শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও বিধান অনুযায়ী শিল্প-কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েই গেছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত সরকারি কমিটির প্রতিবেদনে অগ্নিনিরাপত্তাসহ বেশকিছু ত্রুটি থাকার তথ্য উঠে আসে। এমন প্রেক্ষাপটে শিল্প-কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা দুর্বলতা চিহূিত করতে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে কারখানা পরিদর্শনে নামছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এ কার্যক্রমের আওতায় ধাপে ধাপে ৪৬ হাজার কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা যাচাইপূর্বক প্রতিবেদন প্রণয়ন ও সুপারিশ প্রদান করা হবে। ব্যবসায়ীরাও একে সাধুবাদ জানিয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে, কমিটি শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও যাচাই নয়, কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
দেশে গত দুই দশকে দ্রুত শিল্পায়ন হয়েছে, সে তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়নি। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সরকার বা নজরদারি কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে, তাদের অনিয়ম সামনে আসে। চিরাচরিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একে অন্যের ওপর দোষ চাপায়, নিজেদের অনিয়মের কথা অস্বীকার করে। কর্তব্যের কথা বললে তারা নানা ঘাটতি ও সমস্যার ফিরিস্তি তুলে ধরে। নিয়মিত পরিদর্শনে গিয়ে শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ডিআইএফইর। কিন্তু তারা সে কাজ যথাযথভাবে করতে পারছে না। এতে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা হিসেবে এরই মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী একটি কমিটি বা সংস্থা গঠনের কথা অনেক দিন ধরেই আলোচনায় ছিল। সে জায়গা থেকে কমিটি গঠন এবং কারখানা পরিদর্শনের উদ্যোগটিকে ইতিবাচক। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে সঠিকভাবে কারখানার কর্মপরিবেশের দুর্বলতা চিহূিত ও সুপারিশ তুলে ধরার মাধ্যমে। আবার এ কথাও ঠিক, শুধু সুপারিশ করলেই হবে না তা বাস্তবায়নেরও যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কারখানাভিত্তিক কাঠামোগত দুর্বলতা চিহূিতের এ উদ্যোগ হয়রানির কারণ না হয়। পরিদর্শন সম্পর্কে কারখানা মালিকদের এক ধরনের ভীতি কাজ করে। এখান থেকে উত্তরণে কমিটিকে আস্থাও অর্জন করতে হবে। যারা পরিদর্শনে যাবে তাদের দক্ষতা-সক্ষমতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা চাই।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ তৈরিতে গঠিত হয় বিদেশী ক্রেতাদের দুই জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। পাশাপাশি দাতা সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় রিমেডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল (আরসিসি) গঠন করে সরকার। এরপর বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কারকাজ শুরু হয়। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে কারখানার নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের সুনাম বেড়েছে। শিল্প-কারখানার দুর্ঘটনা এড়াতে ভিয়েতনাম ও ভারতের কিছু উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। যেমন ২০১৯ সালে সাসটেইনেবল ট্রেড ইনিশিয়েটিভের আওতায় দেশ দুটিতে লাইফ অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইনিশিয়েটিভ কর্মসূচি গ্রহণ করে। যেখানে শ্রমিক সুরক্ষা, রাসায়নিক উপকরণ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার, আগুন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়গুলোতে জোর দেয়া হয়। কর্মসূচিটির সাফল্যের সূত্র ধরে ২০২০ সালে তা চালু করা হয় কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানে। কারখানা প্রতিনিধিরা তাদের কাজ যথাযথভাবে পরিপালন করছেন কিনা তার জন্য নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব পালন করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান যেমন শ্রম ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ও কমিটি। জার্মানিতে শিল্প-কারখানার নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি অকুপেশনাল সেফটি অ্যাক্ট রয়েছে। যার মাধ্যমে নিয়োগকর্তাদের শ্রমিকদের বিপদমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা অকুপেশনলাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আওতায় কর্মস্থল পরিদর্শনের ওপর জোর দেয়া হয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির পাশাপাশি কর্মীদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, প্রচার, অভিজ্ঞান ও আনুষঙ্গিক সহায়তা নিশ্চিতের জন্য এ ধরনের আইন প্রবর্তন করা হয়েছে। এ বিষয়গুলোর আলোকে বাংলাদেশেও কিছু উদ্যোগ নিতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের শিল্প-কারখানাগুলোর ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে কারখানা পরিদর্শনের পদক্ষেপ। সন্দেহ নেই, এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, বিশেষত সব ব্যবসায়ী সংগঠন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা এতে যুক্ত আছেন। সবচেয়ে শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের কমিটি এটি। কোনো কারণে কারখানা পরিদর্শন ও সংস্কারে এ কমিটি সফল না হলে দেশের শিল্প-কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে। এতে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি আরো ক্ষুণ্ন হবে। যতদূর জানা যাচ্ছে তাতে এ কমিটির কাজ হবে পরিদর্শনপূর্বক ত্রুটি শনাক্ত ও সংস্কারের সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা। প্রত্যাশা থাকবে, কারখানা সংস্কারেও তারা সরাসরি সংযুক্ত থাকবে। এক্ষেত্রে নতুন সংস্থাও সৃষ্টি করা যেতে পারে। শুধু সংস্কার করলে হবে না, নিয়মিত তদারকিও জোরদার করতে হবে। বিশ্বের যেখানেই কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত সেখানেই কিছু গাইডলাইন দেয়া রয়েছে এবং সেগুলো ঠিকমতো মানা হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত দেখভাল করা হয়। আমাদের এখানেই বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে।
সহস্রাধিক পোশাক কারখানার পাশাপাশি দেশে রয়েছে খাদ্য প্রস্তুতকারক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কাগজ ও কাগজের পণ্য তৈরি, বেসিক মেটাল, ফ্যাব্রিকেটেড মেটাল, ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্ট, ফার্মাসিউটিক্যাল মেডিসিনাল, রিসাইক্লিং, হস্তশিল্প, কেমিক্যাল, বোটানিক্যাল এবং রাবার ও প্লাস্টিক প্রস্তুতকারী পণ্যসহ নানা ধরনের কারখানা। তদারকির অভাবে বিভিন্ন সময় কারখানার কর্মপরিবেশের পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। এসব কারখানার কর্মপরিবেশের প্রতি নজর দেয়া আবশ্যক, যাতে সেখানে অগ্নিকাণ্ডসহ কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা না থাকে। শ্রম আইনের ৩২৬ ধারা ও শ্রম বিধিমালার ৩৫৪ বিধি অনুযায়ী প্রত্যেক মালিককে কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান, দোকান ও ঠিকাদারি সংস্থা রেজিস্ট্রেশন এবং লাইসেন্স মঞ্জুরির জন্য আবেদন করতে হয়। আবেদনকালে কারখানাগুলোকে যদি যাচাই-বাছাই করে নিবন্ধন দেয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত তদারকির ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখা হয় তাহলে শিল্প-কারখানার দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে কারখানা পরিদর্শনে অতীতে কী সমস্যা হয়েছিল সেটি চিহ্নিত করা না গেলে এগোনো যাবে না। ডিআইএফইর ত্রুটি-বিচ্যুতিও পর্যবেক্ষণপূর্বক সেখানে সংস্কারে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে এর সক্ষমতা ও ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। রানা প্লাজা ধসের পর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের অধীনে পোশাক কারখানাগুলো পরিদর্শন হয়। এ দুই সংস্থার হয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দিয়ে পরিদর্শনকাজ শুরু করা যেতে পারে। দেশীয় কারখানায় যারা কাজ করেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। আলোচ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি পেশাক খাতের মতো দেশের সব শিল্প নিরাপদ হোক, এ প্রত্যাশা সবার। এতে বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম বাড়বে, যা বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে জরুরি।
আমাদের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একের পর এক কলকারখানা গড়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। কেননা শিল্পোন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশের প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই এসব কারখানার কর্মপরিবেশ ও সার্বিক উন্নয়নে সরকারের ভূমিকাকে জোরদার করতে হলে তা অবশ্যই নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। সেখানে কোনো অগ্নি-বিদ্যুৎ বা স্থাপত্যগত ঝুঁকি আছে কিনা তা চিহ্নিত করা জরুরি। তবে তদারককারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর আচরণও হতে হবে ব্যবসাবান্ধব; প্রতিবন্ধক নয়। নিবন্ধনহীন কারখানাগুলোকে কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায়, তা নিয়ে দ্রুত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এতে কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত হবে, উৎপাদনশীলতাও বাড়বে। সরকার শিল্পায়নের মাধ্যমে অধিক কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের সব শিল্প-কারখানার পরিপূর্ণ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করাও জরুরি।










