গত শতকের সবচেয়ে খারাপ মহামারীর মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) ধনী দেশগুলো মহামারী মোকাবেলায় অধিক সাশ্রয়ী উপায়ের অভিগম্যতায় বাধার সৃষ্টি করেছে। সবাই জানে যে রোগ নির্ণয় টেস্ট, ওষুধ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, টিকাসহ সবার জন্য টেস্টিং, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়ের অভিগম্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২০ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার চুক্তির (ট্রিপস) প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করার অনুরোধ করেছিল। চলতি বছরের মে মাসে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের পক্ষে ৬২টি দেশ সহ-স্পন্সর ছিল এবং ডব্লিউটিও সদস্য রাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশেরই সমর্থন পায় এটি।

নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিপুল সমর্থন সত্ত্বেও পশ্চিমা সরকারগুলো, বড় ওষুধ কোম্পানি ও অন্য বহুজাতিক করপোরেশনের কর্মকর্তারা এ ছাড়ের অনুরোধকে কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য ক্ষতিকর, অবমূল্যায়নকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। 

যদিও অধিকাংশ ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য এই সাময়িক স্থগিত প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন, ইউরোপীয় সরকারগুলো, ইউরোপীয় কমিশন (ইসি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাহীরা সক্রিয়ভাবে এর বিরোধিতা করে চলেছেন।

এ প্রস্তাব ব্রাজিল এবং যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও জাপানের মতো অন্য ধনী দেশগুলোরও বিরোধিতার মুখে পড়ে। অবশ্য বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে টিকার মেধাস্বত্বের সাময়িক ছাড় সমর্থন করছে। কিন্তু তারা অন্য জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যাপারে এখনো নীরব রয়েছে। 

বিভ্রান্তিকরভাবে ইউরোপীয় নেতারা দাবি করেন যে সাময়িক ছাড়ের অনুরোধ অপ্রয়োজনীয় এবং মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপিআর) উদ্ভাবনের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে ‘আইপিআর’-এর গুরুত্ব দ্বিতীয় স্তরের। প্রকৃতপক্ষে, ‘যখন মেধাস্বত্ব অধিকার খুব ব্যাপকতর বা শক্তিশালী হয়, তখন সেগুলো আসলে উদ্ভাবন নিরুৎসাহিত করে।’

তারা বিভ্রান্তিকরভাবে আরো বলেন যে বিদ্যমান ভলান্টারি লাইসেন্সিং (ভিএল), প্রযুক্তি হস্তান্তরে বিদ্যমান প্রবিধানগুলো, কোভ্যাক্সের বিপুল ক্রয়, বিদ্যমান ট্রিপস নমনীয়তাগুলো বিশেষত কম্পালসরি লাইসেন্সিংয়ের (সিএল) মাধ্যমে টিকার অভিগম্যতা পেতে পারে। কিন্তু এই কথিত সমাধানগুলো ব্যাপকভাবে অপর্যাপ্ত বলেই আজ টিকা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও প্রতিকার সরঞ্জামাদির সংকট।

অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, সরবরাহ ঘাটতি ও অপর্যাপ্ত দান-অনুদানের কারণে কোভ্যাক্স ভুগছে। তাই অনেক দরিদ্র দেশ এমনকি কোভ্যাক্সের মাধ্যমে টিকার আবেদনও করেনি। ১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে আইপিআর শক্তিশালী হওয়ার কারণে বহুজাতিক করপোরেশনগুলো (টিএনসি) প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তিকে কম লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করে।

মেধাস্বত্ব সুরক্ষার কঠোর আন্তর্জাতিক প্রয়োগ খুব বেশি দিনের নয়, সাম্প্রতিক। ফাইজারের তত্কালীন চেয়ারম্যান এডমুন্ড প্রাট জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেডের (গ্যাট) উরুগুয়ে রাউন্ডের এজেন্ডায় আইপি সফলভাবে সামনে এনেছিলেন, যা ১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিও ও ট্রিপস সৃষ্টি করেছিল।

শক্তিশালী আইপি অধিকার করপোরেট ক্ষমতা বৃদ্ধি ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার কমাবে—এ ভয়ে অনেক উন্নয়নশীল দেশ ট্রিপসের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু ধনী দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিভক্ত করতে পুরস্কার ও ভীতির নীতি (ক্যারট অ্যান্ড স্টিক) ব্যবহারের মাধ্যমে ট্রিপস পুশ করেছিল। 

সিএল ট্রিপস বিশেষ ক্ষেত্রে সিএলের অনুমোদন দেয়। সিএল নতুন নয়, এটি প্রথম প্রবর্তন হয়েছিল ১৮৮৩ সালের প্যারিস কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রপার্টিতে। সিএসের মাধ্যমে একটি সরকার উদ্ভাবক বা মেধাস্বত্বের মালিকের সম্মতি ছাড়া তৃতীয় কোনো পক্ষকে মেধাস্বত্বকৃত পণ্য বা প্রক্রিয়ার তৈরি-ব্যবহার করতে অনুমতি প্রদান করতে পারে। কিন্তু সেটি কেবলই অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহারের জন্য এবং মেধাস্বত্ব অধিকারীকে পর্যাপ্ত অর্থ প্রদানসহ অন্য শর্ত মেনে।

অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ধনী দেশের সরকারগুলো ১৯৯৭ সালের সিঙ্গাপুর ডব্লিউটিও মিনিস্ট্রিয়ালে ট্রিপস বাধ্যবাধকতার পক্ষে সমর্থন বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ১৯৯৯ সালে সিয়াটল মিনিস্টেরিয়েলে বিষয়টি সামনে এনেছিলেন এবং তাতে আফ্রিকার দেশগুলো ওয়াকআউট করেছিল।

৯/১১-এর পর ২০০১ সালে দোহা মিনিস্ট্রিয়ালের আগে একটি নতুন ‘ডেভেলপমেন্ট রাউন্ড’সহ ডব্লিউটিও আলোচনায় কিছু ছাড় দেয়া হয়েছিল। দুই দশক পরে এর কোনো চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি দৃশ্যমান নয়, যেহেতু ধনী দেশগুলো যা চায়, এতে সেগুলো পাওয়ার ব্যাপারে তারা খুব কমই সম্ভাবনা দেখে। 

এইচআইভি/এইডস সংকটের সময় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলার নেত্বত্বে ট্রিপসের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান শক্তিশালী হয়েছিল। দোহা মিনিস্ট্রিয়াল ঘোষণায় ট্রিপসের ক্ষেত্রে ‘পাবলিক হেলথ এক্সসেপশনস’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এখন জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে প্রথমে ভিএলসির ব্যাপারে আলোচনা না করেই সিল ব্যবস্থা করার সুযোগ হয়। একই সঙ্গে উৎপাদনে সক্ষমতা না-থাকা দেশগুলো সস্তায় টিকাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি করতে সিএল ব্যবহার করতে পারে।

বিদ্যমান ট্রিপস নমনীয়তা পর্যাপ্ত—এ দাবির মাধ্যমে ইউরোপীয় নেতারা বাস্তবে আসল সমস্যাগুলো অস্বীকার করছেন। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে তারা বলতে অভ্যস্ত যে উৎপাদন বাড়ানো ও প্রযুক্তি-জ্ঞান বিনিময়ে ভিএল প্রবিধানগুলো যথেষ্ট। বাস্তবে উদ্ভাবক কর্তৃক সুফলভোগী, এমনকি পরিবেশক নির্বাচনসহ ভিএলগুলো প্রায়ই গোপনীয়তায় আবৃত। এভাবে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভলান্টারি লাইসেন্সিং প্রতিষ্ঠানটি কতটা উৎপাদন করতে পারে, তা সীমিত করে দেয় এবং ভারতীয় ও অন্যদের প্রয়োজন মেটানো ব্যাহত করে। তারা স্বীকার করে, যখন স্বেচ্ছামূলক সহযোগিতা ব্যর্থ হয় তখন কোনো মহামারীর প্রেক্ষাপটে কম্পালসরি লাইসেন্সিং (সিএল) একটি বৈধ হাতিয়ার। তবে সিএল পেটেন্টের ক্ষেত্রে কেবল প্রাসঙ্গিক, পেটেন্ট না হওয়া নতুন টিকার জন্য নয়।

