গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো একটানা বন্ধ। ইউনিসেফের তথ্য বলছে, দীর্ঘ বন্ধের ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। বারবারই পিছিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খোলা যায়, তা নিয়ে কিছুদিন ধরে আলোচনা চলছে। সংক্রমণ পরিস্থিতি ১০ শতাংশের মধ্যে এলে সম্প্রতি জাতীয় কারিগরি কমিটির পরামর্শ চাওয়া হয়। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পক্ষে মত দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় অবশেষে খুলতে যাচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে খুলছে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত। ধাপে ধাপে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও খোলার আশ্বাস মিলছে। বহুদিন পরে প্রিয় শিক্ষাঙ্গনের দ্বার উন্মুক্ত হবে শিক্ষার্থীদের জন্য। নিঃসন্দেহে এটা সুখবর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের ফেরাটা যেন আনন্দময়, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য দ্রুত প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করা জরুরি।
এর আগে এত দীর্ঘ সময় কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকেনি। কাজেই পুনরায় চালু করাটা অনেক চ্যালেঞ্জের। বন্ধের সময় শিক্ষাঙ্গন ও এর সার্বিক অবকাঠামো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধুলোর দীর্ঘ আস্তরণ জমেছে। শ্রেণীকক্ষ, ক্যান্টিন, কমন রুম, গ্রন্থাগার, শিক্ষকদের অফিস, প্রক্ষালন কক্ষ থেকে শুরু থেকে খেলার মাঠ সবখানেই ময়লা-আবর্জনার ছাপ। চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পানি, বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটির লাইন বিচ্ছিন্ন আছে বলে খবর মিলছে। করোনা-পরবর্তী নতুন এক বাস্তবতায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে ফিরবে। বিদ্যালয় ভবনে কীভাবে প্রবেশ করবে, কারা কীভাবে আসবে, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা কী, বেঞ্চগুলো কীভাবে বিন্যাস করতে হবে, এক বেঞ্চে কয়জন বসবে, সাধারণ পরিসরগুলো কীভাবে ব্যবহার করবে, কে কীভাবে টিফিন খাবে, কীভাবে শিক্ষাঙ্গন ত্যাগ করবে—এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। নইলে শিক্ষার্থীদের আগমন, পাঠদান থেকে শুরু করে স্কুল ত্যাগসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা সামাল দেয়া কঠিন হবে বৈকি।
কিছু দেশ এরই মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছে। জাপানে পুরোদমে সশরীরে ক্লাস চলছে। দেশটি বেশ আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রস্তুতির নির্দেশিকা চূড়ান্ত করে রাখে। তাতে শ্রেণীকক্ষে খোলা হাওয়া (ক্রস ভেন্টিলেশন), প্রতিষ্ঠানে সমাবেশ বা জটলা কমানো, মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া, শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা—এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া কারো করোনা শনাক্ত হলে তাকে প্রতিষ্ঠানে আসা থেকে বিরত রাখা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেও বলা হয়েছিল। ওই নির্দেশনা মোতাবেক সার্বিক প্রস্তুতি বজায় রেখে দেশটির শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। জার্মানিতেও একই অবস্থা। দেশটিতে সংক্রমণ কমলে শিক্ষার্থীদের স্কুলে নেয়া শুরু হয়। তবে প্রথম দিকে সব শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে আসতে দেয়া হয়নি। কোনো ক্লাসে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকলে একদিন ১৫ জন, পরের দিন ১৫ জন করে ক্লাসে আসবে—এমন নিয়ম করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সময় সব শিক্ষার্থীর মুখে মাস্ক থাকতে হবে। ক্লাসে মাস্ক পরার দরকার নেই। টিফিনে বা ছুটিতে ক্লাসের বাইরে থাকলে মাস্ক পরতে হবে। এছাড়া মঙ্গলবার ও শুক্রবার দ্রুত শনাক্তকরণ কিট দিয়ে শিক্ষার্থীদের করোনা পরীক্ষা করতে হয় মা-বাবাকে। রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার ফলাফল ক্লাস শিক্ষককে জানাতে হয়। দেশটির ১৬টি রাজ্যে এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সিডিসি প্রণীত নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যবিধির পরিপালন নিশ্চিত করে পাঠদান, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
