সম্পর্কের অবনতি হলেও পর্তুগিজরা একটি লাভের দিক খুঁজে পান। তারা জামোরিনের শত্রু কোলাতুনাদ রাজা এবং কোচিন রাজার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। কোচিন ও কাণ্নূরে (বর্তমান কান্নুর) দুর্গ ও গুদামঘর গড়ে তুলেছিল যাতে মসলা সংগ্রহ করে রাখা যায়। কিন্তু এতে তাদের চাহিদা মেটেনি। তারা চেয়েছিল সমুদ্র ও বাণিজ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।

অন্যদিকে, জামোরিন তার নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করেন এবং তখনই মারাক্কার মুসলিমরা কালিকটের রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করেন। ঐতিহাসিকভাবে কালিকটে চাল আমদানি হতো তামিল, কলিঙ্গ অঞ্চল ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এই চাল ও পণ্য আনতে সমুদ্রে পাড়ি দিতেন মারাক্কাররা। বহু সমৃদ্ধ মারাক্কার পরিবার প্রথমে কোচিনে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বসবাস শুরু করলেও পর্তুগিজদের সঙ্গে সংঘাতের কারণে তারা কালিকটে চলে আসেন। এখানে তারা আরব ও তুর্কি সমর্থনে জামোরিনের নৌবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করে তোলেন।

এরপর ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে জামোরিন অনুপস্থিত থাকার সময় পর্তুগিজরা কালিকট আক্রমণ করার চেষ্টা করে। এই আক্রমণের নেতৃত্ব দেন আলফঁসো দে আলবুকার্ক। তিনি গোয়ার দ্বিতীয় ভাইসরয় ও প্রথম গভর্নর (১৫০৯-১৫ খ্রি.) ছিলেন। কিন্তু এ আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং আহত আলবুকার্ক পিছু হটতে বাধ্য হন।

যেহেতু এসব যুদ্ধ পর্তুগিজদের রাজকোষ খালি করে দিচ্ছিল, এজন্য তারা কালিকট এড়িয়ে উত্তর দিকে সরে এসে গোয়াতে স্থায়ী হয়। সেখান থেকেই তারা তাদের 'Estado da India' শাসন করত এবং সমুদ্র অবরোধ করে আরবদের সরাসরি বাণিজ্য রোধ করত। জামোরিনের মারাক্কাররা ছোট ছোট নৌযান তৈরি করে আরব বণিকদের সঙ্গে জোট বেঁধে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে সমুদ্রযুদ্ধে নামেন। এই নৌযানগুলো বারবার পর্তুগিজ জাহাজ আক্রমণ করত। পর্তুগিজদের জন্য এ এক বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে ১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দে জামোরিনের সঙ্গে পর্তুগিজ যাজক ফ্রান্সিস আকোস্তার হঠাৎ সাক্ষাৎ হয়। তিনি একটি পর্তুগিজ জাহাজে সৈন্যদের ধর্মীয় সেবা দিচ্ছিলেন। জাহাজটি মারাক্কারদের দ্বারা বন্দি হয়। তাকে জামোরিনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি জামোরিনকে প্রভাবিত করেন।

এই যাজকের প্রভাবে জামোরিন শান্তির পথে আগ্রহী হন এবং পর্তুগিজদের গির্জা নির্মাণের অনুমতি দেন। এছাড়াও বলা হয়, কুঞ্জালি চতুর্থ (মারাক্কারদের মধ্যে একজনকে সেনাপতি করা হতো। এরা কুঞ্জালি মারাক্কার নামে পরিচিত হতেন) তখন এত সমুদ্রজয়ে সফল হয়ে উঠেছিলেন যে কিছুটা অহংকারী হয়ে পড়েছিলেন। ঠিক কী কারণে জামোরিন ও মারাক্কারদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু জামোরিন পর্তুগিজদের সহায়তায় কুঞ্জালিকে বন্দি করান এবং পরবর্তীতে পর্তুগিজরা তাকে গোয়ায় হত্যা করে।

Portuguese_fort_at_Calicut_(cropped)

কালিকটে পর্তুগিজ দুর্গ

১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে নতুন জামোরিনের সঙ্গে এক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পর্তুগিজরা অবশেষে কালিকটে একটি গির্জা নির্মাণ করে। তারা যা চেয়েছিল—অর্থাৎ কালিকটে একটি ঘাঁটি—তা অর্জন করে।

তবে খুব বেশিদিন এই অবস্থা থাকেনি। ১৬৬২ খ্রিস্টাব্দে কোচিন রাজা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেন। ডাচরাও কোচিনে ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং সিলোন (বর্তমান শ্রীলংকা) ও ইন্দোনেশিয়ায় বড় বড় গুদামঘর স্থাপন করে। যেমনটা তারা পর্তুগিজদের সঙ্গে ছিলেন, জামোরিন ডাচদের সঙ্গেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন, কারণ ডাচরা প্রায়শই কোচিন রাজার পক্ষে জামোরিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন।

ডাচদের সঙ্গে ত্রিবাঙ্কুরের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও তারা সাবধানী ছিল। এই সবকিছুর ফলে জামোরিন ধীরে ধীরে তার একসময়ের মিত্র মোপলাদের (কেরালার আরব বংশধর) কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। অন্যদিকে তার কোষাগারও ফাঁকা হয়ে যেতে থাকে। ডাচরা যদিও জামোরিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি বজায় রাখে, তারা সব সময় একটি ‘নিরপেক্ষ ও দূরত্ব বজায় রাখা’ নীতি অনুসরণ করে চলে।

জামোরিনদের পতন

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে জামোরিন রাজবংশের দুঃসময় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মাতৃসূত্রে কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকায়, কাসারগোড়ের নীলেশ্বরমে (কালিকট থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তর) জামোরিন বংশের এক শাখা থেকে দত্তক গ্রহণ করে একটি নতুন বংশধারা তৈরি করা হয়। এই সময়েই জামোরিন পলক্কাড় অঞ্চলের নাডুভাট্টম আক্রমণ করলে, পলক্কাড় রাজা সাহায্যের জন্য মহীশুরের হায়দার আলীর দ্বারস্থ হন।

হায়দার আলি তার অশ্বারোহী বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে মালাবারের বাহিনীকে পরাজিত করেন। যুদ্ধে হেরে গিয়ে জামোরিন সরে যেতে ও মুক্তিপণ দিতে সম্মত হন। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায়, হায়দার আলির বাহিনী ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে আবার আক্রমণ চালায়। পরাজিত জামোরিন তখন নিজেকে ও তার কালিকট প্রাসাদকে আগুনে পুড়িয়ে আত্মাহুতি দেন। এভাবেই প্রায় ৪০০ বছর পুরনো কালিকটের জামোরিন রাজবংশ ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে ভস্মীভূত হয়ে যায়।

জামোরিন বংশের কনিষ্ঠ রাজপুত্ররা হায়দার আলী ও পরে তার পুত্র টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান, কিন্তু তারাও পরাজিত হন। পরবর্তীকালে তারা মহীশুরের শাসকদের কাছ থেকে সামান্য পরিমাণ ভাতা নিয়ে জীবনধারণ করতে বাধ্য হন।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন মালাবার ও তেলিচেরিতে কেবল বাণিজ্য করছিল। তারা তখনো মানদণ্ড ছেড়ে রাজদণ্ড ধরেনি। তখন কোম্পানি গোপনে জামোরিন রাজপুত্রদের সহায়তা করত। হায়দার আলীর মৃত্যু হলে টিপু সিংহাসনে বসেন। প্রথমে তিনি ত্রিবাঙ্কুরের শাসকদের সঙ্গে এবং পরে ব্রিটিশদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। জামোরিন পরিবারের প্রবীণ পুরুষ ও প্রায় সব নারীই ত্রিবাঙ্কুরে পালিয়ে যান। শোনা যায়, তাদের সম্পদসহই তারা পালিয়েছিলেন। টিপু তাদের এই সম্পদ দখল করতে চেয়েছিলেন এবং সে উদ্দেশ্যে ত্রিবাঙ্কুর দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন।

