গল্পটা যেন একেবারে হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্য। জন্মের মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ভারতের মুম্বাই শহরের দুটি ভিন্ন অনাথ আশ্রম থেকে তাদের দত্তক নেয়া হয়েছিল। এরপর হাজার হাজার মাইল দূরে নেদারল্যান্ডসের দুটি আলাদা পরিবারে বেড়ে ওঠা। তারা দীর্ঘ দিন একে অপরের খুব কাছের বান্ধবী ছিলেন। কিন্তু দুজনের কেউই ঘুণাক্ষরে টের পাননি যে তাদের শরীরে বইছে একই রক্তের ধারা। সম্প্রতি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে তারা আসলে আপন বোন।

চল্লিশোর্ধ্ব এই দুই নারী মীনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টাইসেনের শৈশব কেটেছে নেদারল্যান্ডসে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এক দত্তক সংস্থার আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় কিশোরী মীনা ও মিনালের। সেদিনের স্মৃতিচারণ করে ৪৩ বছর বয়সী মীনা জানান, প্রথম দর্শনেই তাদের চেহারার অদ্ভুত মিল দেখে বন্ধুরা আয়নায় মুখ দেখতে বলেছিল। একই ধরনের হাসি ও নাকের গড়ন দেখে তারা নিজেরাই চমকে গিয়েছিলেন। রাতের খাবারের টেবিলে একে অপরের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকা দুই কিশোরী পরদিনই নিজেদের ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর বিনিময় করেন।

4eff4828-b4ab-4e4f-b7bb-1000186b5e6e

কৈশোরে প্রথম পরিচয়ের পর থেকেই বন্ধুত্বে জড়ান মিনাল ও মীনা

রক্তের সম্পর্কের কোনো আভাস না থাকলেও তাদের আত্মিক টান ছিল তীব্র। চিঠি আদান-প্রদানের সময় প্রায়ই তারা একে অন্যকে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করতেন। ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের গান, খেলাধুলা, প্রথম প্রেম কিংবা স্কুলের নানা গল্পে ভরে উঠত সেই সব চিঠি। তবে ১৫ বছর আগে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান, আর মীনা সংসার ও প্রথম সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

7e94a211-7e30-481d-b7ea-a4fd3f896be0

দুইবোনের ছোটবেলার ছবি

২০১৭ সালে দত্তক নেয়া সন্তানদের এক সম্মেলনে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার কথা জানতে পেরে পরীক্ষা করান মীনা। তবে কোনো মিল না পাওয়ায় চলতি বছর অ্যাপটি মুছে ফেলেন তিনি। কিন্তু গল্পে নাটকীয় মোড় আসে গত ২০ মে। হঠাৎ ফেসবুকে মিনালের বার্তা পান মীনা। এপ্রিলে মা-বাবার বাড়িতে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন মিনাল। অ্যাপ পুনরায় ইনস্টল করে মীনা দেখতে পান, তাদের ডিএনএ শতভাগ মিলে গেছে। অর্থাৎ তারা একই মা-বাবার সন্তান।

গত আগস্টে এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবার মুখোমুখি হন দুই বোন। আবেগঘন সেই পুনর্বাসনে ছিল অশ্রু, গাঢ় আলিঙ্গন আর হাসির মেলবন্ধন। বর্তমানে তিন সন্তানের জননী মীনা ও দুই সন্তানের জননী মিনাল অনুভব করেন, তাদের মনের অনেকদিনের শূন্যতা অবশেষে পূর্ণতা পেয়েছে।

532ee99e-1a5c-47a1-9e8b-356595d2d911

কৈশোরের পুরনো ছবিতে চোখ বোলাচ্ছেন মীনা ও মিনাল

শৈশবে মীনাকে দত্তক নিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসের এক শিক্ষক দম্পতি। ২০০৩ সালে জন্মদাত্রী মায়ের খোঁজে মুম্বাইয়ের অনাথ আশ্রমে গিয়েও কোনো তথ্য পাননি তিনি। বর্তমানে দুই বোন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের পরিবারও একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এখন তাদের একমাত্র স্বপ্ন, মুম্বাইয়ে অর্থাৎ তাদের জন্মস্থানে ফিরে গিয়ে একসঙ্গে পাশাপাশি হাঁটা।

—বিবিসি থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে