চলতি বছর ঢাকার খালগুলোর দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনে হস্তান্তরের পর খাল উদ্ধারে নতুন করে অভিযান শুরু হয়। এতে কিছু খাল থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হলেও সমন্বয়হীনতার কারণে উদ্ধার করা জায়গা স্থানীয় প্রভাবশালীরা পুনরায় দখল করছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে শুক্রবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ঢাকার প্রতিটি খাল দখলদারদের উচ্ছেদের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। মন্ত্রীর কথায় সবাই আস্থা রাখতে চাইবে বৈকি। এ কথা সত্য, রাজউক ও ওয়াসার মতো সংস্থার উদাসীনতা এবং কাজের ক্ষেত্রে তাদের সমন্বয়হীনতা খাল ও জলাশয়গুলো বিনষ্ট হওয়াকে বলা যায় অনিবার্য করে তুলেছে। নতুন করে সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দেয়ার পর খালগুলো তার স্বরূপে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত প্রতিটি খালের অবস্থান চিহ্নিত করে সেগুলোকে উদ্ধারের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে তত্পর হয়ে ওঠা।
ঢাকার খালগুলোকে পুনরুদ্ধার ও সংস্কার করা গেলে পানি নিকাশ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। সেই সঙ্গে ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোকে দখলমুক্ত, সংস্কার ও পুনঃখনন করার ব্যবস্থাও নিতে হবে। কার্যত এ নদী ও খাল বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এগুলো নাব্যতা হারিয়েছে এবং এর পানি ব্যবহার সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। খাল ও নদী দখল, দূষণ বন্ধে বহু উদ্যোগ ও পদক্ষেপের কথা আমরা শুনেছি। কিছু কিছু প্রকল্পও নেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো সুফল মেলেনি। ঢাকা নগরীর বুক থেকে কীভাবে ও কেন এ খালগুলো দখল হলো, সে এক বড় প্রশ্ন। এর অনেক কারণ খুঁজে পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বড় দুটি কারণ হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দখল। ঢাকা মহানগরীতে মানুষ বেড়েছে, সম্প্রসারিত হয়েছে নগরী। নতুন নতুন ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তা হয়েছে অপরিকল্পিত ও বিশৃঙ্খলভাবে। ঢাকা নগরীতে ক্রমবর্ধমান মানুষের চলাচল ও পণ্য পরিবহনে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সড়ক যোগাযোগ। ফলে খাল ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক। যে খাল দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই পানি নেমে যেতে পারত, তা নষ্ট করে বানানো হয়েছে বক্স কালভার্ট কিংবা ড্রেন। ফলে রাজধানী এখন এক জলাবদ্ধতার মহানগর; সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। উচ্চ আদালত বলেছেন, জবরদখল ও ভরাটের শিকার খালগুলো উদ্ধার করতে হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তা কি বাস্তবে আদৌ সম্ভব? স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাজটা কঠিন হতে পারে, তবে অবশ্যই সম্ভব।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নদী, খাল ও জলাশয়গুলোকে সংরক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে বহুমুখী ব্যবহার করা হয়। লন্ডন, ব্যাংকক, আমস্টারডাম ও ভেনিস উত্কৃষ্ট উদাহরণ। তারা তাদের খালগুলোকে পরিকল্পিতভাবে নৌচলাচলের ব্যবস্থা ও মানুষের বিনোদনের উপযোগী করে তার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ঠিক রেখেছে। কিন্তু আমাদের দেশে উন্নয়নের নামে খালগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শহরের খালগুলোকে যাতায়াতের একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেক দেশে সমুদ্র থেকে অভ্যন্তরীণ বন্দরে জাহাজ পৌঁছাতে খাল ব্যবহার করে (যেমন ম্যানচেস্টার শিপ ক্যানাল)। প্রাইভেট গাড়ি বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসনের উদ্দেশ্যে সিউল শহরে ষাটের দশকে শহরের মধ্য দিয়ে বহমান খালের ওপর আচ্ছাদন দিয়ে দোতলা সড়ক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু তার ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। আগে-পরে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছে, দোতলা সড়ক নির্মাণের পর প্রাইভেট কার আরো বেড়েছে, যা যানজট সমস্যাকে প্রকট থেকে প্রকটতর করে তুলেছিল। সেই