কভিডের সাম্প্রতিক অভিঘাত বাদে দুই দশক ধরে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলভাবে এগিয়েছে। স্টার্টআপ ও নতুন ব্যবসা উদ্যোগের সংখ্যায়ও সমান্তরাল উল্লম্ফন ঘটেছে। এসব উদ্যোগের একটা উল্লেখযোগ্য অংশেরই সূচনা নারীর হাতে। সময়ান্তরে দেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপেও এর প্রমাণ মেলে। ওই জরিপের তথ্য বলছে, গত এক দশকে নারী উদ্যোক্তা ১২৬ শতাংশ বেড়েছে। নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এটা একটা বড় অর্জন বৈকি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়ে গেছে। সেগুলো দূর করা জরুরি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পুরো ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেমে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারী সেটি আরো ত্বরান্বিত করেছে। ব্যবসার একটা বড় অংশ এখন অনলাইনে স্থানান্তর হয়েছে। দ্রুত প্রসার ঘটছে ই-কমার্সের। পুরুষের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক এসব ব্যবসার উদ্যোক্তার ভূমিকায় বর্তমানে অনেক নারীকেও দেখা যাচ্ছে। এমনকি কভিড মহামারীর মধ্যেও ব্যবসা পরিচালনা করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন এসব নারী। কিন্তু সংকট হলো তাদের ব্যবসায়িক যাত্রাটা সহজ নয়। প্রতি পদে বাধা। এ উদ্যোক্তাদের অনেকেই বাসাবাড়িতে বসে অনলাইন, ফেসবুক, অ্যাপ প্রভৃতি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবসা করেন। অন্য ব্যবসায়ীদের মতো তাদের অবকাঠামো সুবিধা নেই। অনেকেই এখনো সরকারি নিবন্ধন কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছেন। অনেকেরই ব্যবসা করার ট্রেড লাইসেন্স নেই। কঠিন শর্ত ও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় নারীদের একটা অংশ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সহজে নিবন্ধিত হতে পারছেন না। অর্থায়নও আরেকটা বড় সমস্যা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ এখনো অনেক কম। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এখনো ঋণ কম পান। বেশির ভাগই পারিবারিক সঞ্চয় ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে ব্যবসা বা উদ্যোগ পরিচালনা করেন কিংবা ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনাকারী এনজিওগুলো থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে হয় তাদের। ট্রেড লাইসেন্স ও অন্য কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পান না। একইভাবে বিপণন থেকে পণ্য পরিবহন এবং ডেলিভারির ক্ষেত্রেও তাদের বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। বেশি হারে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভাব নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য সুখবর। সমাজ ও রাষ্ট্রে এর গুণিতক প্রভাব পড়বে। কাজেই উল্লিখিত বাধাগুলো নিরসন এখন সময়ের দাবি।

ব্যবসায়িকভাবে নারীদের এগিয়ে যাওয়া এখন বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, মালয়েশিয়া, চীন, জাপানসহ প্রায় প্রতিটি দেশেই নারীরা অধিক হারে ব্যবসায় আসছেন। নিজেদের গড়ে তুলছেন উদ্যোক্তা হিসেবে। রাষ্ট্র তাদের জন্য সৃষ্টি করছে সহায়ক পরিবেশ। ভারতে নারীদের অর্থায়নের জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে অনধিক নয়টি স্কিম হাতে নেয়া হয়েছে। ভারতীয় মহিলা ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ২০ কোটি রুপি স্কিম চালু করেছে। এতে ঋণের পরিমাণ ১ কোটি রুপির মধ্যে হলে তার জন্য কোনো জামানত লাগবে না। অন্য কিছু ব্যাংকেও সেখানে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব সুবিধা পেতে প্রক্রিয়াও সেখানে অনেক সহজ। সমরূপভাবে শ্রীলংকায়ও একই অবস্থা। দেশটির ব্যবসা উন্নয়ন কেন্দ্র (সিএলবিডিসি) নারীবান্ধব অনেক নীতি প্রণয়নে সহায়তা জোগাচ্ছে। সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কিছু কর্মসূচি বিন্যাস করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে সেখানে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। চীন এরই মধ্যে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে প্রভূত সাফল্য দেখিয়েছে। এক হিসাব বলছে, বর্তমানে টেক স্টার্টআপের অর্ধেকের বেশি নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা। ব্যবসাজগতে সেখানে নারীদের জন্য একটা সমান্তরাল ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়তা করেছে রাষ্ট্রীয় অব্যাহত নীতি সমর্থন এবং সহজ অর্থায়ন প্রাপ্তি। উল্লিখিত দেশগুলোর গৃহীত উদ্যোগ, অভিজ্ঞতা ও কৌশল আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

সরকার নারীদের জন্য নানা নীতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। জাতীয় শিল্পনীতিতেও বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ঋণের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নির্দেশনা আছে পুনঃঅর্থায়ন ঋণের কমপক্ষে ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করার। নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এসব নির্দেশনার উদ্দেশ্য। অথচ ব্যাংকগুলো নির্দেশনামতো তাদের অর্থায়ন করছে না। নারী উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, ঋণের জন্য ব্যাংক সাদরে আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও ঋণ সেভাবে দেয়া হচ্ছে না। নিবন্ধন সনদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত জিম্মাদার, স্থায়ী ব্যবসাসহ নানা নথিপত্র চাইছে। এ ধরনের কাগজপত্র অনেকেই দিতে পারছেন না, দেখাতে পারছেন না। ফলে ঋণও পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ ব্যাংকগুলোর কাছে ঋণের আবেদন করলেও সময়মতো দেয়া হচ্ছে না। বিলম্বে ঋণ অনুমোদনের কারণে তাদের আর ব্যবসার কাজে লাগছে না। বস্তুত, নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি ব্যাংকগুলোর আচরণ এখনো সেভাবে বদলায়নি। এক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন। নারীদের অর্থায়নের শর্ত আরো শিথিল করা যায় কিনা, সেটিও ভাবার সময় এসেছে।

শুধু অর্থায়ন নয়; এলসি সুবিধা, জিএসপি সনদ প্রাপ্তি ও নবায়ন করতেও নারীদের ভুগতে হয়। এসব ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারী উদ্যোক্তাদের বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয় বলে খবর মিলছে। এগুলোও যথাযথভাবে সমাধান করতে হবে। নারীদের জন্য বন্ড লাইসেন্স, এলসি খোলা ও নগদ সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরো সহজ করতে হবে। ব্যাংকে নারীদের জন্য সক্রিয় হেল্প ডেস্ক চালু করা যেতে পারে। সনদায়ন ও অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নারীদের প্রতি আরো সহযোগিতামূলক আচরণ প্রত্যাশিত। নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যে জটিলতা বিদ্যমান, তার সমাধানে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে শর্ত শিথিল করতে হবে। সর্বোপরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের অর্থপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা চাই।

সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। জনসংখ্যার এ বিপুল অংশকে বাদ দিয়ে দেশের সার্বিক জাতীয় উন্নয়ন মোটেই সম্ভব নয়। সব ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে বাংলাদেশ যে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে, তা নারীর ক্রমাগত অগ্রসরতা ঘিরেই সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘ দ্রুত এগিয়ে চলা ২০টি দেশের তালিকায় রেখেছে বাংলাদেশকে। শিক্ষায় নারীরা অনেকটা এগিয়েছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের উপস্থিতিও বাড়ছে। বিদ্যমান বাধাগুলো নিরসন করে রাষ্ট্রের প্রয়োজন তাদের এগিয়ে চলার সার্বিক সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি।