কুকুরকে বলা হয় ‘মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু’। এ বন্ধুত্বের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু কুকুরের নাম খোদাই করা আছে, যাদের আনুগত্য আর ভালোবাসা সাধারণ বন্ধুত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ দীর্ঘ ১৪ বছর মালিকের কবরের পাশে বসে কাটিয়েছে, কেউবা পথ হারিয়ে ফেলার পর তুষারপাতের মধ্যে তিন হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মালিকের কাছে ফিরে এসেছে।
ইতিহাস সমাদৃত এমনই কয়েকটি বিশ্বস্ত কুকুরের মধ্যে রয়েছে:
গ্রেফ্রায়ার্স ববি
১৮৫০ সালের দিকে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে নৈশপ্রহরীর কাজ করতেন জন গ্রে নামের একজন। তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল ‘ববি’ নামের ছোট্ট স্কাই টেরিয়ার কুকুর। ১৮৫৮ সালে যক্ষ্মায় ভুগে জন গ্রে মারা গেলে তাকে গ্রেফ্রায়ার্স কার্কইয়ার্ডে সমাহিত করা হয়। এরপরের গল্পটি ইতিহাস। ববি তার মালিকের কবরের পাশে একটানা ১৪ বছর বসে কাটিয়ে দেয়। কেবল দিনের বেলা একবার খাওয়ার জন্য সে পাশের একটি কফিশপে যেত। ১৮৭২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ববি তার বিশ্বস্ততা বজায় রেখেছিল। তার এ বিশ্বস্ততাকে স্বীকৃতি দিতে এডিনবার্গে একটি ব্রোঞ্জমূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
ববি দ্য ওয়ান্ডার ডগ
১৯২৩ সালে ইন্ডিয়ানাতে বেড়াতে গিয়ে প্রিয় কুকুর ববিকে হারিয়ে ফেলে ওরেগনের ব্র্যাজিয়ার পরিবার। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু ঠিক ৬ মাস পর সবাইকে চমকে দিয়ে ববি ব্র্যাজিয়ারের কাছে ফিরে আসে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ববি ইন্ডিয়ানা থেকে ওরেগন পর্যন্ত প্রায় ২,৮০০ মাইল পথ একাকী পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছিল। শীতের প্রকোপ আর দুর্গম পথ পেরিয়ে তার এই ঘরে ফেরার গল্প আজও বিশ্বস্ততার এক বড় উদাহরণ।
শেপ
ঘটনাটি ১৯৩৬ সালের, যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা রাজ্যের এক মেষপালক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মারা যান। সেসময় হাসপাতালের দরজায় অপেক্ষা করছিল তার কুকুর ‘শেপ’। যখন তার মালিকের মরদেহ কফিনবন্দি করে ট্রেনে করে পাঠিয়ে দেয়া হয়, শেপ রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে তা দেখেছিল। এরপরের ৫ বছর মালিকের ফিরে আসার অপেক্ষায় শেপ প্রতিদিন প্রতিটি ট্রেনের আগমনের সময় স্টেশনে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। ১৯৪২ সালে একটি ট্রেনের ধাক্কায় শেপের মৃত্যু হয়। ফোর্ট বেন্টনে আজও তার স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
হাচিকো
জাপানের আকিতা জাতের এ কুকুরটির গল্প হয়তো অনেকেরই জানা। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উয়েনো যখন কাজে যেতেন, হাচিকো প্রতিদিন তাকে শিবুইয়া স্টেশনে এগিয়ে দিত। ফেরার সময় ঠিক স্টেশনে এসে বসে থাকত। ১৯২৫ সালে অধ্যাপক উয়েনো কর্মস্থলে মারা যান। সেদিন আর তিনি নির্দিষ্ট সময় ফেরেননি। কিন্তু হাচিকো টানা ১০ বছর প্রতিদিন ঠিক সময়ে স্টেশনে এসে মালিকের জন্য অপেক্ষা করত। আজ শিবুইয়া স্টেশনের বাইরে হাচিকোর একটি ব্রোঞ্জমূর্তি রয়েছে। জাপানে তাকে আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে সম্মান করা হয়।

হাচিকোকে নিয়ে নির্মিত 'হাচিকো: আ ডগ'স টেল- এর একটি দৃশ্যে প্রিয় কুকুরের সঙ্গে রিচার্ড গিয়ার। ছবি- আইএমডিবি
ফিডো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে একটি কুকুর খুঁজে পান ইতালির কার্লো সোরিয়ানো নামের এক ব্যক্তি। তিনি কুকুরটির নাম রাখেন ‘ফিডো’ (যার অর্থ বিশ্বস্ত)। ফিডো প্রতিদিন বাস স্টপে কার্লোর জন্য অপেক্ষা করত। ১৯৪৩ সালে এক বিমান হামলায় কার্লো মারা যান। কিন্তু ফিডো জানত না তার মালিক আর নেই। সে টানা ১৩ বছর প্রতিদিন নিয়ম করে বাস স্টপে গিয়ে প্রতিটি বাস চেক করত কার্লোর খোঁজে। তার এ ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে ইতালির মেয়র তাকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছিলেন।
রাসওয়ার্প
১৯৯০ সালে ওয়েলসের পাহাড়ে হাইকিং করতে গিয়ে নিখোঁজ হন গ্রাহাম নাট্টাল ও তার কুকুর রাসওয়ার্প। দীর্ঘ ১১ সপ্তাহ পর যখন গ্রাহামের মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়, দেখা যায় হাড়কাঁপানো শীতেও রাসওয়ার্প তার মালিকের মরদেহের পাশেই দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। ১১ সপ্তাহ কিছু না খেয়ে সে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে নিচে নামিয়ে আনার কিছুদিনের মধ্যেই সে মারা যায়। নর্থ ইয়র্কশায়ারের গার্সডেল স্টেশনে তার একটি মূর্তি রয়েছে।