ইউরোপীয় কমিশনের যুক্তিগুলো বড় বড় ওষুধ কোম্পানিকে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু কার্যকরভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কভিড-১৯ টেকনোলজি অ্যাকসেস পুল (সি-ট্যাপ) উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করে। সি-ট্যাপ অনুমোদিত কভিড-১৯ টিকা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রযুক্তির সমতামূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু  শিল্প ও সরকারি কর্মকর্তারা প্রযুক্তি বিনিময়কে অপ্রয়োজনীয় এবং ভবিষ্যৎ উদ্ভাবনের জন্য সবচেয়ে খারাপ হিসেবে বাতিল করেছে।

দীর্ঘদিন বড় ওষুধ কোম্পানি এবং ইসিসহ সরকারগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলো খুব জরুরি সিএল ব্যবহার না করতে চাপ দিয়েছে, যেটিকে তারা এখন সমাধান হিসেবে মেনে নেয়। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে ওষুধের জন্য সিএল ব্যবহারকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের  হুমকি দিয়েছেন, কেবল এ বছরই সেগুলো ব্যবহারে অন্যের অধিকারের কথা স্বীকার করেছে।

বিশেষ করে সীমিত চুক্তি আলোচনার ক্ষমতা বা সংশ্লিষ্ট উৎপাদন সক্ষমতা থাকা দেশগুলোর জন্য আসলে সিএল ব্যবহার করা খুব কঠিন। বিদ্যমান প্রবিধানগুলোয় দেশভিত্তিক, কোম্পানিভিত্তিক, পেটেন্টভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা প্রয়োজন, যা ব্যাপকতর সমন্বয় সমস্যার সৃষ্টি করে।

সিএল প্রবিধান কারো কারো জন্য পর্যাপ্ত হতে পারে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে সব প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, টেস্ট ও ওষুধের ক্ষেত্রে তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক পণ্যের কয়েকটি সিএল প্রয়োজন।

প্রচলিত ওষুধ বা টিকার ক্ষেত্রে সিএলের জন্য শিল্প গোপনীয়তা, গোপনীয় তথ্য, শিল্প নকশা এবং টেকসই উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্য প্রাসঙ্গিক জ্ঞান বিনিময়ের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এগুলো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা এমআরএনএ টিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হতে পারে। নিজেরা উৎপাদন করতে অসমর্থ দেশগুলোকে রফতানির জন্য সস্তা জেনেরিক উৎপাদন করতে অন্যদের জন্য সিএল ইস্যুর ব্যাপারে ইচ্ছুক হতে হবে। এখনো সার্বিক ট্রিপস চুক্তি এবং ২০০১ সালের ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’-তে অনেক বাধা নিহিত।    

প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের গোপনীয় তথ্য বিনিময় কেবল প্রতিযোগিতা বাড়ায় না, বরং উদ্ভাবনও বেগবান করে। এভাবে ভারতের শান্তা বায়োটেকনিকস একটি সাশ্রয়ী হেপাটাইটিস বি টিকার উন্নয়ন ঘটিয়েছে, যা আসলে ইউনিসেফের প্রশংসনীয় বৈশ্বিক টিকাদান কর্মযজ্ঞের ভিত্তি।

পেটেন্টের সুযোগ সীমিতকরণ ওষুধ খাতের উদ্ভাবন হত্যা করবে—এ-বিষয়ক শিল্প ও রাজনৈতিক নেতাদের দাবির বিপরীতে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। এইডসের প্রাদুর্ভাবের সময় ‘দি এগ্রিমেন্ট অন পাবলিক হেলথ এক্সসেপশন টু ট্রিপস’ চুক্তির পরে নতুন ধরনের অনেক ওষুধ এবং এইচআইভির বেশকিছু উন্নত চিকিৎসার উন্নয়ন ঘটেছে। এসব নতুন ও উন্নত চিকিৎসা কার্যকরভাবে মরণঘাতী মহামারীর অবসান ঘটিয়েছে। পোলিও টিকা উদ্ভাবনের পর জোনাস সাল্ককে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘এর পেটেন্টের স্বত্বাধিকারী কে?’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বলব জনগণ। এর কোনো পেটেন্ট নেই। আপনি কি সূর্যের পেটেন্ট করতে পারবেন?’

 

আনিস চৌধুরী: অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নিউইয়র্ক ও ব্যাংককে জাতিসংঘের সিনিয়র পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন

জোমো কেওমে সুন্দরম: মালয়েশিয়ার অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক, অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ছিলেন এবং অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৭ সালের ওয়াসিলি লিওন্টিফ পুরস্কার বিজয়ী