রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপির খাতায়। আদায় করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় অবলোপনের পথে হাঁটছে ব্যাংকগুলো। এরই মধ্যে চার ব্যাংকে সম্মিলিতভাবে ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করা হয়েছে বলে খবর মিলছে। অবলোপনকৃত এসব ঋণ আদায়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। 

২০০২ সালের আগে দেশে ঋণ অবলোপনের কোনো সুযোগ ছিল না। ছিল না কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা। অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে সরকারের ব্যাংকিং রিফর্ম কমিটি ২০০২ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণ অবলোপন করাসহ কিছু নির্দেশনাসংবলিত সুপারিশ দেয়। সেসব বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকিং কোম্পানি আইনেও আনা হয় প্রয়োজনীয় সংশোধনী। এসব উদ্যোগের পথ ধরেই দেশে ঋণ অবলোপনের শুরু। ব্যাংকের স্থিতিপত্র যতটা সম্ভব নির্ভার রাখাই ছিল এর লক্ষ্য। কিন্তু কালক্রমে সেটিই হয়ে উঠেছে আমাদের ব্যাংক খাত, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ গোপন করার অন্যতম বড় হাতিয়ার। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় অভ্যন্তরীণ সুশাসন ব্যবস্থা দুর্বল। ঋণ বিতরণে মানা হয় না ডিউ ডিলিজেন্স। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণ করা হয়।  অল্প কিছু বড় করপোরেট গ্রাহককেই দেয়া হয় ঋণের বড় অংশ। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ একটা ছোট গোষ্ঠীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তদুপরি ঋণ প্রদানে নেয়া হয় নানা অপকৌশলের আশ্রয়। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ কিছু ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিভিন্ন সময় সেটি প্রমাণ হয়েছে। এর সম্মিলিত ফলই ঊর্ধ্বমুখী খেলাপি ঋণ। সময়ান্তরে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়লেও আদায় পরিস্থিতি মন্থর। মামলা করার পরও আদায় করা যাচ্ছে না অর্থ। এ অবস্থায় অনিয়ম আড়াল করার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখাতে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ঋণ অবলোপন পথ বেছে নিচ্ছে। নিয়মিত বিরতিতে অবলোপন করা হচ্ছে বিপুল ঋণ। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত।

কম-বেশি সব দেশেই ঋণ অবলোপনের ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু সেখানে এটি একেবারেই শেষ ভরসার অস্ত্র। বিদ্যমান সব হাতিয়ার ব্যবহার করে ব্যর্থ হলেই কেবল ঋণ অবলোপনের ব্যবস্থা করা হয়। তবুও যুগপত্ভাবে আদায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়। এতে কোনো বিরতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা উন্নত রাষ্ট্রে খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ডেট রিকভারি এজেন্সি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোকে  খেলাপির দেয়া সহজামানত উদ্ধারে কাজ করে। তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রণোদনা দেয়া হয়। কিছু দেশে ওইসব কোম্পানি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে খেলাপি ঋণ বা দেনা অর্ধেক মূল্যে কিনে নেয়। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেকটাই কমে যায়। অনেক দেশে দেউলিয়া আদালতের মাধ্যমে খেলাপির সমুদয় সম্পদ-সম্পত্তি বিক্রি ঋণের অর্থ ব্যাংককে ফেরত দেয়া হয়। কিছু দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকার খেলাপিদের ব্যাপারে ভীষণ কঠোরহস্ত। এক্ষেত্রে ভারতের কথা উল্লেখ করা যায়। দেশটির সরকার বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে দেশটি ব্যাংক একীভূতকরণের (মার্জার) মতো উদ্যোগও নিয়েছে। উল্লিখিত দেশগুলোর ব্যাংকিং কর্মপ্রক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

পরিতাপের বিষয় হলো, বৈশ্বিক প্রবণতার উল্টো স্রোতেই এখনো বাংলাদেশ। আদায়ে বিশেষ জোর না দিয়ে এখানে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে নিয়মিতভাবে অবলোপনের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এতে কয়েকটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। প্রথমত, ঋণ অবলোপনের কারণে সরকারের কর আদায় কমছে। কেননা ব্যাংকগুলো অবলোপনের কারণে সৃষ্ট ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য কর অব্যাহতি পায়। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা বঞ্চিত হচ্ছেন লভ্যাংশ থেকে, কারণ অবলোপনের প্রথম শর্তই হচ্ছে মুনাফা থেকে সরিয়ে মন্দ ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা। এতে বার্ষিক লভ্যাংশের হার কমে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, ব্যাংকের সুদহারের ওপরও অবলোপনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অনাদায়ী মন্দ ঋণের পরিমাণ বেশি হলে ব্যাংকের তহবিল খরচ বেশি থাকে। ফলে আমানতের ওপর কম সুদ ও ঋণের ওপর সুদহার বাড়াতে হয়। সব মিলিয়ে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কাজেই গয়রহ ঋণ অবলোপনের সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

বলা হচ্ছে, মামলা করেও খেলাপি ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। অর্থঋণ আদালতের মামলা বছরের পর বছর ঝুলছে। নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এতে কেবল সময়ক্ষেপণ হলেও কার্যকর কিছু হচ্ছে না। সবচেয়ে বড় বিষয়, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা আইনের সুযোগের অপব্যবহার করছেন। এ অবস্থায় বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে খেলাপি ঋণের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিচারপূর্বক ঋণখেলাপিকে দ্রুত শাস্তি দেয়া যাবে বলছেন তারা। এটা আমলে নেয়া যেতে পারে। মালয়েশিয়ায় আদালতে চূড়ান্ত রায়ের পর ব্যাংকগুলোকে ঋণখেলাপির সহজামানত দখলে নেয়ার জন্য পুনর্বার মামলা করতে হয় না। আমাদের এখানেও এটি অনুসরণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার দরকার। এছাড়া অন্য দেশগুলোর মতো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, একীভূতকরণের মতো উদ্যোগগুলোও নিতে হবে। সর্বোপরি, কিছু নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সংকোচনের পাশাপাশি গণমাধ্যমে নিয়মিত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ ফলদায়ক হতে পারে।

ঋণ অবলোপন বিশ্বব্যাপী হিসাববিজ্ঞানের একটি স্বীকৃত পন্থা। এ ব্যবস্থার দুটি উদ্দেশ্য। একটি অবশ্যই স্থিতিপত্রকে অনাদায়ী পাওনার ভারমুক্ত করা, অন্যটি অনাদায়ী পাওনার বিপরীতে আয়কর রেয়াত পাওয়া। কিন্তু দেশে অনেক ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থার যেভাবে অপব্যবহার হচ্ছে, তা অনভিপ্রেত। অবলোপন মানে মওকুফ নয়। কাজেই  অবলোপনকৃত ঋণ যেন অন্ধকারে না হারায়, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যেমন সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি ব্যাংকগুলোকে ঋণ আদায়ে জোরালো প্রচেষ্টা নিতে হবে, এর বিকল্প নেই।