পাঁচ দশক ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে ইউসেপ বাংলাদেশ। এ শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সংস্থাটি। দেশের আটটি জেলায় ৫৩টি সাধারণ শিক্ষা ও ১০টি কারিগরি শিক্ষা বিদ্যালয়ের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু ২০১৯ সালেই ইউসেপের প্রায় সাড়ে ১০ হাজার শিক্ষার্থী শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। সম্প্রতি বিদেশী দাতানির্ভর এ সংস্থার উন্নয়ন-সহযোগীরা প্রয়োজনীয় অনুদান বন্ধ করে দেয়ায় সুবিধাবঞ্চিত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের সক্রিয় ভূমিকা কাম্য। সংস্থাটি যাতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে নিতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।

কভিডের অভিঘাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা। শিক্ষার সংকটাপন্ন অবস্থা গরিব শিশুদের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়ার পর স্কুল খুলে দিলেও দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত অনেক শিশু আর শ্রেণীকক্ষে ফিরতে পারবে না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাস মহামারীর পর সারা বিশ্বে এক কোটি শিশু আর বিদ্যালয়ে ফিরবে না। খবরটি আমাদের জন্যও বেশ উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়শীল দেশগুলো করোনাকালীন শিক্ষার নড়বড়ে অবস্থা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অধিকাংশ দাতা রাষ্ট্রগুলো এখন করোনার অভিঘাত সামলাতে ব্যতিব্যস্ত। এ অবস্থায় পরিস্থিতি সামলাতে সরকারকেই উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিভিন্ন গবেষণা তথ্য বলছে, করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরা স্কুল ছেড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ফিরে যাচ্ছে। দারিদ্র্যের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য শিশুরা কাজে নামছে। বাধ্য হয়ে অদক্ষ শ্রমিক, বাস-টেম্পোর হেলপার, ড্রাইভারসহ নানা ধরনের পেশায় যুক্ত হচ্ছে। পরিবার কিংবা কর্মস্থলে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে এ শিশুদের একটি অংশ পথশিশুতে পরিণত হয়। একপর্যায়ে ভিক্ষাবৃত্তি, চুরি, ছিনতাইয়ে জড়িয়ে যায়। এ শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি প্রশিক্ষিত হয়ে শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ না পায় তাহলে বাকি জীবনটাও তাদের দুর্বিষহভাবে কাটাতে হবে। তাই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার প্রসার, অধিকার আদায় এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করছে যেসব প্রতিষ্ঠান, তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও নীতিসহায়তা প্রদান জরুরি।

ভারতে যেমন সরকারের পাশাপাশি জনহিতৈষী সংগঠনগুলো (ফিলানথ্রপিক অর্গানাইজেশন) বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে বড় অংকের তহবিলের জোগান দিয়ে থাকে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি আমাদের দেশের ব্যক্তি খাতগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে অবশ্যই স্থানীয় সরকার ও সম্প্রদায়গুলোকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতাকে আরো ভালোভাবে প্রতিফলিত করবে। পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যাগুলোকে ভালোভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। অধিক কার্যকর কর্মসূচি ও নীতি প্রণয়নের বিষয়গুলোয় জোর দিতে হবে। সরকার ও তার অংশীদারদের বিভিন্ন  এলাকার প্রান্তিক পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সামাজিক সহায়তার কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তিতে স্থানীয় সরকার ও এনজিওগুলোকে একত্রে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিষয়ে সরকারের বেশকিছু উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না। যেমন সুবিধাবঞ্চিত  জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকল্প আছে। এ অবস্থায় ইউসেপের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার যদি এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তাহলে তাতে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়বে এবং উদ্যোগ গ্রহণ ফলপ্রসূ হবে। বর্তমানে করোনা মহামারীতে অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারে ধাক্কা মানুষের জীবিকার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। দুর্ভাগ্যবশত এ সংকট শিশুদের শিশুশ্রমের দিকে ঠেলে দিচ্চ্ছে।

আমরা জানি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্য হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি শিশুর মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনেক দেশ যে অগ্রগতি করেছিল, করোনা মহামারী তা ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া শিশুদের একটা বড় অংশ অভিভাবকহীন পথশিশু। এ ধরনের শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সরকারকে বিশেষায়িত প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। করোনাকাল দীর্ঘস্থায়ী হলে দরিদ্র ও কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সুবিধাবঞ্চিত বিশাল জনগোষ্ঠীর শিশুদের যদি আমরা শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করতে পারি তাহলে এরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে। অর্থনৈতিক বোঝা বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়বে তাতে। স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এসব অর্জনে সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করতেই হয়। তবে এটাও অনুধাবন করতে হবে যে উন্নয়শীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হলে আগের মতো বিদেশী দাতা সংস্থার অনুদান বা সহযোগিতা আসবে না। স্বাভাবিকভাবেই বিদেশী দাতা রাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক অন্যান্য বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেবে। এ অবস্থায় নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। সুবিধাবঞ্চিত এ শিশুদের নিয়ে ইউসেপ যাতে তাদের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।