নভেল করোনাভাইরাস মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের সরকারও বড় অংকের আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করে। কিন্তু বণ্টনের অভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ তা থেকে বঞ্চিত। সম্প্রতি  বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জরিপের তথ্য বলছে, দেশের ৭৯ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ পায়নি। উপরন্তু, বরাদ্দকৃত অর্থছাড়ের জন্য উেকাচ দাবির অভিযোগও রয়েছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একবার এক ভাষণে বলেছিলেন, খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষ হয় না, হয় বণ্টনের অভাবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বণ্টনের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রাসঙ্গিক। কেননা বণ্টন ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা এখানে অন্যতম কারণ। অথচ করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি এ অর্থের সুষ্ঠু বণ্টনের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একথা অনস্বীকার্য যে করোনার প্রভাবে দেশের ছোট-বড় সব উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তবে পুঁজি বেশি থাকার কারণে বড় উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসায়িক সংকট মোকাবেলা করতে পারলেও স্বল্প পুঁজির কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে ওঠাই কঠিন হয়ে ওঠে। করোনাসৃষ্ট বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হয়েছেও তাই। ফলে ঋণ বা প্রণোদনার প্রয়োজনটা তাদেরই বেশি। অথচ সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের বেশির ভাগই পেয়েছেন বড় উদ্যোক্তা বা ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান। অবকাঠামোগত সমস্যা যেমন আছে, তেমনি আছে বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতি ব্যাংকের পক্ষপাত। এদিকে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ দেয়ার কথা বলা হলেও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। অনেকে আবার প্রণোদনার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নন। তাছাড়া অনেক সময় ব্যাংক ও গ্রাহক সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নানা শর্তের কারণে ঋণ পাওয়া নিয়ে জটিলতাও রয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের ইতথ্রেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মানিক নাথ ও তার সহযোগী ভিয়েতনামের এসএমই শিল্পের ওপর সম্প্রতি একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সেখানে তারা দেখিয়েছেন চলমান বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের প্রভাব থেকে ভিয়েতনাম সরকার কীভাবে তার দেশের এসএমই শিল্পকে সুরক্ষা দিয়েছে। প্রথমত, তারা এসএমই শিল্পের আর্থিক সীমাবদ্ধতা দূর ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নীতি বাস্তবায়নে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। দ্বিতীয়ত, ঋণের বিপরীতে সুদের হার কমানো এবং জামানতের পরিমাণ সহনীয় মাত্রায় রাখতে ছিল মনোযোগী। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগকে সমর্থন করতে ধারাবাহিক কর অব্যাহতি দিয়েছে তারা। আর বণ্টন কার্যক্রম যেন সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়, তার জন্য মনিটরিং করা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে। আমাদের দেশেও তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত অর্থ ছাড় করতে, ঋণের শর্ত শিথিলসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করে দেয়া যেতে পারে। এ কাজে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এগিয়ে আসতে ও তদারকি বাড়াতে হবে। 

বাংলাদেশের মতো বিপুল শ্রমশক্তির দেশে বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্প মোট দেশজ উৎপাদনে আরো অনেক বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে। জীবন-জীবিকা বাঁচাতে করোনা মহামারীর শুরু থেকেই সরকারের সচেষ্টতা চোখে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ প্রদানে সদিচ্ছার ঘাটতি দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করেছে। তদারকি এখনো থেমে নেই। কিন্তু বড় সমস্যা হলো, সরকারের হাতে এ ব্যবসায়ীদের পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকা নেই। করোনার কারণে অর্থ সংকটে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। নতুন করে যেসব তালিকা করা হয়েছে, তাতেও অনিয়ম দেখা গেছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে তা সরকারকে সরবরাহ করতে পারে।

পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা ও সুপারিশ প্রণয়ন করার বিকল্প নেই। প্রণোদনার অর্থের যাতে কোনো ধরনের অপব্যবহার না হয়, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন এর সুফল পান এবং ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। গবেষণায় প্যাকেজ বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে, যা দূর করা জরুরি। সরকারি আর্থিক সহায়তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হলে সমাজে বৈষম্য আরো বাড়বে। যেহেতু কভিড সংকট শিগগিরই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সমন্বয় করে ভিন্ন কৌশল ঠিক করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কৌশল ঠিক করা জরুরি।

সর্বব্যাপ্ত করোনা দুর্যোগে দেশের অর্থনীতির সব খাত যখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন তাতে গতি ফেরাতে ব্যবস্থাও নিতে হবে। কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প যদি ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে শুধু বৃহৎ শিল্প দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে বৈকি। প্রণোদনা প্যাকেজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থায়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর সুচারু বাস্তবায়ন তার চেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষত প্রণোদনার অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে পৌঁছানোর বিকল্প নেই। মানুষের আয় ক্রমেই কমতে থাকায় অভ্যন্তরীণ বাজারও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে অনেক শিল্পই নতুন করে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রণোদনার পাশাপাশি নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।