সঙ্গে বেড়ে গিয়েছিল শহরের তাপমাত্রা। এজন্য তারা ২০০৫ সালে দোতলা সড়ক ভেঙে নিজেদের হাতে চাপা দেয়া খালটিকে আবার উন্মুক্ত করেছে। সেখানে পুনরায় শুরু হয়েছে পানিপ্রবাহ। নগরবাসী এটিকে সিউলের পুনর্জন্ম বলে আখ্যায়িত করছেন। ব্যাংককে যাতায়াত ও মালপত্র পরিবহনের ক্ষেত্রে খাল ব্যবহার হচ্ছে, যা সস্তায় ও কম সময়ে যাতায়াত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমাদেরও যে খালগুলো রয়েছে তা কাজে লাগিয়ে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। সেক্ষেত্রে খাল বা জলাশয় যাতে মানুষ দখল বা ভরাট না করে তার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো খাল, জলাশয় রক্ষা করে নগরীর উন্নয়ন করতে হবে।
স্থায়ী অবকাঠামো হলে খাল দখল ঠেকানো যাবে, এমন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন স্থায়ী উন্নয়নের মাধ্যমে ঢাকার খাল রক্ষায় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ঢাকার ৩৯টি খালের অস্তিত্ব চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ঢাকার সব খাল সংস্কার করে হাতিরঝিলের আদলে আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকে একাধিক দফায় অনেক নির্দেশ এসেছে। শুধু খাল নয়, নদীর সীমানা নির্ধারণ এবং দুই পাড়ে ওয়াকওয়ে তৈরিরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব নির্দেশ মানার যে নমুনা দৃশ্যমান, তা মোটেও সুখকর নয়। অভিযোগ আছে, সঠিক মাপজোখ ছাড়াই নদী ও খালের ভেতরে পিলার স্থাপন করা হয়েছে। ওয়াকওয়ে তৈরি হয়নি। ফলে দখল অব্যাহত আছে। দূষণ ঠেকানোর অবস্থাও তথৈবচ।
উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে খালগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে, যা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধন ২০১০)’, ‘পরিবেশ নীতিমালা’, ‘বেঙ্গল ক্যানাল অ্যাক্ট ১৮৬৪’, ‘মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সকল এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০’-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কিন্তু এটি ঘটছে আইন ও প্রশাসনের চোখের সামনেই। ঢাকা শহরের যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ১০০ বছরে ঢাকা টাউন প্ল্যান, ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানসহ (ড্যাপ) একাধিক মহাপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতা ও গুরুত্ব না দেয়ার কারণে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি এসব মহাপরিকল্পনা। এসব মহাপরিকল্পনায় ঢাকা শহরের খাল, নদী ও জলাধার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। দুঃখজনক বিষয় হলো ভরাট, দখল ও দূষণের শিকার হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে খাল ও নদ-নদীগুলো। ১০০ বছর পরেও এখনো একই পরিকল্পনা করা হচ্ছে, কিন্তু নদী ও খাল আসল রূপ পাচ্ছে না।
ঢাকা শহরে খালগুলোকে নিজের গতিতে চলতে দেয়ার মধ্যে সত্যিকার সুবিধা অন্তর্নিহিত। সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রেখে পানির জোগান, মাছ চাষ ও নৌযোগাযোগ গড়ে তোলাসহ নদী ও খালের বহুমুখী ব্যবহার করা প্রয়োজন, যা একদিকে এগুলো সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে শহরকে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি ভাবার কোনো কারণ নেই, প্রকৃতিকে শাসন বা নিয়ন্ত্রণ করে মানুষ লাভবান হবে। সেটি সাময়িক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার ফল কখনই ভালো হতে পারে না। আমাদের চোখের সামনে এ রকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে পূর্বাভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ ঠিক রেখেই বসবাসের পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। আমাদের দেশেও কিছু ভালো অর্জন রয়েছে। সুতরাং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সিটি করপোরেশনের তরফ থেকে এরই মধ্যে ঢাকা শহরের বেশির ভাগ খাল ও বক্স কালভার্ট থেকে বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলো বেশকিছু খাল দখলমুক্ত করতে বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিয়েছে। খালগুলোকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশনকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে।










