ভারতের দিল্লির বায়ুদূষণের ব্যাপকতার কথা আমরা জানি। শহরগুলোয় বায়ুদূষণ সংকটজনক মাত্রায় পৌঁছলে নগর কর্তৃপক্ষ তা জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে বিভিন্ন ক্লস্টার প্রজেক্ট গ্রহণ করে। দিল্লিতে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহনের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি যত্রতত্র বর্জ্য পোড়ানো, ডিজেল, পেট্রল কিংবা কেরোসিনে চালিত বৈদ্যুতিক জেনারেটর চালানো নিষিদ্ধ করেছে দিল্লি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি। পাওয়ার ব্যাকআপের জন্য ইনভার্টার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বেইজিং যেমন তাদের চারটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রাকৃতিক গ্যাসে প্রতিস্থাপন করেছে। তিন দশক আগে এশিয়ার অন্যতম দূষিত শহর ছিল সিঙ্গাপুর। সে সময় দেশটির সরকার গাড়ি ক্রয় ও ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ জুড়ে দেয়। রাস্তায় ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা কমানোর প্রচেষ্টায় ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ির মালিকানার খরচ বাড়ানো হয়। সিঙ্গাপুর এখন বিশ্বের অন্যতম বিশুদ্ধ শহর।
বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-হাঁচি-কাশি, হাঁপানি, ফুসফুসের অসুখ-বিসুখ এখন ঢাকার মানুষদের নিত্যসঙ্গী। পরিস্থিতি পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবশ্য কর্তব্য হবে উল্লিখিত দেশের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে বায়ুদূষণের মাত্রা যথাসম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, দূষণ নিরোধ দূরে থাক, তা নিয়ন্ত্রণেরও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ঢাকা এখন সবচেয়ে উত্তপ্ত নগরীতে পরিণত। এর সঙ্গে যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত ধোঁয়া, সড়কের ধুলোবালি, শিল্প-কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যুক্ত হয়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। দূষণ বাড়ছে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও। এ অবস্থায় সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সমন্বিত হয়ে কাজ করতে হবে। দিল্লি, মুম্বাই, বেইজিংয়ে বায়ুর মান অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পৌঁছে গেলে সেসব দেশের সরকার বিশেষ স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা জারি করে। নাগরিকদের বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পেতে নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। অথচ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই দেখা যায়, যা কাম্য নয়।
দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি ও শিল্পায়নকে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নাসা। দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির প্রমাণ দিতে গিয়ে অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। দূষণ রোধে দেশে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রাজধানীসহ সারা দেশে চলছে। এসব গাড়ি চালানোর সঙ্গে আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনেকে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। ফলে তা বন্ধ হচ্ছে না। বায়ুদূষণের কারণ প্রতিরোধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করতে পারলে বায়ুদূষণ হ্রাস করা কঠিন নয়। এজন্য অবশ্য ব্যাপক প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। আবার শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, বায়ুদূষণ রোধে সবুজায়নে অত্যধিক জোর দিতে হবে। মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে দেশে বনাঞ্চল ক্রমাগত কমছে। এ অবস্থা দীর্ঘতর হলে বায়ু তথা পরিবেশ দূষণ আরো বাড়বে। সুতরাং বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি করে সবুজায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিকল্প নেই।
শুধু আইন প্রণয়ন করলে চলবে না, বায়ুদূষণ প্রতিকার ও প্রতিরোধ করতে হবে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিকভাবে। যানবাহনে ক্যাটালাইটিক কনভার্টর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার জন্য যেমন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি ডিজেলের পরিবর্তে সিএনজি গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। তাই দূষণসৃষ্ট স্বাস্থ্য জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সুসমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমেই আমরা নির্মল বায়ুর ব্যবস্থা করতে সক্ষম হব।