শেষ পর্যন্ত টিপু সুলতান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হন এবং ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে সমস্ত অঞ্চল—যার মধ্যে মালাবারও ছিল—ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। এরপর মালাবার প্রথমে বোম্বে প্রেসিডেন্সির অধীনে এবং পরে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অধীনে আসে।

এ সময় জামোরিন পরিবার নির্বাসন থেকে ফিরে আসে এবং প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ব্রিটিশ শাসিত কালিকটে আবার বসবাস শুরু করে। অল্প পেনশন ও কিছু কর আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয় তাদের। কিন্তু জামোরিন রাজবংশ তখন আর আগের মতো ছিল না। তাদের প্রাচীন ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, জমির মালিকানা—সবই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

তবে ব্রিটিশরা জামোরিন পদটি রক্ষা করেছিল, যদিও তা ছিল কেবল এক নামমাত্র পদ। তখনই বর্ষার বাতাস ও পালতোলা জাহাজের যুগ পেরিয়ে এল আধুনিক স্টিমার জাহাজের যুগ। কোচিনে আধুনিক বন্দর গড়ে ওঠায় কালিকটের গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। জামোরিন পরিবার সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন শুরু করে এবং অনেকেই ব্রিটিশ সরকারে প্রশাসক বা মাঝারি স্তরের কর্মচারী হন। কালিকটের সেই অতীতের জাঁকজমক ও খ্যাতি বিস্মৃতিতে চলে যায়।

এভাবেই কালিকটের ভাগ্য নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় জামোরিনরা শহরকে মহিমার শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই শহর পরে রূপান্তরিত হয় এক নিস্তেজ, ছোট্ট শহরে, যাকে ঊনবিংশ শতকের ব্রিটিশ পর্যটকরা বলেছিলেন—একটি ঘুমন্ত ছোট শহর, এক সময়ের মহৎ বাণিজ্যকেন্দ্রের ছায়া মাত্র।

তবে জামোরিনরা শুধুই যোদ্ধা শাসক ছিলেন না, তারা ছিলেন শিল্পের মহান পৃষ্ঠপোষক। তারা কৃষ্ণাট্টম (ভগবান কৃষ্ণের জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মন্দির-নৃত্যনাট্য), সাহিত্য, বৈদিক শিক্ষা, সংস্কৃত ভাষা এবং পণ্ডিতদের বাৎসরিক সম্মেলনকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এ সম্মেলনে সাহিত্য প্রতিযোগিতা হতো এবং নির্বাচিত পণ্ডিতরা উপাধি ও পুরস্কার পেতেন।

কেরালার ত্রিশূরের গুরুয়ায়ুর মন্দির সম্ভবত আজও জামোরিন ও তার পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যুক্ত একমাত্র প্রধান প্রতিষ্ঠান।

জামোরিন রাজবংশ ও তাদের প্রতিপত্তি না থাকলেও আজও কালিকটে একজন জামোরিন আছেন। যখন একজন জামোরিন মারা যান, তখন পুরনো নিয়ম মেনে অন্য কেউ তার স্থলাভিষিক্ত হন। আজ কেউ কালিকটে গেলে হয়তো কোনো প্রবীণ স্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হবে যিনি এখনো সেই পুরনো ইতিহাস—মারাক্কারদের কথা, চীনার কথা—মনে রেখেছেন।

এখনো সেই এলাকায় সম্প্রদায়গত সম্প্রীতির চিত্রও দেখা যায়। এই শহর সবসময়ই ছিল বহু ধর্ম ও জাতির মানুষের সহাবস্থানের উদাহরণ—একটি শহর যেখানে কেউ নির্যাতনের ভয় ছাড়াই বাস করতে পারে এবং যেখানে মানুষ নিজের পরিশ্রমে উন্নতি করতে পারত।

(সমাপ্ত)