কলেবরে বেড়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। ডিসপোজিবল বা একবার ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসাসামগ্রী ব্যবহার বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে প্রতিদিনই। যোগ হয়েছে করোনা পরিস্থিতি; সংক্রমণ এড়াতে ব্যবহূত স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী মিলিয়ে বাড়ছে চিকিৎসা বর্জ্যের পরিমাণ। এর বেশির ভাগই কম-বেশি সংক্রামক, যার মাধ্যমে ঘটতে পারে রোগের সংক্রমণ। অথচ দেশে এখনো চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্কাশনের কার্যকরী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এর নিরাপদ নিষ্কাশনের মানদণ্ডেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। সম্প্রতি পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে কার্যকর চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবি তুলে মানববন্ধন করা হয়। দাবিটি প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক। অনিরাপদভাবে যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা চিকিৎসা বর্জ্য আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও পরিবেশকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। কাজেই এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ নিষ্কাশনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

২০০৮ সালে চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্কাশন নিয়ে আইন হলেও তা খুবই দুর্বল কিংবা পরবর্তী সময়ে এটি আর যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। জাতীয় পরিবেশ নীতিতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সব বর্জ্যের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে বলা হলেও এর প্রায়োগিকতা কম। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাইডলাইনে সিটি করপোরেশন, বিভাগ এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কমিটি গঠনের নির্দেশনা থাকলেও তা অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে। দায়ী কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে আইন ও বিধিমালায় যতটুকু বিধান রয়েছে, তাও হাসপাতালগুলো পরিপালন করছে না। এমনকি ত্রুটিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য হাসপাতালকে বড় ধরনের জরিমানা বা শাস্তি দেয়া হয়েছে বলেও শোনা যায় না। চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর এখনো খুব একটা সক্রিয় নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী, হাসপাতাল ডিজাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্কাশন ব্যবস্থা। কঠিন বর্জ্য ধ্বংসের জন্য বিশ্বের বেশির ভাগ হাসপাতালেই মেডিকেল ইনসিনেরেটর এবং অটোক্লেভ বা দাহন যন্ত্রসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা আছে। আর তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। এভাবে মারাত্মক বর্জ্যকে দূষণমুক্ত করে সাধারণ ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যান্য তরল বর্জ্যের সঙ্গে নিষ্কাশন করা হয়। চিকিৎসা বর্জ্য নিষ্কাশনে জাপান, জার্মানি, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অটোক্লেভ পদ্ধতি ব্যবহার করে। রাসায়নিক বা তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যতীত বিপজ্জনক স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যের সংক্রামক রোগের জীবাণুনাশক ও বিশোধনের উদ্দেশ্যে অটোক্লেভ বা দাহন যন্ত্রসহ আধুনিক পদ্ধতিগুলো কার্যকর। তাছাড়া লাল, নীল, হলুদ, সবুজ বিভিন্ন কনটেইনারে আলাদা করে সাধারণ, সংক্রামক, বিপজ্জনক ও তেজস্ক্রিয় চিকিৎসা বর্জ্য রাখা হয়। স্থানীয় চিকিৎসা সংগঠনগুলো এখানে বর্জ্য নিষ্কাশন কোম্পানি ও ছোট হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি করে। হাসপাতাল ও কোম্পানি সবাই এ নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য। আইন না মানলে দায়ী হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় মোটা অংকের অর্থ।

দেশে হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে মূলত হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। যাদের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্য নিয়মমাফিক বা পরিবেশসম্মত উপায়ে সংগ্রহ, পরিবহন, ডাম্পিং বা ধ্বংস করা হয় না। এদিকে নীতি ও বিধিমালার মাধ্যমে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরি করা হলেও বেশির ভাগ হাসপাতালেই তা মানা হচ্ছে না। আবার গত কয়েক বছরে রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় অনেক আধুনিকায়ন হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া হাসপাতালগুলো কেন চিকিৎসা চালানোর অনুমতি পাচ্ছে, এটাও প্রশ্ন। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ছাড়াই চলছে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।

হাসপাতালগুলো নামমাত্র বর্জ্য অপসারণ করে তা শোধনের দায় এড়ালেও নেই কোনো তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এতে পরিশোধন ছাড়াই এসব বর্জ্য মিশে যাচ্ছে জলাশয়ে। এসব বর্জ্য পরিবেশে গিয়ে যদি খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে এবং তাতে মাছ-পশুপাখি সংক্রমিত হয়, তাহলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আমরা অনুমান করতে পারি। গবেষণা থেকে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোয় প্রতিদিন উত্পন্ন হয় প্রায় ২৪৮ টন চিকিৎসা বর্জ্য, যার প্রায় ৮৬ শতাংশই সঠিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ৫২ লাখ মানুষ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে, তাদের মধ্যে ৪০ লাখই শিশু। তাই বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হওয়ায় তা ফুড চেইনে ঢুকে গেলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ পর্যায়ে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য বিভাগ—সবাই মিলে কাজ করলে সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বর্জ্য অব্যবস্থাপনাজনিত জনস্বাস্থ্যের হুমকি মোকাবেলায় দরকার এ-সংক্রান্ত বিধিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন। সংশ্লিষ্টদের উচিত বড় হাসপাতালগুলোকে নিজস্ব নিরাপদ বর্জ্য ধ্বংসের ব্যবস্থা তৈরিতে বাধ্য করা। এ-সংক্রান্ত মনিটরিং জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি রাজধানী এবং এর বাইরে নগরভিত্তিক বৃহদাকার চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে মেডিকেল ইনসিনেরেটর, অটোক্লেভসহ আধুনিক ব্যবস্থা। তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক, চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী-কর্মকর্তার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসা বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা কৌশল ও বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।