দেশে এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করণীয় বিষয়ক একটা নির্দেশিকা চূড়ান্ত করেছে। ওই নির্দেশিকায় মৌলিক কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে শ্রেণীকক্ষে, চত্বরে বা খোলা জায়গায় এক মিটার বা তিন ফুট দূরত্বে শিক্ষার্থীদের বসার বা চলাফেরার ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুলে প্রবেশের আগে তাপমাত্রা পরীক্ষা ও মাস্ক পরার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জীবাণুনাশক ছিটানো, হাত ধোয়া, দরজা-জানালা খোলা রাখার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয় আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধির পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং আগামী বছরের পরীক্ষার্থী প্রতিদিনই ক্লাস করবে। বাকি শ্রেণীর ক্লাস শুরুর দিকে এক দিন করে হবে। পরে অবস্থা বুঝে ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে। অনলাইন ও টেলিভিশনের ক্লাসও যুগপত্ভাবে চলবে। এটা ভালো চিন্তা। সবাইকে একসঙ্গে ক্লাসে না এনে ধাপে ধাপে আনলে প্রস্তুতি নেয়াটা সহজ হবে। ধীরে ধীরে সার্বিকভাবে প্রস্তুত হওয়া যাবে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে অবশ্য এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের টিকা দেয়া সাপেক্ষে নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী হলে গাদাগাদি করে থাকে বলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। সেক্ষেত্রে সবার টিকাদান নিশ্চিত করা চাই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও এখন থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে বৈকি।
সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বজনীনভাবে স্বাস্থ্যবিধির পরিপালন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের বাস্তবতায় অবশ্য কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। কেননা এখানে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বিরাজমান। এ বৈষম্য গ্রামে ও শহরে, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। বৈষম্য আছে প্রাক-স্কুল, প্রাথমিক স্তরে, মাধ্যমিক স্তরে, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। কাজেই সর্বজনীন ব্যবস্থাগুলো সবার পক্ষে নেয়াটা সহজ নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে জীবাণুনাশক ছিটানোর লোকবল নেই। জীবাণুনাশক ও তাপমাত্রা মাপার কিট কেনাও খরচের ব্যাপার। সীমিত বাজেটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা বাড়তি চাপের। এ-সংক্রান্ত অর্থ কীভাবে জোগানো যায়, সেটিও ভাবতে হবে। এছাড়া ফটক বন্ধ থাকার কারণে বিশেষ করে শহরের অনেক প্রতিষ্ঠানের সামনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় জমে। ভিড় কীভাবে সামলানো যায়, সে পথও খুঁজতে হবে। প্রতিষ্ঠানে আসার পর কিছু শিক্ষার্থীর মাস্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। সেটিও মাথায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে শ্রেণীকক্ষে বা প্রতিষ্ঠানের সুবিধামতো জায়গায় কিছু মাস্ক সবসময়ের জন্য মজুদ রাখার বিষয়ও ভাবতে হবে।
করোনা মহামারী আমাদের এক ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী হয়তো আর শিক্ষাঙ্গনে ফিরতে পারবে না। আর যারা ফিরবে তাদেরও শিখনফলে বিপুল ক্ষতি এরই মধ্যে হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিখনফল ত্বরান্বিত করতে বিশ্বব্যাংক সুনির্দিষ্ট কিছু ভিত্তিমূলক পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছে। সেগুলো হলো, স্কুলে ফিরলে শিক্ষার্থীদের শিখন ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন ও অগ্রগতি তদারক করা, স্কুলে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা নিশ্চিতে মনঃসামাজিক সমর্থন প্রদান ও প্রয়োজনে পাঠ পুনরুদ্ধারমূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করা, বন্ধের দিনগুলো সমন্বয়ে স্কুল পঞ্জিকার পুনর্বিন্যাস, পাঠ্যক্রম অভিযোজন ও ভিত্তিমূলক শিক্ষায় প্রাধিকার প্রদান, চাপ সামলাতে শিক্ষকদের প্রস্তুত করা এবং তাদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে সমর্থন জোগানো, সহায়তা প্রয়োজন হওয়া শিক্ষার্থীদের চিহ্নিতপূর্বক প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া, স্কুল খোলার পরিকল্পনার সঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বৃহত্তর কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীকে পুনরায় ভর্তি হতে উৎসাহিতকরণে বিশেষ জোর প্রদান প্রভৃতি। এসব বিষয়ও সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হবে। নইলে শিক্ষাঙ্গন খুললেও শিক্ষা খাতে করোনাসৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।










