গত এক দশকে রেলে বিনিয়োগ হয়েছে বিপুল অর্থ। এর সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে রেলপথ সংস্কার, পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন কিছু বগি ক্রয় এবং স্টেশনগুলো আধুনিকায়নের কাজে। তুলনামূলকভাবে নতুন ইঞ্জিন ও উন্নত যন্ত্রাংশ কেনায় অর্থ গেছে বেশ কম। বর্তমানে রেলে ২৭৮টি ইঞ্জিন রয়েছে। এর বেশির ভাগেরই বয়স ৩৫ থেকে ৬৩ বছর। পুরনো ইঞ্জিন হওয়ায় সেগুলো মেরামতের দরকার হয় বেশি। কিন্তু সংকট হলো, প্রয়োজনের সময় যন্ত্রাংশ সহজেই নাগালে পাওয়া যায় না। ৯৫ শতাংশ যন্ত্রাংশই আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। সব প্রক্রিয়া শেষ করে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে রেলওয়ের অনেক সময় লেগে যায়। এ বাড়তি সময়ক্ষেপণই ইঞ্জিনের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ অবস্থায় দেশেই যন্ত্রাংশ তৈরির বিকল্প নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রেলে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ কারিগরি ত্রুটি। পুরনো হওয়ায় ইঞ্জিনগুলোয় ঘন ঘন কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। অনেক সময় মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হয়। শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। সময়মতো যন্ত্রাংশ প্রাপ্তির অভাবে মেরামতের কাজ বিলম্বিত হয়, যা রেলের ইঞ্জিনের দুর্বল পারফরম্যান্সের জন্য দায়ী। বলা হচ্ছে, ইঞ্জিনের একটি যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে ১২টি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। চাহিদা নিরূপণ থেকে দরপত্র সম্পন্ন করতে যন্ত্রাংশের একটি লট কিনতেই সময় লাগে প্রায় দুই বছর। তার মধ্যে আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশ রেলওয়ে যে পরিমাণ যন্ত্রাংশ আমদানি করে, তা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিতে ‘ছোট আকারের’। ফলে বাংলাদেশকে পণ্য বিক্রি করতে তাদের আগ্রহ থাকেও কম। এজন্য অনেক সময় নতুন করে আবার দরপত্র আহ্বান করতে হয়, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রয় চুক্তি করতে হয়। সব মিলিয়ে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে হয় একটা দীর্ঘ ও ঝামেলাপূর্ণ যাত্রার মধ্য দিয়ে এবং এতে খরচও পড়ে বেশি। তাই যন্ত্রাংশ সংগ্রহে আমদানিনির্ভরতার পথ থেকে আমাদের সরে আসাটা বাঞ্ছনীয়।

নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় রেল ব্যবস্থা পুরো বিশ্বেই সমাদৃত। সেজন্য প্রতিটি দেশই যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আপত্কালীন যেকোনো সংকট এড়াতে ইঞ্জিন থেকে যন্ত্রাংশ উৎপাদন সবখানেই স্বয়ম্ভরতার পথ বেছে নিয়েছে। চীন, জার্মানি, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য সবখানে একই অবস্থা। দেশগুলো নিজস্ব কারখানায় ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে। এমনকি ভারত ও ইন্দোনেশিয়াও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই, যার সঙ্গে আমাদের সাযুজ্য অনেক। উল্লিখিত রাষ্ট্র দুটি ইঞ্জিন মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশগুলো দেশীয়ভাবে উৎপাদন করছে। এজন্য রেল কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়িয়েছে তারা। ফলে তাদের যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে রেল খাতে দেশ দুটির সাফল্যের মূলে এটিও একটি কারণ। সুতরাং ওইসব দেশের পথ আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

আমাদের দেশেও রেলের যন্ত্রাংশ তৈরি করা সম্ভব। ইস্পাত শিল্প বিকাশের কারণে উপকরণ হিসেবে লোহা ও ইস্পাত পেতে অসুবিধা হবে না। তাছাড়া তিনটি বিশেষায়িত রেলওয়ে কারখানাও আছে। সৈয়দপুরে আছে রেলওয়ে কারখানা, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রয়েছে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা আর চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রয়েছে ক্যারেজ ও ওয়াগন মেরামত কারখানা। কারখানাগুলো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল রেলওয়ের লোকোমোটিভ, ক্যারেজ ও ওয়াগনের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ এবং আয়ুষ্কাল ঠিক রাখার পাশাপাশি গতিশীলতা বজায় রাখা। এসব কারখানায় খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির মেশিনও রয়েছে। কিন্তু লোকবল সংকট, বাজেট ঘাটতি এবং আধুনিকায়নের অভাবে কারখানাগুলো কাঙ্ক্ষিত নৈপুণ্য দেখাতে পারছে না। সময় এসেছে কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর। বিষয়টি আমলে নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা কাম্য।

বাংলাদেশে রেল খাত একসময় লাভজনক ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন তা লোকসানি খাতে পরিণত হয়েছে। ভারতেও একসময় রেলের অবস্থা খারাপ ছিল। তবে ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভারতীয় রেলওয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে যাত্রী ভাড়া কমায়। প্রস্তাবিত ছাঁটাইয়ের বদলে ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়। কারখানা বেসরকারীকরণের বিপরীতে ডিজেল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিন, চাকা, যাত্রীবাহী কোচ তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। নতুন কারখানা নির্মাণের পাশাপাশি পুরনো কারখানা অধিগ্রহণ করা হয়। যাত্রী ভাড়া কমিয়ে ও সেবা বাড়িয়ে লাভজনক করা হয়। পণ্য পরিবহনের উন্নয়ন ঘটিয়ে রেলের আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। ভারত যদি রেলে এত উন্নতি করতে পারে, তাহলে আমাদের দেশেও তা অসম্ভব নয়। এজন্য চাই পরিকল্পিত উদ্যোগ।

আমাদের মতো জনবহুল দেশগুলোয় রেলপথের ভূমিকা বিরাট। কারণ একটি ট্রেনে একসঙ্গে অনেক যাত্রী চলাচল করতে পারে। আবার পণ্য পরিবহনও সাশ্রয়ী। ব্রিটিশ উত্তরাধিকারসূত্রে দেশে রেলের সুন্দর অবকাঠামো বিদ্যমান। বিগত বছরগুলোয় বিনিয়োগও হয়েছে বিস্তর। রেলকে ঘিরে মানুষেরও বিপুল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিনিয়োগগুলো হয়েছে অপরিকল্পিত, খাপ ছাড়া। প্রয়োজন বেশি হলেও রেলের ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে অনেক কম। ফলে ইঞ্জিনের সক্ষমতা বাড়ানো যায়নি; বরং দিন দিন তা তলানিতে। বিদ্যমান ইঞ্জিনগুলো যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতার অভাবে সময়মতো মেরামত করা যাচ্ছে না, যার বড় প্রভাব পড়ছে সার্বিক রেলের নৈপুণ্যে। এ অবস্থায় যন্ত্রাংশ তৈরিতে প্রয়োজন স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। রেলমন্ত্রীর ভাষ্যে জানা যাচ্ছে, রেলের যন্ত্রাংশ দেশেই তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া আরো ১০টি কারখানা নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানাগুলো ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। এটা ইতিবাচক। রাষ্ট্রীয় সময়োপযোগী পদক্ষেপে রেল খাত ঘুরে দাঁড়াবে, এটিই প্রত্যাশা।